“দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা”—একটি বহুল পরিচিত বাংলা বাগধারা। এটি যেন বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন অমুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে দলের প্রার্থী হিসেবে ডুমুরিয়া উপজেলা জামায়াতের হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি দলের নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এদিকে সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রংপুর ও ঝালকাঠিসহ বিভিন্ন জেলায় আরও কিছু অমুসলিম জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন। দলে যোগ দেওয়া এই ব্যক্তিরা সবাই হিন্দু। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই দল ইসলামি আদর্শ অনুসরণ করে থাকে।
দৃশ্যত, কৃষ্ণ নন্দীর মনোনয়ন এই বার্তাই দেয় যে সব ধর্মের মানুষের জন্যই জামায়াতে ইসলামীর দরজা উন্মুক্ত। জামায়াতে ইসলামীও এই পদক্ষেপকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অগ্রগতি বলছে। এটি প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক। ২০০৮ সালে জামায়াতে ইসলামী দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে অমুসলিমদের আনুষ্ঠানিকভাবে দলে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান যুক্ত করে। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) শর্ত অনুযায়ী দলীয় গঠনতন্ত্রকে দেশের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং ধর্মীয় বৈষম্য দূরীকরণের বাধ্যবাধকতার কারণে এই পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বহাল থাকে।
তবে দলের গঠনতন্ত্রের ভূমিকা, মৌলিক বিশ্বাস ও দিকনির্দেশনামূলক নীতিমালা এবং কঠোর সদস্যপদ শর্তাবলি মনোযোগ দিয়ে পড়লে এটি স্পষ্ট হয় যে অমুসলিমদের জন্য জামায়াতে ইসলামীতে পূর্ণ সদস্য হওয়া কার্যত অসম্ভব। গঠনতন্ত্রের মৌলিক ও ব্যাপক সংশোধন না আনলে সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত সংগঠন হিসেবে জামায়াতের আত্মপ্রকাশ সম্ভব হবে না। একটি রাজনৈতিক দলকে অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হয়, যেখানে সব নাগরিক যোগ দিতে পারেন।
জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক কিংবা যেকোনো অমুসলিম ব্যক্তিকে দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে: “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সহিত একমত পোষণ করিলে বাংলাদেশের যে কোন অমুসলিম নাগরিক ইহার সহযোগী সদস্য/ সদস্য হইতে পারিবেন।”
এই শপথের মাধ্যমে একজন অমুসলিম ব্যক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শৃঙ্খলা ও সিদ্ধান্তসমূহ পূর্ণ আনুগত্যের সঙ্গে মেনে চলার অঙ্গীকার করেন। তিনি দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিষ্ঠার সঙ্গে ভূমিকা রাখার ঘোষণা দেন এবং অবৈধ উপার্জনের যেকোনো পথ পরিহার করার অঙ্গীকারও করেন।
দলের গঠনতন্ত্রের ‘মৌলিক বিশ্বাস’ অংশে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শকে সুস্পষ্টভাবে কঠোর ইসলামি পরিভাষায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সেখানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তকে দলের পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ভূমিকায় বলা হয়েছে—আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই; সব প্রাকৃতিক আইন একমাত্র তাঁর দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত, নির্ধারিত ও পরিচালিত; এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য প্রেরিত নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শেষ ও চূড়ান্ত নবী। এতে আরও ঘোষণা করা হয়েছে যে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কোরআন এবং হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনই মানবজাতির জন্য অনুসরণযোগ্য একমাত্র আদর্শ ও জীবনব্যবস্থা। এ ধরনের শর্ত অমুসলিমদের পক্ষে মানা কার্যত অসম্ভব।
দলে পূর্ণ সদস্যপদ লাভের জন্য ইসলামি অনুশাসন পালন করাও বাধ্যতামূলক। দলের গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, কেউ তখনই দলের সদস্য বা ‘রুকন’ হতে পারবেন, যদি তিনি সব ফরজ ও ওয়াজিব আদায় করেন; আল্লাহর আনুগত্যের পরিপন্থী কোনো আয় ও আচরণ থেকে বিরত থাকেন; এবং যেসব সংগঠনের নীতি ইসলামবিরোধী, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিহার করেন।
একইভাবে, দলের গঠনতন্ত্রের ৯ নম্বর ধারায় সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে ইসলামি অনুশীলন ও বিধিবিধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, একজন সদস্যকে আল্লাহ নির্ধারিত ‘শরিয়তের সীমারেখা’ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে; কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিজের বিশ্বাস, ইমান, চিন্তাধারা, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ড গড়ে তুলতে হবে; ইসলামি উদ্দেশ্য ছাড়া আল্লাহর অবাধ্য ব্যক্তি এবং পথভ্রষ্টদের সঙ্গে সব ধরনের স্নেহ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরিহার করতে হবে; মুমিনদের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে; এবং ইসলামের মৌলিক নীতিসমূহের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে।
এই শর্তগুলো কেবল আদর্শগত নয়, বরং ধর্মীয় ও অনুশাসনভিত্তিক। এর ফলে অমুসলিমদের জন্য দলে পূর্ণ সদস্যপদ পাওয়া কার্যত অসম্ভব এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ কেবল মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই সব বৈপরীত্য জামায়াতে ইসলামীর অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবমূর্তি তৈরির প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছে। এটি দলের রাজনৈতিক সুবিধাবাদকেও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এসব বৈপরীত্য প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের একটি ব্যাখ্যায় দেখা যায়, যদিও নাগরিকদের সংগঠন বা সমিতি গঠনের স্বাধীনতা রয়েছে, তবে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষ, জন্মস্থান বা ভাষার ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো সংগঠনের ক্ষেত্রে এই অধিকার প্রযোজ্য নয়।
অন্তর্ভুক্তিমূলকতার এই নীতিটি দেশের নির্বাচনী আইনেও প্রতিফলিত হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০সি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, ভাষা বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যের উপস্থিতি থাকলে সেই দল নিবন্ধনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
এখন সময় এসেছে জামায়াতে ইসলামীর এক সঙ্গে দুই নৌকায় পা না দিয়ে একটি নৌকায় দাঁড়ানোর। দুই নৌকা কখনোই একই গতিতে, একই দিকে এগোতে পারে না। দলটিকে একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি গণতন্ত্রের কাঠামোর ভেতরে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি, অর্থাৎ একটি “মধ্যপন্থী ইসলামপন্থী” দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, নাকি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে ইসলামি আদর্শ সংযোজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া একটি ধর্মভিত্তিক সত্তা হিসেবেই থেকে যেতে চায়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, জামায়াতে ইসলামী ১৯৪১ সালে লাহোরে মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল আলা মওদুদির নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে একটি ইসলামি আন্দোলন সূচনার লক্ষ্যেই দলটির যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর জামায়াতে ইসলামী ভেঙে যায়। দিল্লিভিত্তিক জামায়াতে ইসলামী হিন্দ এবং লাহোরকেন্দ্রিক জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা সংগঠনের জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তান শাখা থেকেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আত্মপ্রকাশ করে।
উপমহাদেশের ইতিহাসে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে জামায়াতে ইসলামী জনপ্রিয় রাজনৈতিক দাবির বিপরীত অবস্থান নিয়েছিল। ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা। দলটি যুক্তি দিয়েছিল জাতিগত পরিচয়, ভৌগোলিক বা ভাষার ভিত্তিতে গঠিত কোনো রাষ্ট্র ইসলামি ঐক্যকে ক্ষুণ্ণ করবে। একইভাবে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করে জামায়াতে ইসলামী দাবি করে যে এ ধরনের পদক্ষেপ মুসলিমদের রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল করবে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে থাকা বেসামরিক মানুষ হত্যায় জড়িত আধাসামরিক বাহিনী গঠনের অভিযোগ ওঠে।
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



