সম্পদের অপব্যবহার কেমন হয়, তার একটা উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে বিপিএলের ফাইনালে আজ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের ইনিংস। আন্দ্রে রাসেল টি-টোয়েন্টিতে যে যেকোনো দলের জন্যই সম্পদ, সেটা তো আর আলাদা করে বলতে হয় না! আজ তাঁকেই যেন অতৃপ্ত রেখে দিয়েছে কুমিল্লা!
রাসেল ব্যাটিংয়ে নামতে পেরেছেন বটে, তবে সেটা ১৭তম ওভারের পঞ্চম বলে। ইনিংসে তখন বাকি আর মাত্র ২০ বল। এ সময়ে আর কী-ইবা করতে পারতেন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পাওয়ার হিটার! তা-ও এর মধ্যেও ১৪ বল খেলতে পেরেছেন, তাতে ৪ ছক্কা মেরে করেছেন ২৭ রান।
তা না হলে কুমিল্লা আজ আরও কত কম রানে আটকে যেত, সে এক প্রশ্ন বটে। তামিম ইকবালের ফরচুন বরিশালের বিপক্ষে ফাইনালে আজ রাসেলকে ডাগআউটে আঙুল ফোটাতে দিয়ে যে ক্রিজে কুমিল্লার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানরা একের পর এক ডট বল খেলে গেছেন! ১২০ বলের ইনিংসে ৫৭টিই ছিল ডট বল!
শেষ পর্যন্ত রাসেলের ক্যামিওতেই শেষ পর্যন্ত কোনোরকমে দেড় শ রান পেরোতে পেরেছেন লিটনরা। ম্যাচটাও তাই এখনো একপেশে হয়ে পড়েনি। প্রশ্নটা তাই এখনো প্রাসঙ্গিক – লিটনের কুমিল্লারই হ্যাটট্রিক শিরোপা আসছে, নাকি শিরোপার সঙ্গে ১৫৫ রানের ব্যবধান ঘুচিয়ে বরিশালকে প্রথমবার বিপিএল জেতাবেন তামিম?
শেষদিকে রাসেলের ঝড় বাদ দিলে কুমিল্লার ইনিংসের শুরু থেকেই হতশ্রী দশা। পাওয়ার প্লে-র ছয় ওভারের মধ্যেই তিন উইকেট নেই। এর মধ্যে সুনীল নারাইনের উইকেটটা তো এবারের বিপিএলে ‘দুধভাত’ হয়ে গেছে, আজও প্রথম ওভারে পাঁচ বলের মধ্যে একবার ক্যাচ দিয়ে বেঁচেও পঞ্চম বলে ক্যাচ দিয়েই আউট নারাইন। পুরো ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ঘ্রাণ থেকে গেল উইকেটটাতে – বোলার কাইল মায়ার্স ওয়েস্ট ইন্ডিজের, ব্যাটসম্যান নারাইনও, ক্যাচটাও নিয়েছেন উইন্ডিজের ওবেদ ম্যাকয়!
নারাইনকে না হয় ‘দুধভাত’ ভেবে বাদ দিলেন, কিন্তু কুমিল্লার জন্য এর পরের দুটি উইকেট তো বড় ধাক্কা না হয়ে পারে না! এসেই তিন চারে আগ্রাসনের ইঙ্গিত দেওয়া তাওহীদ হৃদয় (১০ বলে ১৫ রান) চতুর্থ ওভারে ফুলারের ‘ফুলার’ বলে ব্যাট চালিয়ে থার্ডম্যানে ধরা পড়লেন, ষষ্ঠ ওভারে লিটনও (১২ বলে ৩ চারে ১৬) ফুলারের বলে থার্ডম্যানে ক্যাচ প্র্যাকটিস করিয়ে আউট। ৪২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে পাওয়ার প্লে শেষ হলো কুমিল্লার।
এরপরও ইনিংসটাতে গতি আনার ব্যাটসম্যানের অভাব ছিল না কুমিল্লার। কিন্তু ঝড় তোলার জন্য ব্যাটে-বলে তো ঠিকমতো লাগাতে হবে। আজ ফাইনালের মঞ্চেই যেন ‘স্টেইজ ফ্রাইটে’ ভুগলেন কুমিল্লার পরের ব্যাটসম্যানরা। তামিমের দলের সামনে দাঁড়িয়ে ডটের পর ডট খেলে গেলেন সবাই! বরিশালের বোলাররাও অবশ্য লাইন আর লেংথে ‘ভ্যারিয়েশন’ এনেছেন দারুণভাবে। কখনো স্লোয়ার, তো কখনো পঞ্চম স্টাম্পে ফুলার ডেলিভারি, তো কখনো বাউন্সার।
তাতে যা হলো, কুমিল্লার সব ব্যাটসম্যানই সংগ্রাম করলেন। জনসন চার্লস দুটি ছক্কা মেরেছেন বটে, কিন্তু তাঁর ১৫ রান এল ১৭ বলে। মঈন আলী রানআউট হওয়ার আগে ৬ বলে করলেন ৩ রান।
১৪তম ওভারের শেষে যখন স্ট্র্যাটেজিক টাইম-আউটে যাচ্ছে ইনিংস, তখনো কুমিল্লার রান ৫ উইকেটে ৯২, কিন্তু ক্রিজে থাকা দুই ব্যাটসম্যানের অবস্থা কী? বিরতির আগের দুই বলে এক ছক্কাসহ ৮ রান নেওয়ায় মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনের ইনিংসটাতে কিছু প্রাণ এল, তিনি তখন ব্যাট করছিলেন ২৯ বলে ২৯ রানে। আর বিপিএল-জুড়ে মারকাটারি ব্যাটিংয়ে খ্যাতি পেয়ে যাওয়া জাকের আলীও তখন পর্যন্ত ৬ বলে করতে পেরেছেন মাত্র ২ রান!
অথচ আন্দ্রে রাসেলের মতো এক ব্যাটসম্যান তখনো ডাগআউটে বসে, ভাবা যায়!
স্ট্র্যাটেজিক টাইম-আউটের পরও যে খুব গতি এসেছে, এমন নয়। জাকের আলী পরপর দুই ওভারে একটি করে চার মারলেন, ১৭তম ওভারের প্রথম বলে অঙ্কন একটা ছক্কা মারলেন। অবশ্য ওই ওভারের শেষ বলেই সাইফুদ্দিনকে স্কুপ করতে গিয়ে বলটা স্টাম্পে টেনে নিয়ে অঙ্কন তাঁর সংগ্রাম থেকে মুক্তি নিলেন, ওই ছক্কার বদৌলতে তাঁর ৩৫ বলের ইনিংসে কুমিল্লা পেয়েছে ৩৮ রান।
অঙ্কনের বিদায়ে যেন কুমিল্লার সমর্থকদেরই তখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচার দশা। মনে তবু শঙ্কা, বাকি ২০ বলে রাসেল কতটা কী করতে পারবেন!
রাসেল কুমিল্লাকে লড়াই করার মতো সংগ্রহই এনে দিয়েছেন। মুখোমুখি দ্বিতীয় বলেই ছক্কার উৎসব শুরু করলেন ওবেদ ম্যাকয়কে পয়েন্টে দড়ির ঠিক বাইরে আছড়ে ফেলে। ১৯তম ওভারে মূল ঝড়টা চালালেন ফুলারের ওপর। দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম – বল তিনটি উড়ে গিয়ে পড়ল তিন দিকের বাউন্ডারি সীমানার ওপারে। রাসেল নামার সময়ে ১১৫ রান ছিল কুমিল্লার, মুহূর্তেই তা হয়ে গেল দেড় শ ছোঁয়া।
২০তম ওভারে সাইফুদ্দিন অবশ্য দেখা দিলেন ‘লায়ন টেইমার’ হয়ে। প্রথম বলটা নো বল করলেও ফ্রি-হিটে কোনো সুযোগ দেননি রাসেলকে। এরপর দুটি ওয়াইডও দিয়েছেন সাইফউদ্দিন, কিন্তু তাঁর ওভারে ছয় বল খেলেও একটি নো আর দুটি ওয়াইডসহ রাসেল কুমিল্লাকে এনে দিতে পারলেন মাত্র ৭ রান।



