প্রথম পর্বের ভোটের পর রাজস্থানে এক নির্বাচনী জনসভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় থাকার সময় তারা (কংগ্রেস) বলেছিল, সম্পদে প্রথম অধিকার মুসলমানদের। তারা আপনাদের সবার সম্পদ নিয়ে যাদের বেশি সন্তান তাদের দিয়ে দেবে। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেবে এসব সম্পদ।’ আসলেই কি ভারতে অন্য ধর্মের মানুষের চেয়ে মুসলিম পরিবারে সন্তান সংখ্যা বেশি? পরিসংখ্যান কী বলছে?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, ভারতে ১৩ বছর আগে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় নিয়ে আদমশুমারি করা হয়। এরপর আর কোনো বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
২০১১ সালের আদমশুমারি থেকে জানা যায়, ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ১৭ কোটি ২২ লাখ, যা তখনকার সময়ে ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর আগে ২০০১ সালের আদমশুমারিতে বলা হয়, ভারতে মুসলমানদের সংখ্যা ১৩ কোটি ৮১ লাখ, যা তখনকার সময়ে ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত ১০ বছরে ভারতের মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এর আগে এত কম বাড়েনি। আগের দশ বছরে (১৯৯১-২০০১) বেড়েছিল ২৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এক পরিবারে কত সদস্য থাকেন, তা নিয়ে ২০১২ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতের জাতীয় নমুনা জরিপ কর্তৃপক্ষ। এতে বলা হয়, প্রতি মুসলমান পরিবারে গড়ে ৫ জন করে সদস্য রয়েছে। আর হিন্দু পরিবারের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৪ দশমিক ৩।
তবে, ভারতের শ্রমবাজারে মুসলমানদের অংশগ্রহণ কমে আসছে। এমনকি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম কর্মীদের হার এখন অনেক কম। ভারতের সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান সে কথাই বলছে।
ভারতে মুসলমানদের জন্মহার নিয়ে ২০২১ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে পিউ রিসার্চ সেন্টার। তাতে বলা হয়, ভারতে মুসলমানদের জন্মহার সবচেয়ে বেশি। তবে ক্রমেই তা কমে আসছে। ১৯৯২ সালে নারীপ্রতি সন্তান জন্মহার ছিল ৪ দশমিক ৪ জন। ২০১৫ সালে এই হার কমে ২ দশমিক ৬ তে নেমে আসে। সেখানে হিন্দু নারীদের সন্তান জন্মহার ২ দশমিক ১। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টাইমস বলছে, সব ধর্মেই জন্মহার কমে এসেছে।
ভারতে সাত দফায় অনুষ্ঠিত লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে গত শুক্রবার। চলছে নির্বাচনী প্রচার। এর মধ্যেই গত রোববার (২১ এপ্রিল) রাজস্থানে এক নির্বাচনী জনসভায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে আবার মুসলমান নিয়ে বিতর্ক টেনে আনলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, রাজস্থানের একটি এলাকায় জনসভায় মোদি সবাইকে বলেন কংগ্রেসকে ভোট না দিতে। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবেন না। এদের ক্ষমতায় আনলে তারা আপনার সম্পদ নিয়ে অণুপ্রবেশকারীদের মাঝে বণ্টন করে দেবে। আপনার কঠোর পরিশ্রমের সম্পদ অনুপ্রবেশকারীদের দিয়ে দিক, সেটা কি আপনি চান? আপনি কি এটা মেনে নেবেন?’
নরেন্দ্র মোদি কংগ্রেসকে মুসলিম তোষণের জন্য কাঠগড়ায় তোলেন। ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ড. মনমোহন সিং-এর একটি বক্তব্যের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকার সময় তারা (কংগ্রেস) বলেছিল, দেশের সম্পদে প্রথম অধিকার মুসলমানদের। তারা আপনাদের সবার সম্পদ নিয়ে তাদেরকে দিয়ে দেবে, যাদের বেশি সন্তান। অণুপ্রবেশকারীদের বণ্টন করে দিয়ে দেবে এসব সম্পদ।’
রাজস্থানের ওই জনসভায় মোদি বলেন, ‘কংগ্রেসের ইশতেহারেই বলা হচ্ছে যে মা-বোনদের স্বর্ণের হিসাব করা হবে। তারপর সেই সম্পদ বণ্টন করা হবে তাদের মধ্যে, যাদের দেশের সম্পত্তিতে সবচেয়ে আগে অধিকার বলে মনমোহন সিংয়ের সরকার জানিয়েছিল। শহুরে নকশালদের এই ভাবনা মা-বোনদের মঙ্গলসূত্রকে পর্যন্ত ছাড়বে না।’
অথচ এ ধরনের কোনো কথা মনমোহন সিং ক্ষমতায় থাকাকালে বলেননি বলে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যম ফ্যাক্টচেক বা তথ্য যাচাই করে জানিয়েছে।
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র কায়েমের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ দলের নেতারা মুসলমান-বিদ্বেষী মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ বিরোধীদের। এবার মোদির এই মন্তব্য নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা তদন্ত করে দেখতে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে বিরোধী দলগুলো। তবে তাদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন বিজেপির পাপেট বা হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, কংগ্রেসের দাবি, লোকসভা ভোটের প্রচারে এই প্রথম সরাসরি সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করলেন মোদি। হতাশা থেকেই মোদি এ পথে এগিয়েছেন বলে দাবি তাদের।
নির্বাচনে প্রচারের সময় ধর্মকে আঘাত করে কথা বলা নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধিতে যা স্পষ্ট করে বলা আছে। কিন্তু খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই আচরণবিধি মানছেন না। আর তা দেখেও যেন না দেখার ভান করছে নির্বাচন কমিশন।


প্রথম ধাপের পর মোদি-শাহ চিন্তিত কেন
মোদি-বিরোধীরা এতটা ছন্নছাড়া কেন?
মোদি–আমির–রণবীরের এই ভিডিওগুলো কি ভূতে বানাচ্ছে?
