শুরু হয়েছে টানা বৃষ্টি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। রাজধানী ঢাকায় একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় রাস্তায় পানি জমে যায়। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরেও চরম জলাবদ্ধতা প্রত্যক্ষ করছি আমরা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দিন দিনই যেন ভোগান্তি আগের তুলনায় বাড়ছে। হয়তো জেলি ফিশের স্মৃতিশক্তি নিয়ে জন্মানো এই আমাদের আগের বছরের কথা মনে থাকে না বলেই এমনটা হচ্ছে!
এমনটা হয়। প্রতিবারই মনে হয়, নাহ, আগের বছর তো এত বৃষ্টি হয়নি। এভাবে সব তলিয়ে যায়নি। কিন্তু কিছু ভোগান্তি হতেই থাকে আসলে। কেন ভোগান্তি হয়, কেন রাস্তায় পানি জমে– এসব নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলে যাচ্ছেন। সুতরাং সেসব আবার আলোচনায় তুললে তা চর্বিত-চর্বণ ছাড়া আর কিছু হবে না। তার বদলে বরং নতুন মোড়কের এক ভোগান্তির আলাপ করা যাক। তার আগে একটি ঘটনা শুনে নিন। বুঝতে সুবিধা হবে।
আমার এক পরিচিতজন। সম্প্রতি পরিবার নিয়ে তিনি এই ঢাকা শহরের এক প্রাণকেন্দ্রে গিয়েছিলেন এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। সেখানে থাকতে থাকতেই নামে ঝুম বৃষ্টি। খাওয়াদাওয়া এবং কুশল জিজ্ঞাসা ও আড্ডায় চলল সময় কাটানো। যদিও এই ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামলে যেকোনো মধ্যবিত্তের প্রধান চিন্তা দাঁড়ায় দুর্যোগের রাতে বাড়ি ফেরা নিয়ে। সেই চিন্তা মাথায় নিয়ে বেশি টাকা খসবে জেনেও ওই পরিচিতজন রাইড শেয়ারিং অ্যাপে গাড়ির খোঁজ করতে থাকেন। গাড়ি পাওয়াও যায়। তবে ড্রাইভার জানিয়ে দেন, তিনি আসবেন, তবে আরও দুই ঘণ্টা পর! এদিকে বাড়তে থাকে রাত। খোঁজা হয় সিএনজিও (ম্যানুয়ালি ও ডিজিটালি– দুভাবেই)। কিন্তু কেউই যেতে রাজি নন গন্তব্যে। অগত্যা অধিক দূরত্ব জেনেও ডাকা শুরু করতে হয় রিকশা। সেখানেও আবার রিকশাওয়ালার নানা নখরা এবং ১০০ টাকার ভাড়া দেড় শ-দুই শ চাওয়ার প্রবণতা। শেষমেশ ন্যায্য ভাড়ার দ্বিগুণ দিয়েই তাঁকে সপরিবারে ফিরতে হয় বাড়িতে।
এই বিশাল আলাপের মূল মাজেজা হলো, ঝড়-বৃষ্টির সময় রাজধানীর অবস্থা বোঝানো। চলাচলের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণেরা যে কতটা অসহায় বোধ করি, সেটাও বোঝানো। এই তো সেদিনের কথা। সকালে ঝুম বৃষ্টি। একটা সিএনজি ডাকা হলো অ্যাপে। সেই সিএনজির ড্রাইভার অনেকক্ষণ ঝুলিয়ে রেখে শেষে ক্যানসেল করে দিলেন রাইড। অ্যাপে যে ভাড়াটা চাওয়া হয়েছিল, তা বেশ যৌক্তিকও ছিল। কিন্তু ড্রাইভার আরোহী হিসেবে আমাকে পছন্দ করলেন না। বাতিল করে দিলেন। বাধ্য হয়ে আবার হাঁক দিলাম অ্যাপে। এবার ভাড়া দেখানো হলো আগের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। বুঝুন অবস্থা! এখন গরিবের তো শ্যাম রাখি না কূল রাখি পরিস্থিতি। বেশি টাকা দিতেও ওয়ালেটের সমস্যা, আবার না গেলে ওয়ালেট আর না ভরারও (বেকার আর কি) শঙ্কা!
তো এমন শাঁখের করাতে ইদানীং আমার মতো সাধারণেরা প্রায়ই পড়ছে। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের মানুষও কখনো কখনো এই শহরে ঝড়-জলের রাতে নিরাপদে বাসায় ফিরতে গণপরিবহন ছাড়া একটু বেশি দামি বাহন ভাড়া করার সাহস দেখাতে চান। সেই সাহস দেখাতে প্রয়োজনীয় খরচেও তারা পিছপা হন না। কিন্তু এই শহরের যান চলাচলের ‘অদ্ভুত’ ব্যবস্থা সেই খরচেও বাদ সাধে। অর্থাৎ, আপনি বেশি ব্যয় করতে চেয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবাটি নিতে পারছেন না। উল্টো আপনাকে ছাতা মাথায় হাঁটতে হবে। ঝড়ে উড়তে হবে, বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। এবং কাদাপানিতে মাখামাখি হতে হবে।
এ ক্ষেত্রে দোষ অধিক জনসংখ্যার ওপর চাপানো যায় বটে। সেটি অন্যতম একটি কারণও। তবে একমাত্র নয়। মূল রোগটি আসলে ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। আমরা নাগরিক চলাচলের যে ব্যবস্থা এই শহরে চালাচ্ছি, তাতেই গলদ। সেই গলদটি মূলত ঝোপ বুঝে কোপ মারার স্বভাব। তাই উবার ইউরোপে ঠিকমতো চললেও, এ দেশে চলে না। কারণ আমরা যারা চালাই, তারাই সেই অনুযায়ী নিজেদের পেশাদার করতে পারিনি। তাই মেঘ ডাকলেই বা বৃষ্টি দু-এক ফোঁটা পড়লেই আমরা ছোঁক ছোঁক করতে থাকি কারও পকেট কাটার জন্য বা চূড়ান্ত অসহযোগিতা করি বিপদগ্রস্তদের।
পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থাও এ ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও দায়ী। সেবা দেওয়ার নামে তাদের কোম্পানির নাম ব্যবহার করে যারা আয় করছেন, তাদের ‘ঠিক’ রাখার দায়ও কিন্তু তাদের। অর্থাৎ, কোয়ালিটি কন্ট্রোলের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেকটাই ঠিক হতে পারে বিদ্যমান ‘সিস্টেম’। আর সেই সঙ্গে আইনের সঠিক প্রয়োগ তো আছেই।
তবে পুরোপুরি ‘ঠিক’ করতে হলে, আগে আসলে আমাদের লাইনে আসতে হবে। আমাদের বুঝতে হবে, যিনি কোনো নির্দিষ্ট ট্রান্সপোর্ট সেবা কিনতে চাচ্ছেন, তিনি আমাদের মতোই মানুষ। তার প্রয়োজন আছে। আবার যিনি সেবা বিক্রি করছেন, তারও আয়ের প্রয়োজন আছে। বিষয়টি পুরোপুরি পারস্পরিক চাহিদা ও যোগানের পেশাদারত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে একজনকে ছাড়া আরেকজন টিকে থাকতে পারবে না। তাই সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।
এটুকু বুঝতে পারলেই কেবল দুর্যোগের রাতে যানবাহন উধাও হয়ে যাওয়ার ‘রহস্য’ ভেদ করা সম্ভব হবে। নইলে ঝড়-জলের মতো কিছু হলেই আমাদের সবার ছাতা ধরার বদলে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া উপায় থাকবে না।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন



