জাতীয় পার্টির রওশনপন্থীদের আগামী সম্মেলন দলের জন্য টার্নিং পয়েন্ট হবে বলে মন্তব্য করেছেন সম্মেলন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক কাজী ফিরোজ রশিদ। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর গুলশানে সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের একথা জানান তিনি।
জাতীয় পার্টির একাংশের নেতা কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো রাজনৈতিক দল টিকে থাকতে পারে না। তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্দিপনা তৈরি করতে ৯ মার্চ সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। জেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসবে। তৃণমূলই আমাদের শক্তি। দল ইতিমধ্যে মারাত্বকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এই জায়গা থেকে উত্তরনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুর সঙ্গে মতবিরোধের মধ্যে নিজেকে দলটির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। একই সঙ্গে জিএম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুকে দল থেকে অব্যাহতি দেন তিনি। আগামী ৯ মার্চ দলটির সম্মেলনও ডেকেছেন রওশন।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। নির্বাচনে দলটির ভরাডুবির পর বিরোধ আরও চরমে ওঠে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনা করায় দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ, সুনীল শুভ রায় সহ বেশ কয়েকজনকে অব্যাহতি দেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতি পাওয়া নেতারা রওশন এরশাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। এরমধ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতয়ী সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটি ঘোষণা করেন রওশন। এই কমিটিতে কাজী ফিরোজ রশিদকে আহ্বায়ক ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাকে কো আহ্বায়ক করা হয়। এছাড়াও যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে আছেন গোলাম সরোয়ার মিলন, সদস্য সচিব সফিকুল ইসলাম সেন্টু এবং কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পেয়েছেন জিয়াউল হক মৃধা।
রওশন জিএম কাদের ও মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দিলেও দলের একাংশ তাদের সঙ্গেই আছেন। জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জিএম কাদেরের নেতৃত্বেই জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছে। জিএম কাদেরকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে ঘোষণা করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল জাতীয় পার্টি। চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে অহযোগিতার অভিযোগ এনে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ও তার অনুসারী নেতারা নির্বাচন বর্জন করেন। তাঁদের অভিযোগ, রওশনপন্থিদের কোনঠাসা করতে নির্বাচনে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি।
জাতীয় পার্টিতে ভাঙন অবশ্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও অন্তত তিনবার ভেঙেছে দলটি। ১৯৮৬ সালে সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি প্রথম ভাঙনের মুখে ১৯৯৬ সালে। এরশাদের সঙ্গে মতোবিরোধের জেরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মূল দল থেকে বেরিয়ে গঠন করেন জাতীয় পার্টি (জেপি)। এই দলটি বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক।
২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আরেকবার ভাঙনের মুখে পড়ে জাতীয় পার্টি। এবার দল থেকে বেরিয়ে যান সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামের এই অংশটির নেতৃত্বে বর্তমানে আছেন নাজিউর রহমানের ছেলে আন্দালিব রহমান পার্থ। বিজেপি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক।
সবশেষ, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আগের দলটির নেতা কাজী জাফর মূল দল থেকে আলাদা হয়ে যান। এই অংশটি জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) নামে পরিচিত। এই অংশটিও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে আছে।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ ২০১৯ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে বিবাদে জড়ান তার ছোট ভাই জিএম কাদের আর স্ত্রী রওশন এরশাদ। এরশাদের মৃত্যুর পর দলটির নেতৃত্বে আসেন জিএম কাদের। শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন রওশন। দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়।
এরপর ২০২২ সালে আবারও দলের এই গৃহবিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকা-না থাকাকে কেন্দ্র করে। জি এম কাদেরপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপির সাথে বা আলাদা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে রওশনপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোটেই থেকে যাওয়া।
একপর্যায়ে ওই বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রওশন এরশাদ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকেন। সে সময় রওশনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান জিএম কাদের।
ফলে জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান পদে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও করা হয়। এতে শুরুতে জিএম কাদেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। পরে অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান পদ ফিরে পান জিএম কাদের।


৯ মার্চ জাপার সম্মেলন: রওশন এরশাদ
জাতীয় পার্টি কি আবার ভাঙবে? 
