না না করলেও শেষ পর্যন্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি অংশ নেবে–এটা প্রায় সবারই জানা ছিল। জাতীয় পার্টি দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রিও শুরু করেছিল। কিন্তু বরাবরের মতোই ভোটে যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার মুলা ঝুলিয়ে রেখেছিল ক্ষমতাসীন দলটির সামনে। দলটি জানে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের কাছে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় পার্টির একটি সূত্র ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে জানিয়েছে, ভোটে যাব কি যাব না–এটা ছিল সরকারি দলের সঙ্গে দরকষাকষির একটা হাতিয়ার। দলটি এখন এককভাবে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে দরকষাকষি করেছে তাদের অন্তত ৫০টি আসনে ছাড় দেওয়ার জন্য। ওইসব আসনে ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রার্থী থাকবে না। এমনকি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী বা দলটির কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও থাকতে পারবে না। অবশ্য ক্ষমতাসীনরা এসব দাবিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চায়নি। তারা জাতীয় পার্টির দাবির একাংশ ছেড়ে প্রস্তুত। এতে দোটানায় পড়ে দলটি। সেজন্য ভোটে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে বিলম্ব করছিল তারা।
হঠাৎ কী এমন ঘটলো, যাতে করে জাতীয় পার্টি আজ বুধবার (২২ নভেম্বর) সকালে ভোটে অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে দিল। কয়েকদিন আগেই এই দলের মহাসচিব বলেছিলেন, নির্বাচনের পরিবেশ থাকলে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের সময়মতো ভোটে যাওয়ার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তার আগের মহাসচিব নিজেই জানালেন, চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তিনি জাতীয় পার্টির ভোটে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিচ্ছেন।
জানা গেছে, পরবর্তী নির্বাচনে কেবল জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ এখন আর ক্ষমতাসীনদের কাছে 'একমাত্র বিকল্প' নয়। নতুন রাজনৈতিক দল তৃণমূল বিএনপিকেও একটি বিকল্প হিসেবে ভাবা শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন জোট ভোটে অংশ নিচ্ছে। তাদের দরকার আরও কিছু দলের অংশগ্রহণ। বিশেষ করে এমন একটি দল বা জোট দরকার যারা সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্বপালন করবে। সেই দলে কিছু গ্রহণযোগ্য নেতাও থাকবেন, যাদের জাতীয় রাজনীতিতে মাঠ পর্যায়ে পরিচিত আছে। এই তালিকায় এখন তৃণমূল বিএনপি ছাড়াও বিএনএমের নাম আসছে। সেখান থেকে বিএনপির অনেক নেতা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহল থেকে এই বার্তা তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএমের কাছে পাঠানো হয়েছে যে, বড় পরিসরে তারা নির্বাচনে নামলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের বিরোধী দল হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তৃণমূল বিএনপির মহাসচিব ও বিএনপির সাবেক নেতা তৈমুর আলম খন্দকার ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ''হ্যাঁ, আমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে কথা হয়েছে। তবে রাজনীতির সব আলাপ তো প্রকাশ করা যায় না। আমরা সরকার দলীয়দের কাছে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস চেয়েছি। আরও বেশ কিছু বিষয় চেয়েছি। আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আশাকরি সংসদে বড় একটি অবস্থান নিয়ে তৃণমূল বিএনপি থাকবে।''
অন্যদিকে বিএনএমের সম্মেলন হচ্ছে আগামী শনিবার। সেখানেই নির্ধারিত হবে দলটির ভাগ্য। ওই দিন বিএনপির কয়েকজন নেতা এ দলে যোগ দিতে পারেন। একজন বড়মাপের নেতা যোগ দিতে পারেন বলে দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। আর সেটা হলে ওই নেতাই হবেন দলের সভাপতি। তাঁর নেতৃত্ব দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে।
তৃণমূল বিএনপি ও বিএনএম নিয়ে সরকার দলীয়দের হিসাব চিন্তায় ফেলে দেয় জাতীয় পার্টিকে। সংসদে বিরোধীদলের মর্যাদা হারাতে পারে এমন আশঙ্কা পেয়ে বসে দলটির। দলের বর্তমান সংসদ সদস্যদের অনেকেই দলের এই পরিণতি এবং নিজেদের সম্ভাব্য পরিণতি মেনে নিতে পারেনি। দলে আরেক দফা ভাঙন ও সংসদে বিরোধীদলের মর্যাদা হারানো এই দুই আশঙ্কা থেকেই জাতীয় পার্টি তড়িঘড়ি করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
যদিও দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু নির্বাচনের আশ্বাস পেয়ে তাঁরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জাতীয় পার্টি ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন ও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন আর দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বিরোধী দলীয় উপনেতা।


‘দ্বিধা ঝেড়ে’ নির্বাচনে আসছে জাতীয় পার্টি
নির্বাচনের পথে আওয়ামী লীগ–জাতীয় পার্টি, কী করবে বিএনপি?
সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায় তৃণমূল বিএনপি
