পুরুষ তুমি উত্তম না হতে পার অধম হয়ো না

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:০৮ পিএম

প্রতিদিন যুদ্ধ করে পাবলিক বাসে উঠতে হয় নারীদের । ফাইল ছবিঅফিসে যাওয়ার এক সকালের কথা। বেশ তাড়াহুড়ো করেই গেলাম বাসস্ট্যান্ডে। গিয়েই দেখি লম্বা লাইন। লম্বা মানে, বেশ বেশ লম্বা। সবাই অফিসগামী, আর বাস নামের সোনার হরিণের দেখা পাওয়ার জন্য অপেক্ষারত। টিকিট কেটে সেই লম্বা লাইনেরই শেষে গিয়ে ঠাঁই নিতে হলো।

ঠাঁই নেওয়ার পর শুরু হলো চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত চোখে বাসের আগমন পথের দিকে চেয়ে থাকা। দুটি বাস যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পর আধা ঘণ্টার অপেক্ষা শেষে তৃতীয় বাসে অবশেষে পা রাখা গেল। চেপেচুপে একটু বসার জায়গাও জোগাড় হলো। অনেকেরই অবশ্য সে সৌভাগ্য হয়নি। তাঁরা বাদুড়ঝোলা হয়েই রইলেন। কী আর করা! এত ঘন জনবসতির দেশে এটুকু তো মেনে নিতেই হয়। সবার মনে নিশ্চয়ই তখন আমার মতোই সঠিক সময়ে কর্মক্ষেত্রে পৌঁছানোর তাড়াটাই বেশি ছিল। সেই তাড়াতেই হয়তো অন্যান্য ঠেলাঠেলি ভুলে যাওয়া সম্ভব হয়েছিল অবলীলায়। রুটি-রুজি টিকিয়ে রাখা বলে কথা!

কিন্তু ছন্দপতন ঘটল বাস হেলেদুলে কিছুটা এগোনোর পরপরই। আমার সিট জুটেছিল বাসের মাঝামাঝি। একেবারে বাসের সামনের গেটের কাছে ভেসে আসছিল হট্টগোলের শব্দ। পুরুষকণ্ঠের চিৎকার। বলছিলেন, ‘মহিলাদের বসার জায়গা, তো কি হয়েছে? আমরা কি বসতে পারি না? মহিলা আসলেই কি উঠে যেতে হবে নাকি? কেন উঠব আমি? ওনারা কি এসব সিট ছাড়াও অন্য সিটে বসে না?’

হই-হট্টগোলে কান পেতে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, ওই পুরুষটি নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত সিটে বসেছিলেন। একজন নারী যাত্রী বাসে উঠে সেখানে বসতে চাওয়ার পরই এই রূদ্রক্রিয়া। এবং শুধু ফেটে পড়াই নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পুরো রাস্তাজুড়েই তিনি তাঁর বাক্যবাণ ছুঁড়েই গেলেন। যতই তাঁকে বাসের চালকের সহকারী বা সহযাত্রীরা বোঝাতে চাইলেন না কেন, ওনার মুখ টি টোয়েন্টি স্টাইলে ব্যাটিং করে চলেছে! অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছে গজগজ করতে করতে বাস থেকে নেমে তিনি আমাদের রেহাই দিলেন।

যে নারীর কারণে ওই পুরুষের এত চেঁচামেচি, তাঁর মুখের দিকে তখন তাকানো যাচ্ছিল না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় চলতি পথে এমন অপমানের আশঙ্কা তিনি নিশ্চয়ই করেননি। পান্ডুর সেই মুখে কেবলই ছিল অব্যক্ত ক্ষোভ। একজন পুরুষ যেভাবে শুধু ন্যায্য অধিকার চাওয়ার কারণে তাঁকে নিদারুণ অপমান করে গেলেন, তা কে-ই বা সহ্য করতে পারবেন! কিন্তু এর প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে তাঁকে আরও কটুকথা সহ্য করতে হলো। সাত সকালের এই ঘটনার পর হয়তো সারাটা দিনই তিনি বিষণ্ণ থাকবেন, কাজেও নিশ্চয়ই প্রভাব পড়বে। চোখের কোণে জলও জমবে। আর হৃদয়ে এই দেশের পুরুষ জাতির জন্য বিবমিষা যে জমবে, তা নিশ্চিত।

আপনি বলতেই পারেন, এমনটা কি সব পুরুষই করে নাকি! সবাই তো আর খারাপ নন। অনেকেই আছেন যারা নারীদের বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে নিজে থেকেই সিট ছেড়ে দেন। হ্যাঁ, তা কেউ কেউ দেন বটে। তবে শতাংশের হিসাবে তা এতটাই কম যে, মুখ ঝামটা আর অপমানটাই চোখে লাগে বেশি।

গণপরিবহনে সিটে বসা নিয়ে নারীর প্রতি এমন বিরূপ ও প্রবল প্রতিপক্ষসুলভ আচরণের পরিসংখ্যানভিত্তিক প্রমাণও আছে। গত বছরের জুন মাসে আঁচল ফাউন্ডেশন আজিমপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকার স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী নারী ও কিছুসংখ্যক গৃহবধূর ওপর জরিপ পরিচালনা করে। জরিপের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রাজধানীতে গণপরিবহনে এর আগের ৬ মাসে ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন। এর মধ্যে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশকে যৌন হয়রানির শিকার হন। ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ বুলিং, ১৫ দশমিক ২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য, ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ লিঙ্গ বৈষম্য এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশের সঙ্গে বডি শেমিংয়ের শিকার হন।

অর্থাৎ, নারীর প্রতি এই ঢাকা শহরের পুরুষের প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ শুধু মুখ ঝামটা আর স্থুল অপমানেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং বুলিং ও হয়রানিসহ নানান মাত্রা পেয়েছে। নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য সংরক্ষিত আসন দখল করে বসা পুরুষেরা এই বুলিং, হয়রানি, সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্যের সব কিছুই ‘প্র্যাকটিস’ করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তাদের একটি অন্যতম প্রধান যুক্তি হলো, সংরক্ষিত আসন ছাড়া অন্য আসনে যদি নারীরা বসতে পারেন, তবে তাদেরও সংরক্ষিত আসনে গেঁড়ে বসার অধিকার আছে! কিন্তু মহাশয়েরা, সংরক্ষিত আসনগুলো তো নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষাকবচ হিসেবেই সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এর বাইরে যেসব সিট থাকছে, সেগুলো উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। আগে আসলে, আগে পাবেন ভিত্তিতে সবারই সেখানে বসার অধিকার রয়েছে। সেখানে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ করার কোনো সুযোগ তো নেই। তাহলে এসব খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে অন্যের অধিকার নিয়ে এত হল্লা কেন?

আবার সংরক্ষিত ছাড়া গণপরিবহনের অন্যান্য সিটে বসতে গেলেও প্রায়ই কথা শুনতে হয় নারীদের। তখন কোনো কোনো পুরুষ যাত্রী দেখিয়ে দেয় সংরক্ষিত সিটগুলোকে। অর্থাৎ ডানে গেলেও সমস্যা, বাঁয়ে গেলেও সমস্যা। তাহলে, মা-বোনেরা বসবে কোথায়? নাকি তাদের দাঁড় করিয়ে রাখাতেই আমাদের অপার আনন্দ?   

আমাদের দেশে সম্পদের অপ্রতুলতা থাকার কারণে একটু টানাটানি তো হবেই। সেক্ষেত্রে সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হওয়ার বিকল্প নেই। অথচ গণপরিবহনে সিটে বসাকে কেন্দ্র করে এই ঢাকা শহরের বেশির ভাগ পুরুষ যে চরম অসহনশীল আচরণ করেন, তাতে মনে হয়, তারা হয়তো ভুলেই গেছেন যে, তাদের পরিবারেও মা-বোন আছেন। তাদেরও হয়তো জীবনের প্রয়োজনে গণপরিবহনে উঠতে হয় মাঝে মাঝেই। তাদের সাথেও যদি কোনো পুরুষ এমন অপমানজনক আচরণ করেন, তখন কেমন লাগবে আসলে? শুধু সিটে বসাকে কেন্দ্র করে মা-বোনেরা অযথা একরাশ অপমানের পাঁক মেখে বাড়িতে ফিরে যদি অতি বিষণ্ণ মুখে তাদের সামনে এসে বসেন, তখন কি সেই চাহনি সহ্য করা যাবে?

এই মহানগরের তাবৎ অসহনশীল ও সুযোগ পেলেই গণপরিবহনে নারীদের হেনস্তা করা পুরুষদের মনের দপ্তরে ওপরের প্রশ্নগুলো জমা রাখার দরখাস্ত রইল। সুযোগ পেলে তাঁরা যেন সেসবে একটু চোখ বুলিয়ে নেন। এক সেকেন্ডের জন্য হলেও যেন তাঁরা এগুলো হৃদয়ে নেন। আর গণপরিবহনে অন্যের মা-বোনকে যেকোনো ধরনের হেনস্তা করার সময় একবার হলেও যেন নিজের মা-বোনের কথা ভাবেন। তাদের মুখচ্ছবিটা মাথায় থাকলেই হবে। তাহলেই অন্তত অন্যের প্রিয়জনকে অপমান করাটা কমতে পারে। বাসে আরেকজনের প্রিয়জনকে বসতে দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাকে তখন আর অমর্যাদা মনে হবে না। আর এর বদলে পুরুষেরা পাবেন অন্যের চোখে ‘নিপীড়ক’ না হওয়ার শান্তি। রাতের ভালো ঘুমের জন্য এটুকু শান্তি তো প্রয়োজন, নাকি?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন  

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তাঁর আত্মসমর্পণের...
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের চিরন্তন দ্বৈরথের বাইরে এসে বাংলাদেশে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন ফুটবল বসন্ত। কোনো পূর্বপুরুষের প্রভাব ছাড়াই, সম্পূর্ণ নিজস্ব পছন্দে একটি দেশের নতুন প্রজন্ম পর্তুগালের লাল-সবুজ...
চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দীর্ঘদিন ধরেই একটি মৌলিক নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আর তা হলো ‘সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।‘ কিন্তু বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পরিবর্তন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শক্তির...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর