একচেটিয়া শাসনের বিরোধিতায়ও যে কারণে সতর্ক থাকা উচিত

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:০৫ পিএম

একচেটিয়া শাসনব্যবস্থা এক মহাআখ্যান নির্মাণ করে। একদিনে নয়, ধীরে ধীরে। রাষ্ট্রের লক্ষ্য‑উদ্দেশ্য, অতীতের স্বর্ণযুগের প্রত্যাবর্তন ও তার পণ্যীকরণ, জাতীয় গৌরব অর্জন বা পুনরুদ্ধার, ফুলিয়ে‑ফাঁপিয়ে করা উন্নয়ন ধারণার প্রচার ও সে অনুযায়ী প্রকল্পভিত্তিক কর্মযজ্ঞ ইত্যাদির মাধ্যমে এই মহাআখ্যানের নির্মাণ হয়। এই আখ্যানকে প্রশ্ন করা প্রতিটি ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে ‘শত্রু’ আখ্যা দেওয়ার কাজটিও একইসঙ্গে করা হয়। এ ক্ষেত্রে জনআবেগকে কাজে লাগানো হয় দারুণভাবে।

মহাআখ্যানের নির্মাণ ও এর বিরোধিতাকারীমাত্রই শত্রুপক্ষ–এই ভিতের ওপরই মোটাদাগে দাঁড়িয়ে থাকে একচেটিয়া শাসন। এই কাজটি করার সময়ই বেশ কিছু প্রতীক ও বৈশিষ্ট্যকে এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে একীভূত করা হয়। কিছু শব্দ, লেবাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণাকে উপজীব্য করেই এই প্রতীকায়নের কাজটি করা হয়, যার একেবারে শীর্ষে পুরো শাসনব্যবস্থার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে উপস্থিত থাকেন স্বয়ং একচেটিয়া শাসক।

একইসঙ্গে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমকে ধ্বসিয়ে দেওয়া হয়। বানিয়ে ফেলা হয় হাস্যকর উপাদানে। নাগরিক সংগঠনগুলোকে হয় ‘জি হুজুর’ সংঘ, না হয় ‘কোণঠাসা’ করে ফেলা হয়। রাষ্ট্রের শীর্ষ থেকেই এক ভীষণ রকম প্রতিক্রিয়ার রাজনীতি চালু করা হয়। ফলে সমাজে বা রাজনীতিতে কোনো ধূসর এলাকা আর অবশিষ্ট থাকে না। এর ফলে রাজনৈতিক কোনো দ্বন্দ্ব নিরসনে মধ্যপন্থী কাউকে পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের সর্বশেষ গণঅভ্যুত্থানের যে গতিপথ, সেখানে ঠিক এই ‘নেগোশিয়েটরের’ অভাবটিই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। এর আগের যেকোনো আন্দোলনের ক্ষেত্রে এই বাংলাদেশেই এমন কিছু ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের দেখা মিলেছে, যাদের গ্রহণযোগ্যতা উভয় পক্ষেই ছিল। এই ব্যক্তিবর্গ যেকোনো বিপজ্জনক মুহূর্তে সরকার ও আন্দোলনকারী উভয় পক্ষের মধ্যে একটি আলোচনার আয়োজন করতে পারতেন। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি‑পেশার মানুষের কাছেও তাঁরা ছিলেন গ্রহণীয়। কিন্তু এবার এমন কাউকে সেভাবে সামনে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। এর কারণও রয়েছে একচেটিয়া শাসনের গড়ে ওঠার মধ্যে। একচেটিয়া শাসন নিজের ভিত দৃঢ় করার সময়ই এ ধরনের যাবতীয় ব্যক্তিকে কোণঠাসা করে ফেলে। কারণ, এমন ব্যক্তিরা সাধারণত সবসময় উচিত কথাটি বলার চেষ্টা করেন। আর উচিত কথা বা প্রশ্নকেই যেহেতু এ ধরনের শাসনব্যবস্থা সবচেয়ে সন্দেহ ও শত্রুর দৃষ্টিতে দেখে, সেহেতু সে এমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হয় বিপরীত বর্গে ঠেলে দেয়, নয়তো চুপ করিয়ে দেয়। ফলে চাইলেও এমন ব্যক্তিরা সংকটকালে আর কোনো ভূমিকা নিতে পারেন না।

আমেরিকার ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘দ্য পলিটিকস অব অথোরিটারিয়ান রুল’ বইটিতে এ সম্পর্কে বেশ ভালো আলোচনা রয়েছে। মিলান ডব্লিউ সভোলিকের লেখা বইটিতে একচেটিয়া শাসনের আপাত শক্তি হিসেবে চিহ্নিত বিষয়কেই এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মিলান বলছেন, একচেটিয়া শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুই চ্যালেঞ্জ–এক. জনতা, যারা ক্ষেপে উঠে গণআন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটাতে পারে; এবং দুই. সেনা, সরকারি কর্মকর্তা ও অভিজাতদের সমন্বয়ে গঠিত ক্ষমতার ভাগীদার অংশ, যাদের সম্মতি না পেলে এ ধরনের শাসন দীর্ঘকাল টেকানো যায় না।

একচেটিয়া শাসকেরা এই দুইয়ের জন্য দুই ধরনের দাওয়াই হাজির করে—এক নিপীড়ন ও দুই পুরস্কার। সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টনের মধ্য দিয়ে পুরস্কার নিশ্চিত করা হয়। মুশকিল হচ্ছে—নিপীড়ন যেমন অসীম মাত্রায় চালানো যায় না, তেমনি পুরস্কার প্রদানেরও একটা মাত্রা থাকে। দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্য নষ্ট হলে তা বুমেরাং হয়ে ওঠে। দিনশেষে যেহেতু একচেটিয়া শাসককেও দেশ পরিচালনা করতে হয়, সেহেতু ঘুষ‑দুর্নীতি, সরকারি‑বেসরকারি সম্পদের বণ্টন তারাও অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলতে দিতে পারে না। কিন্তু পুরস্কারপ্রাপ্তদের ক্ষুধা থাকে অসীম। ফলে এক ধরনের বিরোধের সৃষ্টি হয়। পীড়নক্লান্ত জনতা যখন জেরবার হয়ে ওঠে, তখন এই পুরস্কারপ্রাপ্তদের অনেকেই ভোল পাল্টে ফেলে। ফলে একচেটিয়া শাসকের পতন আসন্ন হয়ে ওঠে।
 

একচেটিয়া শাসনের ধরন বিচারে এই পতন দুভাবে ঘটতে পারে। একচেটিয়া শাসক যদি নাগরিক সমাজ থেকে রাজনৈতিকভাবে উঠে আসা কেউ হয় (যেমনটা আছে এশিয়া‑প্যাসিফিকের বিভিন্ন দেশে), তবে সমাজের ভেতর থেকেই একেবারে বিপরীত রাজনৈতিক শক্তি তার প্রতিস্থাপন ঘটাতে পারে কিংবা কোনো সামরিক বা সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েও এই পতন হতে পারে। আর যদি একচেটিয়া শাসক নিজেই সামরিক বা সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা কেউ হয়, তবে সাধারণত তার পতন হয় আরেকটি সশস্ত্র বিদ্রোহের মধ্য দিয়েই। উভয় ক্ষেত্রেই এক মেরুকে অপসারণ করে তার জায়গা দখল করে আরেক মেরু।

বিশ্বের ২৪টি দেশে জরিপ চালিয়ে ২০২৩ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল পিউ রিসার্চ সেন্টার। সেখানে বলা হয়েছে, যেসব দেশে সরাসরি কিংবা ছদ্ম একচেটিয়া শাসন রয়েছে, সেসব দেশে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি ঝোঁক তুলনামূলক বেশি। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের একটি বড় অংশই বিদ্যমান শাসকগোষ্ঠীকে না চাইলেও, তার বদলে আরেকজন কর্তৃত্ববাদী শাসককেই চাইছে। আর এই বিষয়টি ঘটে সদ্যবিগত শাসকের সকল অর্জন, সকল কাজ, পুনঃ পুনঃ ব্যবহৃত সকল শব্দ, দিবস, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আখ্যান, স্থাপনা ও দর্শনকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার নামে। এক ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি ওঠে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই দাবিটিও থাকে প্রকরণগত দিক থেকেই একবগ্গা, যেমনটি ছিল বিগত ব্যবস্থায়। এর কিছু লক্ষণ এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করতে শুরু করেছে।

প্রতীকী ছবি। ছবি: পিক্সাবেক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত ‘ফরমাল মডেলস অব অথোরিটারিয়ান রেজিমস: আ ক্রিটিক’ বইয়ে অ্যাডাম প্রজিভরস্কি বলছেন, একচেটিয়া শাসনব্যবস্থাকে বুঝতে হলে গেম থিওরির শরণ নিতে হবে, যেখানে শাসক হিসেবে থাকে সমাজের সংখ্যালঘু অংশের প্রতিনিধি। সংখ্যালঘু এই অর্থে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে, তার তো গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই ক্ষমতায় থাকার কথা। তেমনটি হলে শাসক কেন নিজের গায়ে একচেটিয়া বা কর্তৃত্ববাদী শাসকের ট্যাগ লাগাবেন?

বিষয়টি কেমন? এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় আগেই বলা হয়েছে শুরুতেই পুরো সমাজকে বর্গীকরণ করা হয়। টিকে থাকে শুধু পক্ষ ও বিপক্ষ। এমনকি রেফারি বা আম্পায়ার হতে পারে—সমাজের এমন অংশগুলোকেও মুছে দেওয়া হয়। শাসক নিজ দলভুক্তদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা করে এবং বিপরীত পক্ষের জন্য শাস্তির। এ দুইয়েরও আবার থাকে নিজস্ব ভারসাম্যের নীতি। এই পুরো ব্যবস্থা মুখ্যত ততদিন কাজ করে, যতদিন অর্থনীতি ঠিকঠাক থাকে। কিন্তু যখনই অতি ব্যবহারের ফলে এই পুরস্কার ও শাস্তির ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখনই খেলা ঘুরে যেতে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি সবাইকে স্মরণে ও বিবেচনায় নিতে বলব বিশেষ করে। কারণ, বাংলাদেশেরও এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকট আসলে অর্থনৈতিক। অর্থনীতির এক চরম সংকটকালেই জনতা ফুঁসে উঠেছে। হ্যাঁ, এখানে আন্দোলন দমানোর জন্য অতিবলপ্রয়োগ একটি বিস্ফোরক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু অসংখ্য মানুষের পথে নেমে আসার পেছেন এই বিষয়টির সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টিও ছিল। এই গণঅভ্যুত্থান বিজয়ী হওয়ায় এখন এর অংশীজনেরা বিগত কাঠামোর সবকিছুকেই কাঠগড়ায় তুলছে। তার সব বয়ান (এমনকি তার ঐতিহাসিক সত্যতা থাকলেও), সব কাজ, সব আইনি পদক্ষেপ (এমনকি তার বৈধতা থাকলেও) দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। বিষয়টি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ওরা একে শাস্তি দিয়েছে, তাই সে নিরপরাধ। ঠিক একইভাবে ওদের কাছে সে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তাই সে লুটেরা। অর্থাৎ, ঠিক একইভাবে ট্যাগ লাগানোর সংস্কৃতিই কিন্তু চলমান। আগের ব্যবস্থা যেমন ট্যাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো তদন্ত বা অনুসন্ধানের প্রয়োজন বোধ করেনি, এখনো তেমন না করার একটি প্রবণতা এরই মধ্যে দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে।

গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে থাকা একচেটিয়া শাসকেরা যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সব ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বসিয়ে দেয়, সেহেতু এমন পরিস্থিতিতে তার আর কোথাও যাওয়ার থাকে না। চোখের সামনেই তারা দেখতে থাকে, নিজেদের এতদিনকার পুরস্কৃত ব্যক্তি ও গোষ্ঠী কীভাবে ভোল পাল্টাচ্ছে বা আক্রান্ত হচ্ছে।

এ তো গেল সমাজের ওপরের স্তর, যেখানে ক্ষমতার বিলি‑বণ্টনটি নির্ধারিত হয়। আসা যাক দীর্ঘ একচেটিয়া শাসনের অধীনে থাকা সমাজের কাছে। এই সমাজের সামনে একচেটিয়া শাসকের প্রতিনিধি হিসেবে থাকে একগুচ্ছ প্রতীক, শব্দ, লেবাস ইত্যাদি, যার ওপর এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় একটা পবিত্রতা আরোপ করা হয়। সমাজে যেহেতু কোনো বিরোধী মতকে সহ্য করা হয় না, সেহেতু নাচার মানুষ এই প্রতীকগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করে। তারা এই প্রতীকগুলোকে অমর্যাদা করা, খারিজ করা বা বর্জনকেই তখন শাসকের বিরোধিতা হিসেবে সাব্যস্ত করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় তুলনামূলক দুর্বল ও নিরীহ প্রতীকগুলো। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে নারী ও তার পোশাক, জাতি, ধর্ম ও ভাষাভিত্তিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, বিগত কাঠামোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকা বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক উপাদান, শিল্পী, শিল্পকর্ম থেকে শুরু করে বহু ক্ষেত্রের কথা।

এই আক্রমণ ও বর্জনের তালিকায় সবার আগে উঠে আসে সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো, যাকে একচেটিয়া শাসকেরা নিজেদের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনের লক্ষ্যেই আঁকড়ে ধরেছিল। এই সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোই সবার আগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, তুলনামূলক প্রান্তজনের সংস্কৃতি। অর্থাৎ, একচেটিয়া শাসকের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বর্গীকরণের বিপরীতে সমাজের একেবারে নিভৃত অঞ্চলে বেড়ে চলে ঠিক বিপরীত এক বর্গীকরণ। অর্থাৎ, একচেটিয়া শাসকের ক্রিয়ার বিপরীতে এক ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার জন্ম হতে থাকে সমাজের ভেতরে।

ফলে একচেটিয়া শাসন নিজেই সমাজের ভেতরে নিজের মতো ক্ষমতালিপ্সু কিন্তু বিপরীত মনস্তত্ত্বের আরেক একচেটিয়া ধারণার জন্ম দেয়। সাধারণত সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক মেরুর কোনো সংগঠনই এই বিপরীত একচেটিয়া ধারণার প্রসারের মধ্য দিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথটি পরিষ্কার করতে থাকে নিভৃতে। একচেটিয়া শাসনের অধীনে থেকেই ‘গোকূলে বেড়ে’ ওঠে সেই বিপরীত শক্তি, যা তাকে উৎখাত করে নিজেদের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করবে। যেহেতু প্রকাশ্য বিরোধিতাকে এই শাসনকাঠামো নিষিদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যায়, সেহেতু এই বেড়ে ওঠা হয় অনেকটাই গোপন সংগঠনের মতো করে। সমাজের ‘নেগোশিয়েটর’ বা নাগরিক সমাজকে লীন করে দেওয়ার কারণে দ্বন্দ্ব নিরসনের আর কোনো পথও থাকে না। একইসঙ্গে শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমের অনুপস্থিতিও এ ক্ষেত্রে বড় সংকট তৈরি করে। বিপরীত গোষ্ঠীর প্রচার ও প্রসার কার্যক্রম সমাজের ছোট ছোট কিন্তু প্রভাব সৃষ্টিকারী সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে লক্ষ্য করে চলতে থাকে মূলত সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে। ফলে এক বিরাট কিন্তু সংশয়জাগানিয়া তথ্যের জগতে প্রবেশ করে গোটা সমাজ, যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন হয়ে যায়—কোনটি তথ্য, কোনটি অপতথ্য, কোনটি বানোয়াট, কোনটি পূর্ণাঙ্গ মিথ্যা। এই বিভ্রমের মধ্যেই শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে আরেক একচেটিয়া ক্ষমতালিপ্সু গোষ্ঠী। সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারে না, তারা ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পড়তে যাচ্ছে।

গবেষকেরা বলছেন, গণতান্ত্রিক কিংবা সামরিক হোক, একচেটিয়া শাসন মূলত এক প্রলম্বিত কর্তৃত্ববাদের সূচনা করে। এ ক্ষেত্রে মসনদে বসা লোকটি বদলালেও শাসনের ধরনে কোনো বদল আসে না। এক কট্টরের বিপরীতে আসে আরেক কট্টর। বিশ্বের লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া প্যাসিফিকসহ নানা অঞ্চলে বিদ্যমান সামরিক বা ছদ্ম গণতান্ত্রিক একচেটিয়া শাসনের অধীনে থাকা দেশগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যাবে। এমন খুব কম উদাহরণ আছে যে, একটি একচেটিয়া শাসনের অবসান হয়ে রাতারাতি কোনো দেশ গণতান্ত্রিক দেশে বদলে গেছে।

বেশি নয়, শুধু আফ্রিকার দিকে তাকালেই বিষয়টি বোঝা যাবে। কিংবা লাতিন আমেরিকার উদাহরণও এখানে টানা যেতে পারে। এ দুই অঞ্চলের কোনো দেশই একবার একচেটিয়া শাসনে প্রবেশ করে আর বের হতে পারেনি। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ২০১০–১১ সময় থেকে পশ্চিমা ব্যবস্থাপত্র মেনে যে ‘আরব বসন্ত’ হয়েছিল, তাও এই ভবিতব্যের কোনো বদল ঘটাতে পারেনি। উদাহরণ চাইলে চোখের সামনেই আছে কঙ্গো, রুয়ান্ডা, তিউনেশিয়া, চাদ, মালি, এল সালভাদর, মিশরসহ আরও বহু দেশ। আগ্রহীরা এসব দেশে প্রথম একচেটিয়া শাসন ও তা হটিয়ে আসা পরবর্তী সরকারগুলোর চরিত্রের খোঁজ নিলেই বুঝতে পারবেন।

ফলে একচেটিয়া শাসনে বীতশ্রদ্ধ হয়ে এর বিরোধিতার সময়ও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, নইলে কুমিরের হাত বেঁচে বাঘের পাল্লায় পড়ার দশা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি ভূমিকা নিতে হয় নাগরিক সমাজকে, যাদের হাস্যকর বা অকার্যকর করে দিয়েই শাসনের একচেটিয়াকরণ ঘটে। কিংবা বলা যায় সংবাদমাধ্যম ও সমাজের প্রগতিশীল অংশের কথাও। একচেটিয়া শাসনব্যবস্থায় এর সবগুলোই প্রান্তবাসী হতে বাধ্য হয়। কিন্তু এদেরই দায় পড়ে, এর মধ্যেই যতটা সম্ভব মধ্যম অবস্থানটি অন্তত ধরে রাখা, যাতে চূড়ান্ত দ্বন্দ্বে আরেক একচেটিয়া শাসনকে স্বাগত জানাতে না হয়। বাংলাদেশও নিশ্চয় তেমন কোনো গাড্ডায় আবার পড়বে না–এমনটাই আশা।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের চিরন্তন দ্বৈরথের বাইরে এসে বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন ফুটবল বসন্ত। কোনো পূর্বপুরুষের প্রভাব ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দে একটি দেশের নতুন প্রজন্ম পর্তুগালের লাল-সবুজ...
ধরুন, আজ হাসপাতালে এক শিশু জন্ম নিলো। সাথে সাথেই হাসপাতাল থেকে তার নামে একটি আইডি খোলা হবে। যা সরাসরি জাতীয় সার্ভারে আবেদন আকারে যুক্ত হয়ে যাবে। সরকার বা অ্যাডমিন কর্তৃপক্ষ সেই আবেদনের সব তথ্য...
বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
কৃষক কার্ড যদি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও তথ্যভিত্তিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি কৃষি খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারবে। চাহিদাভিত্তিক ভর্তুকি প্রদান, সরাসরি সহায়তা স্থানান্তর,...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর