আর্জেন্টিনায় ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, একটি ধর্ম। লিওনেল মেসি কিংবা ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো বিশ্বজয়ী তারকা হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু-কিশোর দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বুয়েনস আইরেসে পাড়ি জমায়। কিন্তু এই জাদুকরী স্বপ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার অধ্যায়। দারিদ্র্য, অবহেলা এবং চরম শোষণের শিকার হচ্ছে ভবিষ্যৎ ফুটবলাররা। এই পুরো বিষয়টিই উঠে এসেছে ইএসপিএনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
বুয়েনস আইরেসের গ্যালার্দো স্ট্রিটের এক কোণে অবস্থিত একটি হলুদ বাড়ি। বাইরে থেকে দেখে সাধারণ মনে হলেও, ভেতরে গাদাগাদি করে বাস করত ১২ থেকে ২০ বছর বয়সী তিন ডজনেরও বেশি কিশোর। বাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করতেন গুস্তাভো হার্নান চোজাস, যিনি এলাকায় 'এল জুরদো' নামে পরিচিত। বাড়িটির ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত অমানবিক। জানালাগুলো সংবাদপত্র দিয়ে ঢাকা, ঘরজুড়ে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ এবং সেই সাথে ছিল পর্যাপ্ত খাবারের অভাব।
আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এল জুরদো নিজেকে এই শিশুদের আইনি অভিভাবক হিসেবে দাবি করতেন এবং পরিবারের সরলতার সুযোগ নিয়ে এজেন্ট হিসেবে প্রভাব খাটাতেন। ২০২৩ সালে পুলিশ ও সমাজকর্মীরা বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ নোটিশ দেয়। কিন্তু দুই বছর পরও বাড়িটি একইভাবে সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
আর্জেন্টিনার ক্লাবগুলোতে তরুণ খেলোয়াড়দের রাখার আবাসনকে বলা হয় পেনসিওন। ২০১৮ সালে দেশের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব ইন্ডিপেনডিয়েন্তের পেনসিওনে এক ভয়াবহ যৌন কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা মারিয়া সোলেদাদ গারিবালদি ৩০০-র বেশি তরুণের সাক্ষাৎকার নিয়ে এক ভয়াবহ চিত্র উন্মোচন করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে, প্রায় ৬০ শতাংশ কিশোর কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন নিপীড়নের চেষ্টার শিকার হয়েছে।’
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন এবং ক্লাব কর্তৃপক্ষের নীরবতা। প্রমাণ নষ্ট করা, হুমকি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই তদন্ত বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। বিচারকরা একে ‘দাসত্বের আধুনিক রূপ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
এই শোষণ কেবল আর্জেন্টিনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যেমন ডোমিনিকান রিপাবলিকে বেসবল দলগুলো ১১ বছর বয়সী শিশুদের সাথে অবৈধ চুক্তি করছে। চীনে তরুণ বাস্কেটবল খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের নামে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। আমেরিকায় জিমন্যাস্টিকস এবং ফিগার স্কেটিংয়ে ল্যারি নাসার-এর মতো শিকারিদের দ্বারা দীর্ঘস্থায়ী যৌন নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে।
১৫ বছর বয়সে ফেরো কারিল ওয়েস্তে ক্লাবের সাথে চুক্তি করে তবিয়াস পেরেজ। চুক্তি অনুযায়ী প্রথম দলে সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত সে কোনো বেতন পাবে না। ক্লাব তাকে আবাসন না দিয়ে এল জুরদোর বাহ্যিক পেনসিওনে পাঠিয়ে দেয়। তবিয়াসের বাবা রোক পেরেজ একজন দিনমজুর। ছেলের স্বপ্নের জন্য তিনি নিজের শেষ সম্বলটুকু বিলিয়ে দিয়েছেন।
তবিয়াস বলে, ‘আমরা জানতাম সেখানে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না, কিন্তু আমরা কাউকে বলিনি। আমাদের ভয় ছিল, অভিযোগ করলে পেনসিওন বন্ধ হয়ে যাবে এবং আমাদের ফুটবল খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে।’
আর্জেন্টিনার ফুটবল ব্যবস্থা এমন এক অর্থনৈতিক মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যা ক্লাবগুলোকে লাভবান করে, কিন্তু শিশুদের করে তোলে চরম অরক্ষিত। এই তথাকথিত অনিয়ন্ত্রিত আবাসন বা পেনসিওনগুলোর ওপর সরকারের কোনো নজরদারি নেই। স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে এই শিশুরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এমন এক জগতে প্রবেশ করে, যেখানে সুরক্ষার চেয়ে ব্যবসাই শেষ কথা।
ফুটবল মাঠের আলো যতটাই উজ্জ্বল, তার পেছনের এই অন্ধকার ততটাই নির্মম। যতক্ষণ না পর্যন্ত ফিফা বা স্থানীয় সরকার এই শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি করছে, ততক্ষণে আরও হাজারো তবিয়াসের স্বপ্ন ও শৈশব এই ফুটবল সিন্ডিকেটের বলি হতে থাকবে।



