মঙ্গলীদের মাথা ফাটিয়ে কার মঙ্গল হচ্ছে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৪৪ পিএম

মঙ্গলী বাগচী ফাটা মাথা নিয়ে হাসপাতালে। তার শয্যাশায়ী ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁকে নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন। সব কথা ইতিবাচক নয়। মঙ্গলী বাগচী ফুটবল খেলেন। বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠার তপস্যায় রত সে। কিন্তু তার মাথা ফুটবল মাঠে খেলার সময় ফাটেনি। তবে ফুটবলের জন্যই ফেটেছে।

মঙ্গলী ফুটবল খেলেন। খুলনার বাটিয়াঘাটা উপজেলার তেঁতুলতলার একটি মাঠে অনুশীলন করে মঙ্গলী। তারই সতীর্থ সাদিয়া নাসরিন। সাদিয়া খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব ১৭ দলের খেলোয়াড়। খেলার মাঠে সাদিয়ার অনুশীলনের ছবি নূপুর খাতুন নামের এক নারী তুলে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যসহ পাঠিয়ে দেন সাদিয়ার মা এবং আত্মীয়স্বজনদের কাছে। মঙ্গলী এর প্রতিবাদ করেছে বলেই সে আজ মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে হাসপাতালের বেডে শুয়ে।

গত ২৯ জুলাই নূপুর খাতুন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হামলার শিকার শুধু মঙ্গলী হয়নি। চারজন প্রতিভাবান নারী ফুটবলার সেদিন হামলার শিকার হয়েছিল। সাদিয়া, মঙ্গলীর সাথে আক্রান্ত হয়েছিল জুঁই মন্ডল ও জারা হাজরা। তাদের অপরাধ কী ছিল? ফুটবল খেলা? নাকি হাফপ্যান্ট পরে ফুটবল খেলা?

এক কথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, দুটোই। দেশে নারী অগ্রগতির হাজারটা গল্পগাথা শোনা গেলেও, বছর বছর অগ্রগামী নারীদের মধ্যে সেরাদের বাছাই করে জয়িতা পুরস্কার দেওয়া হলেও বাস্তবতা হচ্ছে এখনো নারীকে ‘অবরোধবাসিনী’ হিসেবেই যেন সবাই দেখতে চায়। হাজারটা বাধা ডিঙিয়ে কোনো নারী যখন বড় কোনো অর্জন নিয়ে সামনে হাজির হন, তার জন্য আমরা হয়তো গদগদ হই, তার সব অর্জনকে নিজেদের অর্জন হিসেবে দেখাতে চাই, কিন্তু মন থেকে আমরা তা ঠিক মেনে নিতে পারি না।

এই তো কিছুদিন আগে আমরা সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন নিয়ে হইচই করেছি। হুডখোলা বাসে আমাদের নারী ফুটবল দলকে অভিবাদন জানিয়েছি। সেই অভিবাদন দেখে হাজারটা বাধা পেরিয়ে ফুটবল বা অন্য কোনো খেলার অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া মেয়েদের কারও কারও চোখের কোণে হয়তো জল এসেছিল। হয়তো তারা ভেবেছিল, বাজে দিনগুলো এই বোধ হয় বিদায় নিল। কিন্তু সেটা যে শুধুই একটা হুজুগ ছিল, তা ২৯ জুলাইয়ের ঘটনা সাফ জানিয়ে দিচ্ছে।

লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে সাদিয়া বা মঙ্গলীদের ফুটবল খেলা নিয়ে আপত্তিটি প্রত্যক্ষভাবে এসেছে আরেকজন নারীর কাছ থেকে। তিনি নূপুর খাতুন। কিন্তু আসলেই কি নূপুর খাতুন একাই এই আপত্তি তুলেছেন? না। নূপুর সে কথাই বলেছেন বা সে কাজই করেছেন, যা তাঁকে এই সমাজ শিখিয়েছে। আরও ভালো করে বললে পুরুষতন্ত্র। নূপুর খাতুন হলেন এই পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শিকারদের একজন, যাকে শেখানো হয়েছে নারীর গণ্ডি। নূপুর খাতুনের চারপাশে এই সমাজ ও রাষ্ট্র সন্তর্পণে এঁকে দিয়েছে সেই গণ্ডির রেখা, যা ডিঙানো মানা। কিন্তু মঙ্গলী, সাদিয়া, জারা বা জুঁইরা তো স্বপ্নবাজ। আর কোন স্বপ্নবাজ কবে গণ্ডি ভাঙেনি? এটাই মানতে পারেননি নূপুর। তিনি যা করতে পারেননি বা পারেন না, তা অন্য কেউ কেন করবে, সে প্রশ্নের উত্তর তিনি পাননি। ফলে নিজেই হোক বা অন্য কারও উসকানিতেই হোক কাজটা তিনি করেছেন।

সাদা চোখে মনে না হলেও এই নূপুর খাতুনই আসলে এই সমাজের সবচেয়ে বড় ভিকটিম, যাকে অন্ধ ও নৃশংস করে তুলতে পেরেছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র জারি রাখা ও একে পুষ্টি জুগিয়ে চলা অগণিত পুরুষের সঙ্গী হিসেবে নূপুর খাতুনের মতো নারীরা অন্য নারীদের আঘাত করে বা আঘাত করার সুযোগ করে দিয়ে অনবরত নিজের পায়ে কুড়াল মারার কাজটি করে যাচ্ছেন। তাদের মাথা এতটাই অন্তঃসারশূন্য করে ফেলা গেছে যে, নিজেদের এই পুতুল ভূমিকা তারা এমনকি আর শনাক্তও করতে পারে না। এর ফল ভোগ করতে হয় মঙ্গলীদের মতো কিশোরীদের।

মঙ্গলীসহ নারী ফুটবলারদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন হচ্ছে। বিবৃতি-নিন্দার মতো নানা নিয়মতান্ত্রিক ও গা বাঁচানো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন এরই মধ্যে অভিযুক্ত নূপুর খাতুনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্য অভিযুক্তরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে ছাড়া পেয়েছে। এ নিয়েও নানা নিন্দা ও সমালোচনা জারি রয়েছে। কিন্তু তাতে মঙ্গলীদের মুখে অ্যাসিড ছুড়ে মারার হুমকি থামেনি। থামেনি অভিযুক্তদের নিজেকে আঘাত করে মঙ্গলীদের গায়ে ‘হামলাকারী’ ট্যাগ সেঁটে দেওয়ার হুমকিও। মামলা তুলে নেওয়ার জন্য সামাজিক চাপ অব্যাহত আছে।

এসব নিয়ে দেশের ৪৫ বিশিষ্ট নাগরিক এরই মধ্যে নিন্দা জানিয়ে এবং অভিযুক্তদের বিচারের দাবি তুলে বিবৃতি দিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সেই বিবৃতি প্রকাশও হয়েছে। কিন্তু তাতে মঙ্গলীদের বাস্তবতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। হুমকি এখনো চলছে। অথচ শহুরে বুদ্ধিজীবী ও গণ্যমান্যরা এ নিয়ে উৎকণ্ঠা ও দাবিনামা পেশ করেই খালাস। এটাই হয়। আমরা উদ্বেগ প্রকাশকে রীতিমতো আর্টের পর্যায়ে নিয়ে গেছি।

অথচ এই মঙ্গলীরাই যদি আজ কোনো শিরোপা নিয়ে দেশে ফিরত, যা তারা ভবিষ্যতে হয়তো নিয়ে আসবে, তখন এই আমাদেরই অনেকে তাদের সাথে সেলফি তুলতে তৎপর হতো। সে জন্য তেরো নদী, সাত সমুদ্র পেরোনোর কষ্টও হয়তো আমরা স্বীকার করতাম। কিন্তু তাদের এই আক্রান্ত সময়ে আমরা বিবৃতিসর্বস্ব থেকেই খুশি থাকতে পারছি।

সত্যিকার অর্থে উদ্বেগ থাকলে আমরা শহরের নিরাপদ বেষ্টনিতে বসে শুধু বিবৃতি দিয়ে চুপ থাকতাম না। নিদেনপক্ষে মঙ্গলীদের পাশে থাকার বার্তা দিতে একবার হলেও তাদের সাথে সাক্ষাতের কষ্টটা করতাম। তাতে হুমকিবাজের দল অন্তত প্রমাদ গুণত, হুমকি দেওয়ার আগে দুবার অন্তত ভাবত। তাতে পুলিশ প্রশাসন ও সরকারি কৌঁসুলি অভিযুক্তদের বিষয়ে, মঙ্গলীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরেকটু সতর্ক হতো।

না, মঙ্গলীদের তো বটেই দেশের কোনো নারীর নির্যাতিত হওয়া নিয়েই আমরা আসলে উদ্বিগ্ন নই। আমরা শুধু উদ্বিগ্ন হওয়ার অভিনয় করি। সত্যিকারের উদ্বেগ থাকলে আমরা নিশ্চিতভাবেই নূপুর খাতুনদের কাছে অনেক আগেই পৌঁছে যেতাম। তাদের পুরুষতন্ত্রের ভিকটিম হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতাম, যাতে তারা অন্য কোনো নারীর নির্যাতিত হওয়ার অতি ক্ষুদ্র কারণও হয়ে উঠতে না পারে। কিন্তু আমরা তা করিনি, করি না। কারণ কী?

আমরা তো নিজেদের মঙ্গলকামী হিসেবেই দেখি। আমরা তো বিজ্ঞপ্তি-বিবৃতি, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে দেওয়া বক্তৃতায় বরাবরই নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর নিরাপত্তা ইত্যাদি নিয়েই কথা বলি। তাহলে তা নিশ্চিতে প্রশাসনের ওপর সত্যিকারের চাপ সৃষ্টির জন্য আমরা কেন মাঠে-ময়দানে যাই না। নারীর মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় আমাদের নিবেদন কি তবে ত্রুটিপূর্ণ? উত্তরটা সম্ভবত, হ্যাঁ। কিন্তু তারপরও আমরা মঙ্গলকামী বটে।

কিন্তু এ দুটি ঘটনা একসাথে কী করে ঘটে? ঘটতে পারে।  একটু উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, বুড়িগঙ্গা রক্ষা কমিটি নামে একটি কমিটি হলো। এই কমিটি চালাতে তহবিল লাগবে। কারণ এর সাথে অন্তত ৫০ জন লোক যুক্ত হয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা ইত্যাদির বিষয় আছে। ‘ঘরের খেয়ে মোষ তাড়ানো’ এখন সত্যযুগের বিষয়। ফলে সেটা অচল। তো এই ৫০ জনের আয়-রোজগার কী করে হবে? তহবিল পেলে। আর তহবিল আসবে কোথা থেকে? দেশি-বিদেশি বড় কোনো সংস্থা বা দাতা থেকে। তো তাদের আকৃষ্ট করার পদ্ধতি কী? খুব সহজ। নিজেদের সক্রিয়তাকে চাক্ষুষ করে তোলা। অর্থাৎ, যতক্ষণ বুড়িগঙ্গা আক্রান্ত হচ্ছে, তাকে দখল-দুষণে বিপর্যস্ত করে তোলা হচ্ছে, ততক্ষণই আসলে এই কমিটি প্রাসঙ্গিক।

এখন এই কমিটি যদি কোনোভাবে বেশি সক্রিয় হয়, এবং বুড়িগঙ্গা রক্ষায় সত্যিকার অর্থে কাজ করে, তবে একসময় গিয়ে বুড়িগঙ্গা সত্যিই সুরক্ষিত হবে। এমন একটা কাঠামো দাঁড়িয়ে যাবে, যাতে বুড়িগঙ্গা আর আক্রান্ত না হয়। তখন এই কমিটির ৫০ জনের কী হবে? তখন তো বুড়িগঙ্গার মঙ্গল করতে গিয়ে অর্থাগম বিবেচনায় নিজেদের অমঙ্গল হয়ে যাবে। তাহলে কি বুড়িগঙ্গার সত্যিকারের মঙ্গল আমাদের মতো প্রকল্পজীবীদের অমঙ্গলের কারণ? এই প্রশ্নে একটা নীরবতা নামল তো! নামারই কথা। এই নীরবতা ‘হিরন্ময়’ নয়; বরং ভীষণ ভীষণ রকমের বীবমিষা জাগানীয়া। এই বীবমিষা আমাদের জানিয়ে দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র শুধু নয়, নারীর আক্রান্ত হওয়ার সাথে আরও অনেকের মঙ্গল জড়িত।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

আরও পড়ুনঃ 

বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
সমাজের চোখে শিক্ষার্থী কী? এক কথায়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ। একদিন তারা সমাজ গড়বে, রাজনীতি বলুন, অর্থনীতি বলুন, কিংবা চিকিৎসা-সশস্ত্রবাহিনী-প্রশাসন বলুন… পুরো সমাজের নেতৃত্ব দেবে, এই স্বপ্ন দেখে বলেই তো...
সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনার ঝড় উঠেছে, সেটি আমাদের সামনে সেই প্রশ্নকেই ফের উসকে দিয়েছে। তিনি একটি ‘খোলা চিঠি’ লিখে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি...
নারীদের ছাড়া এ দেশে কোনো আন্দোলন হয়নি। সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, লড়েছেন। কিন্তু তারপর? রাজনীতিতে আসা নারীকে লক্ষ্যবস্তু করে কুরুচিকর সব বক্তব্য দেওয়া কি...
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আইআরজিসি।
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে ঘষামাজা করে চলছে আবারও চালুর প্রস্তুতি। তবে সংস্কারের কোনো অনুমতি ছাড়া এ ধরনের সংস্কারকাজ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে...
খুলনা ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ট্রলার ও ফেরি সংঘর্ষে হয়েছে। এতে ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছে কিনা তা...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর