২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তেই কি তবে থামতে যাচ্ছে ব্রাজিলের বহুল প্রতীক্ষিত হেক্সা মিশন? নাকি কার্লো আনচেলত্তির কৌশলে চূর্ণ হবে নরওয়েজিয়ান ঝড়? নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে আগামী ৫ জুলাই মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের দুই মেরুর দুই দল। একদিকে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, অন্যদিকে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ে। ট্রফির হিসেবে আকাশ-পাতাল ব্যবধান হলেও, এই লড়াইয়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক ইতিহাস যা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের বুকে কাঁপন ধরাতে পারে। চলুন এবারে সে আলোচনাতেই যাওয়া যাক।
ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ‘ভূত’ নরওয়ে?
বিশ্ব ফুটবলের সফলতম দল ব্রাজিলেরও একটা ‘অভিশপ্ত’ প্রতিপক্ষ আছে। আর সেই দলটির নাম নরওয়ে। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যটা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিল আজ পর্যন্ত কখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি।
দুই দলের ৪ বারের দেখায় নরওয়ের জয় ২টি, আর ২টি ম্যাচ হয়েছে ড্র। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি ছিল ১৯৯৮-এর ফ্রান্স বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে বেবেতোর গোলে ব্রাজিল এগিয়ে গেলেও, তোরে আন্দ্রে ফ্লোর গোলে প্রথমে সমতায় ফেরে নরওয়েজিয়ানরা। এরপর ম্যাচের শেষ মূহূর্তে পেনাল্টি থেকে কেতিল রেকদালের গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের জয় তুলে নেয় নরওয়ে।
এবারে ২৮ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে দেখা হচ্ছে দুই দলের, সেটাও আবার নকআউটে। ব্রাজিলের সামনে এবার কেবল কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াই নয়, বরং দীর্ঘ ৩৮ বছরের এই ঐতিহাসিক ‘অভিশাপ’ থেকে মুক্তির মিশনও।
হালান্ড ঝড় ও ভাইকিং গর্জন
চলতি বিশ্বকাপে নরওয়ের পথচলাটা রূপকথার চেয়ে কম কিছু নয়। প্রথম ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এবং দ্বিতীয় ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই নকআউটের টিকিট নিশ্চিত করেছিল স্তল সুলবাকেনের শিষ্যরা। তাই ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে মূল একাদশের প্রায় সবাইকেই বিশ্রাম দেন কোচ। তাতে ৪-১ গোলের বড় পরাজয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাঁকে।
তবে রাউন্ড অব ৩২-তে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে দারুনভাবেই শেষ ১৬-তে উঠেছে নরওয়েজিয়ানরা। ম্যাচে অ্যান্টোনিও নুসার চমৎকার এক গোলের পর আইভরি কোস্ট সমতায় ফিরলেও ৮৬ মিনিটে ট্যাপ-ইন করে আরও একবার নরওয়ের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। নিজের প্রথম বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই ৩ ম্যাচে ৫ গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের দৌড়ে আছেন ম্যান সিটির এই গোলমেশিন।
নরওয়ের শক্তি তাদের ফিজিক্যাল ফুটবল এবং হালান্ডের অবিশ্বাস্য ফিনিশিং। বিশেষ করে পেনাল্টি বক্সে ৬ ফুট ৫ ইঞ্চি উচ্চতার হালান্ড ও সরলথের উপস্থিতি যেকোনো রক্ষণে ভয় ধরাতে বাধ্য। সঙ্গে আছেন ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডার অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড। মাঝমাঠে এই আর্সেনাল তারকা অনেকটা অর্কেস্ট্রার কনডাক্টরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
তবে নরওয়ের দুর্বলতাও কিন্তু স্পষ্ট। ফ্রান্স ম্যাচেই দেখা গেছে, হালান্ড, ওডেগার্ড, সরলথ না থাকায় দলটা কতটা অসহায়। তাছাড়া আইভরি কোস্টের গতিশীল ফরোয়ার্ডদের সামনে নরওয়ের ফুলব্যাকদের বেশ ভুগতে দেখা গেছে। মাঝমাঠে ওডেগার্ডের ফরওয়ার্ড পাসিং চ্যানেলগুলো বন্ধ করতে পারলে নরওয়ের আক্রমণভাগ অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে যেতে পারে।
ব্রাজিলের আছে ‘মাস্টারমাইন্ড’ আনচেলত্তি
এবার আসা যাক পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কথায়। আজকের ব্রাজিল কিন্তু ঐতিহ্যবাহী ‘সাম্বা রোমান্টিসিজম’ বাদ দিয়ে খেলছে একেবারেই বাস্তববাদী ফুটবল। ডাগআউটে আছেন দলের মাস্টারমাইন্ড ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তি। মরক্কোর সাথে ১-১ ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করার পর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলেও, ব্রাজিলের আসল পরীক্ষা হয়েছে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে, জাপানের বিপক্ষে।
কাইশু সানোর গোলে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়া ব্রাজিলকে দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর প্রথমবার শেষ ১৬-এর আগেই বিদায় নেবে তারা। কিন্তু আনচেলত্তির শান্ত মস্তিষ্ক দ্বিতীয়ার্ধে বদলে দেয় ম্যাচের গতিপথ। জাপানের নিখুঁত, নিটোল, আঁটসাঁট রক্ষণ ভাঙতে পাসিংয়ের ধরন বদলে পেনাল্টি বক্সের ভেতরে একের পর এক ক্রস বাড়াতে শুরু করে ব্রাজিল।
প্রথমে গ্যাব্রিয়েল মাগালহাসের ক্রস থেকে কাসেমিরোর হেডারে সমতাসূচক গোল এবং অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে (৯০+৫ মিনিটে) গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির জাদুকরী এক গোল ব্রাজিলকে এনে দেয় ২-১ গোলের নাটকীয় জয়।
২০০২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর, এই প্রথম নকআউটে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জিতল সেলেসাওরা। ম্যাচ শেষে আনচেলত্তি নিজেই বলেছেন, এটিই ছিল এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সবচেয়ে কমপ্লিট পারফরম্যান্স।
ব্রাজিলের বেঞ্চে আছে নেইমারের মতো অভিজ্ঞ তুরুপের তাস, যাকে যেকোনো মুহূর্তে মাঠে নামাতে পারেন কোচ। তবে সেলেসাওদের জন্য চিন্তার কারণ তাদের স্লো স্টার্ট, অর্থাৎ ম্যাচের প্রথমার্ধেই খেই হারিয়ে ফেলা, যা হালান্ডের মতো ফরোয়ার্ডের সামনে করা মানেই নিশ্চিত বিপর্যয়।
ব্রাজিলের হেক্সা মিশন কি তবে নরওয়ের হাতেই শেষ?
প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী ৫ জুলাই নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে কি হতে যাচ্ছে? গ্যাব্রিয়েল ও মারকিনিওসের জুটি কি পারবে হালান্ডকে বোতলবন্দী করতে? নাকি ওডেগার্ড-হালান্ড জুটি ব্রাজিলের হেক্সা মিশনকে শেষ ১৬-তেই আটকে দেবে?
একদিকে আনচেলত্তির সুশৃঙ্খল, ছকেবাঁধা কামব্যাক স্কোয়াড, অন্যদিকে সুলবাকেনের লড়াকু, কাউন্টার-অ্যাটাকিং গোল্ডেন জেনারেশন। মোট কথা, দারুন এক থ্রিলার উপহার দেওয়ার সব উপকরণই আছে এই ম্যাচে। হালান্ড-ওডেগার্ডদের পরাস্ত করে ব্রাজিলের হেক্সা মিশন কি টিকে থাকবে, কমেন্টে জানান আপনার মতামত।



