‘প্রতিযোগিতা’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। বিশেষত মুক্তবাজার অর্থনীতির যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিযোগিতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। বাংলাদেশের বাজারও মুক্ত। আর গণতন্ত্র এখানকার জনপরিসরে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দগুলোর একটি। ফলে প্রতিযোগিতার সাধারণ নিয়মের প্রতি ধরেই নেওয়া যায় যে, এখানকার মানুষের একটা শ্রদ্ধাভাব থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা আছে কি?
একটু উদাহরণ দেওয়া যাক। বরিশাল নগরীর কাশিমপুর বাজারে কম দামে মরিচ বিক্রি করতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে এক সবজি বিক্রেতা নিহত হয়েছেন। শুধু তাই নয় আহত হয়েছেন চারজন। অর্থাৎ, মরিচের দামকে কেন্দ্র করে একটা বেশ হুজ্জত সেখানে হয়েছে, যা সংঘাতে গড়িয়েছে। আর বরাবরের মতোই বাংলাদেশে হওয়া যেকোনো সংঘাতের মতো এটিও নিষ্ফল যায়নি। ফল হিসেবে একজনের মরদেহ আমাদের সামনে এসেছে। আর চারজন পেয়েছে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানা। আজ শনিবার হওয়া এ ঘটনা স্পষ্টত বলে দিচ্ছে যে, প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতার জায়গায় থাকেনি।
একজন সবজি বিক্রেতা যখন কম দামে মরিচ ও সবজি বিক্রির জন্য ক্রেতা আকর্ষণ করছিলেন, তখন অন্য বিক্রেতারা তার প্রতিবাদ করেছেন। এ থেকেই বিতণ্ডা, যা ছুরিকাঘাত পর্যন্ত গড়ায়। কম দামে সবজি বিক্রি করা সোহেল রানাই ছুরিকাঘাত করেন। এ ঘটনায় একজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন চারজন। নিত্য যে খবর আসছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে, তাতে এ ঘটনা তেমন বিশেষ কিছু হয়ে ওঠে না হয়তো। কিন্তু স্থির হয়ে বসে ভাবতে গেলে কপালে ভাঁজ ফেলে। কারণ, এই ঘটনা বলে দিচ্ছে আমরা একেবারে গোড়া থেকে কেমন যেন অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছি।
প্রতিযোগিতা চলার কথা প্রতিযোগিতার নিয়মে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় কেউ কম দামে কোনো পণ্য বিক্রি করলে তা নিয়ে অন্য বিক্রেতারা নিজেদের ব্যবসা নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভুগতে পারেন। পারলে নিজের পণ্যের দাম কমিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চেষ্টা করতে পারেন। কিংবা অন্য কোনো বিপণন পরিকল্পনা নিতে পারেন। কিন্তু এতে কারও ওপর চড়াও হওয়া অন্তত যায় না। কিন্তু এমনটাই হয়েছে। এবং এতে যার ওপর চড়াও হয়েছে সবাই জোট বেঁধে, সেই ব্যক্তিই হন্তারকের ভূমিকা নিয়ে নিয়েছে শেষে।
এই খবর যখন এসেছে, তখন অবশ্য এটি অন্য আরও উত্তেজনাকর খবরের আড়ালে পড়ে গেছে। রাজনীতির মাঠ সময়ের সাথে উত্তপ্ত হচ্ছে কে না জানে। শনিবার যেমন দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলকে একসাথে মাঠে দেখা গেল। প্রথমটি হয়েছিল আগের দিনই; অর্থাৎ শুক্রবার। একদল এক দফা দাবিতে সমাবেশ করেছে। অন্য দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন শান্তি সমাবেশ করেছে। অনেক উৎকণ্ঠা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তেমন অঘটন হয়নি। কিন্তু পরদিন শনিবারও যখন দল দুটির পক্ষ থেকে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা এল, তখন সাধারণ জনগণ প্রমাদ গুনতে বাধ্য হলো। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ডিএমপির বারণ শুনে এক দল নিজেদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে। অন্যদল কোনো কথাই শোনেনি। তারা মাঠে নেমেছে। ফল: ঢাকার চার প্রবেশ পথে বিস্তর হুজ্জত হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি রাজনীতির মাঠে প্রতিযোগিতারই অংশ। প্রতিটি দলই নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের কর্মসূচির দিকে জনগণকে আকৃষ্ট করতে চায়। বিষয়টি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার কিছু থাকত না। কিন্তু এখানে থামছে না। থামছে না যে, তা বিভিন্ন এলাকায় হওয়া অনভিপ্রেত ঘটনাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। অনেক মানুষ আজ আতঙ্ক নিয়ে পথে বেরিয়েছে। অনেকে হয়তো পথে পাওয়া ভয়কে বুকে নিয়েই ঘরে ফিরেছে। এই ভয় নিয়ে ঘরে ফেরা বা আতঙ্ক নিয়ে ঘর থেকে বেরোনো মানুষদের অনেকের সাথেই হয়তো এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির কোনো যোগ ছিল না। যতটা যা যোগ তা হলো, তারা একটি সংঘাতের ঘেরাটোপে না চাইতেই ঢুকে পড়েছিল, যা আদতে সংঘাত না হয়ে প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা ছিল।
প্রথম উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। কম দামে সবজি বিক্রি করা ব্যক্তিটি ক্রেতা আকর্ষণে এগিয়ে ছিল। এটিই ওই এলাকার অন্য সবজি বিক্রেতাদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে গিয়েছিল। তারা বাজারের নিয়ম মেনে নিজেদের সবজির মান-দাম ইত্যাদি নিয়ে চিন্তিত না হয়ে ওই ব্যক্তিকে নিয়েই চিন্তিত হয়ে পড়েছিল বেশি। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতার নিয়ম না মেনে, সামাজিক রীতি-নীতি ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে তারা ওই সবজি বিক্রেতা সোহেল রানাকেই হটিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু সোহেল রানা তা মানবেন কেন? মানেননি। তিনিও আপস-মীমাংসায় না গিয়ে, বিরোধ নিষ্পত্তির চলতি পথে না হেঁটে অন্যদের আঘাত করেছেন। ছুরি দিয়ে করা ওই আঘাত একটা অনাচার ঘটিয়ে ফেলেছে শেষব্দি। সে সময় ওই বাজারে বা ওই এলাকায় থাকা সাধারণ মানুষের কী হাল হয়েছিল সেটা সহজেই অনুমেয়। চোখ বুঁজে বলে দেওয়া যায় যে, সে সময় সাধারণ পথচারীদের মধ্যে, সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে গিয়েছিল। অথচ উভয় পক্ষই ক্রেতা আকর্ষণের জন্যই কিন্তু কাজটা করেছিল।
সোহেল রানার পিঠ কতটা দেয়ালে ঠেকেছিল, তাঁর ঘরের হাড়িতে কতটা ভাত ছিল, সেসবের খোঁজ না নিয়েই বলে দেওয়া যায় যে, তিনি ঠিক করেননি। প্রতিযোগিতা কখনো সংঘাতের সমার্থক হতে পারে না। কোনো প্রেক্ষাপটেই নয়। অথচ দিনদিন আমাদের সমাজে প্রতিযোগিতা আর সংঘাত যেন সমার্থক হয়ে উঠছে। সেটা সবজি বিক্রি, কিংবা প্রেম নিবেদন, কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মাঠ অবধি। এ অবস্থান থেকে আমরা সরে না এলে, সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া এ ব্যধির সঠিক সুশ্রুষা না হলে সংকট বৃদ্ধি ছাড়া কমবে না। সংঘাত থেকে হত্যা ক্রমশ একটি স্বাভাবিক ঘটনায় পর্যবসিত হবে। সমাজও নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবে।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
আরও পড়ুন:


মরিচ বিক্রি নিয়ে মারামারি, ছুরিকাঘাতে সবজি বিক্রেতা নিহত
