মোদি-বিরোধীরা এতটা ছন্নছাড়া কেন?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:১৮ পিএম

ভারতে জাতীয় নির্বাচন (লোকসভা) শুরু হয়েছে গত ১৯ এপ্রিল শুক্রবার। কিন্তু তার অনেক আগে থেকেই এই চিত্র ভারতে এবং ভারতের বাইরে আঁকা শুরু হয়েছে যে, নরেন্দ্র মোদি আবার আসছেন এবং তা বিপুল বিক্রমে। পরপর তৃতীয়বারের মতো (যদি বাস্তবে হয়) বিরোধীদের ধরাশায়ী করে এভাবে ভারতের মতো একটা বিরাট গণতান্ত্রিক দেশে ক্ষমতায় আসাটা বলা যায় নজিরবিহীন। আসলে এর জন্য নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারের কৃতিত্ব কতটা, আর মোদি-বিরোধীদের ব্যর্থতা কতটা দায়ী, তা নিয়ে একটা হিসাব কষাই উচিত।

ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর ১৯৮৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস লোকসভায় চার শর বেশি আসন পায়। এরপর থেকে আর কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। সবাই ধরে নিয়েছিল, ভারতীয় শাসন ব্যবস্থায় বহুদলীয় জোট সরকারের যাত্রা শুরু হলো। এবং এটাই স্থায়ী রূপ নিতে যাচ্ছে। ১৯৮৯ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সেটাই চলে আসছিল। ফলে এই ধরে নেওয়াটা খুব অযৌক্তিক ছিল, এটা বলা যাবে না। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারেই ২৮২ আসনে জিতে সেই ধারণা খানখান করে দিলেন। দ্বিতীয়বারে (২০১৯) জিতলেন ৩০৩ আসনে। এবার লক্ষ্য ৩৭০। আর লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন মাত্র ২৭২টি আসনের। ফলে ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি প্রথম থেকেই একটা অনন্য অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। 

গত দশ বছর ধরে মোদি বিজেপির অবিসংবাদিত নেতা। এমনকি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের বা আরএসএস-এরও। যে হিন্দুত্ববাদী প্রতিষ্ঠানটি কিনা এত দিন বিজেপি চালিয়ে এসেছে বা যাদের সভায় ঠিক হয় বিজেপির নেতৃত্ব–সেই ধারণাও চুরমার করে দিয়েছেন মোদি। যদিও এখনো তিনি নিজেকে সংঘের সাধারণ প্রচারক হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। কিন্তু গত দশ বছরে বিজেপি-আরএসএস সবই মোদিতে বিলীন হয়ে গেছে। এখন পুরোটাই মোদিময়। বড় কোনো অসাফল্য ছাড়া মোদিকে এই অবস্থান থেকে নড়ানো অসম্ভব। 

সেই ২০১২ সাল থেকে আলোচনা শুরু। ওই বছরের ডিসেম্বরে দলকে পরপর তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আনার সাফল্য আএসএসকে অন্যরকম ভাবতে বাধ্য করেছিল। গুজরাট ছাড়িয়ে মোদিকে গোটা ভারতের নেতা হিসেবে তুলে ধরা যায় কিনা, সংঘে এ প্রশ্ন উঠতেই আর ভুল করেননি গুজরাটের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও আরএসএস নেতৃত্বের মধ্যে এই দ্বিধা ছিল যে, উত্তর প্রদেশকে বাদ দিয়ে গুজরাটের একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরা কতটা ঠিক হবে? ইতিমধ্যে গুজরাটের উন্নয়নের মডেল নিয়ে সারা ভারতে এত জোর দিয়ে প্রচার শুরু করল মোদি-ব্রিগেড যে, ‘আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত মনমোহন সিং সরকারের’ বিকল্প হিসেবে মোদি প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করলেন। ২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর নরেন্দ্র মোদিকে তাদের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করল বিজেপি ও আরএসএস।

তখনো মোদির গুরু লালকৃষ্ণ আদভানি রাজনীতিতে বেশ শক্তপোক্ত অবস্থানে। ছিলেন বাজপেয়ি মন্ত্রিসভার উপ-প্রধানমন্ত্রী। রামমন্দির আন্দোলনের নাটেরগুরু। বিজেপির কেন্দ্রীয় স্তরে তখন আরও অনেক তাবড়তাবড় নেতা। মুরলী মনোহর যোশী, অরুণ জেটলি, সুষমা স্বরাজ, রাজনাথ সিংসহ আরও কতজন! তাঁরা অনুগত সেবক হিসেবে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। ভাবলেন, দেখি না দৌঁড় কত? কিন্তু তাঁদের সবাইকে ভুল প্রমাণ করতে মোদির সময় লাগেনি। প্রথম ধাক্কায় ২৮২ আসন এনে দিয়ে বিড়াল মারার কাজ ওখানেই খতম করে দেন তিনি। 

বিজেপির প্রবীণ নেতাদের মতো একই ভুল করে বসলেন কংগ্রেসসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। তাঁরাও মোদিকে অবমূল্যায়ন করলেন। মোদির প্রথম দিককার অনেক কিছুই তাঁদের কাছে ভাঁড়ামো মনে হলো। ২০১৪-র নির্বাচনী প্রচার এবং সাফল্যের পরও তাঁরা বুঝলেন না, মোদি কত গভীর জলের মাছ। তিনি প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলছেন খুব হিসেব করে। ‘কংগ্রেস মুক্ত ভারত গঠন’ ছাড়া তাঁর কোনো লক্ষ্যই নেই—বলে অন্য বিরোধীদের আশ্বস্ত করলেন। ভারত ভাগ থেকে শুরু করে ভারতের আজকের দুর্গতির জন্য যে কংগ্রেস দায়ী, বিশেষ করে নেহেরু-গান্ধী পরিবার—এই ন্যারেটিভ তৈরি করলেন। যা বিজেপি-বিরোধীদের রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ডিভাইড অ্যান্ড রুল চালু করতে সমর্থ হয়েছিল।

ভুলটা কংগ্রেসও করল। রাজত্ব গেলেও অহং ত্যাগ করতে পারেনি দলটি। রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে তুলে ধরে ২০১৯-এর নির্বাচনে গো-হারা হারার পর বুঝতে পারে মোদির সাথে পাল্লা দেওয়ার যোগ্যতা তাদের নেই। আর ২০১৯-এর পর ভারত পেল নতুন মোদিকে, যিনি আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছেন, যেকোনো বিরোধিতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছেন। বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এসব নিত্যকার সমস্যা কিছুই না। তিনি স্বপ্ন দেখান ৫ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির। বিশ্বসভায় সর্বোচ্চ সম্মানের। কেউ কিছু বললে, দেখে নেন। এসব কিছু বিরাটসংখ্যক ভারতীয়র মনোজগৎকে এক কাল্পনিক শক্তি ও তুষ্টিতে আচ্ছন্ন করে রেখে দিল।

রাহুল গান্ধীকে নেতা হিসেবে তুলে ধরে ২০১৯-এর নির্বাচনে গো-হারা হারার পরও কংগ্রেস নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে—এমনটি বলার সুযোগ নেই। ছবি: রয়টার্সএর পাশাপাশি কাশ্মীরের বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা রদ করলেন, রামমন্দির নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় গেল তাঁর পক্ষে। এর আগের পর্বে নির্বাচনী বন্ড, ইডির আইন সংস্কার—সবই করে রেখেছিলেন। প্রয়োগ শুরু হলো ২০১৯-এর পর। ততদিনে করোনায় সারা দেশ বিপর্যস্ত। কিন্তু মোদির মেশিন অব্যহত রইল। অখ্যাত মামলায় গুজরাটের এক নিম্ন আদালতে দুই বছরের কারাদণ্ডের সাজা পেয়ে এমপি পদ হারালেন রাহুল গান্ধী। মোদি সরকারের কট্টর সমালোচক তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি মহুয়া মৈত্র পদ হারালেন ঠুনকো অভিযোগে। এক সাথে এক শর বেশি বিরোধী এমপিকে বহিষ্কার করলেন স্পিকার, যা গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। মহারাষ্ট্র শিবসেনা ও এনসিপি ভেঙে জোট সরকার ফেলে দিল বিজেপি। এর আগে মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকে কংগ্রেস সরকারকে একইভাবে ফেলে দিয়ে নিজেদের সরকার গড়ে বিজেপি। 

এত কিছু হলো, কিন্তু বিজেপি-বিরোধীরা এক হতে পারল না। এর বড় দায় অবশ্যই কংগ্রেসের। বড় দল হিসেবে তারা অন্যদের সম্মানের সাথে পাশে বসাতে পারেনি। একক ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তাদের লোকসভায় বিরোধী দলের মর্যাদাটাও খেয়ে ফেলেছে। তারপরও শিক্ষা হয়নি। শেষমেষ পাটনায় বৈঠক করে ২৬ দলের জোট ‘ইন্ডিয়া’ আত্মপ্রকাশ করল। কিন্তু যার উদ্যোগ, সেই নীতিশ কুমার সবার আগে জোট ছেড়ে বিজেপিতে ভিড়লেন। মমতা থেকেও নেই। আগে ভারতের জোট-রাজনীতিতে অনুঘটকের কাজ করত বাম দলগুলো। এবার তারা অনুপস্থিত। ফলে জোট সেভাবে পোক্ত হয়নি।

আর বিজেপি-বিরোধীরা যেসব রাজ্যে ক্ষমতায়, সেখানে আছে রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিশালী অনুষঙ্গ  ইডি, সিবিআই, এনআইএ, ভিজিল্যান্স কমিশন ও আয়কর বিভাগ। এদের ব্যবহারে মোদি সরকার উৎকর্ষতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে। এদের সুনিপুন ব্যবহারে দুই বিরোধী মুখ্যমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-এমপি-এমএলএ এখন জেলে। অথচ দেশজুড়ে নির্বাচন হচ্ছে। এই সময়ে সেভাবে কেউ বুক চিতিয়ে রুখে দাঁড়াবে, এমনটা কেউ নেই। এই ছন্নছাড়া বিজেপি-বিরোধী জোটের কারণে ২০২৪-এর নির্বাচন মোদির কাছে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার মতো। 

তবে কথিত আছে পরাক্রমশালীদের মৃত্যুবীজ লুকিয়ে থাকে তাদের নিজেদের মধ্যেই। দল (বিজেপি), সরকার (কেন্দ্রীয়), সংগঠনে (আরএসএস) মোদির অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকার মধ্যে কোথায় রাহু ঘাপটি মেরে আছে, তা সময়ই বলে দেবে। তাঁর বিরোধীরাও হয়তো সেই ভরসায় আছেন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত গণভোট প্রস্তাবে চারটি মৌলিক প্রশ্ন থাকলেও ভোটারকে দেওয়া হচ্ছে একটি মাত্র উত্তর দেওয়ার সুযোগ—‘হ্যাঁ’ বা ‘না’। আর এই কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক মহল, সংবিধান...
ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের একটি বড় অংশের জয়ের বিপরীতে বিরোধী পক্ষগুলোর নানা অভিযোগ রয়েছে খোদ নির্বাচন নিয়েই। কিন্তু এসব অভিযোগের উল্টো দিকে যখন ভিপি-জিএস-এজিএস পদে বিজয়ীর...
ট্রাম্প ভারতকে এটাও বুঝিয়ে বলতে পারেন যে, যদি কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হয়, তাহলে ভারতের লাভ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি হবে। আর কাশ্মীর বিরোধের সমাধান কেবল ট্রাম্পের জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কারের...
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত এবং তা সহজে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চিকিৎসকেরা যেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার...
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় সাতক্ষীরাযর রসুলপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাফিজুর রহমান ওরফে লালটু নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি...
দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। অভিযান শুরুর পর ককরোচ জনতা পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে হতাহতদের বিষয়ে...
লোডিং...

এলাকার খবর