একটি একটি করে দিন যাচ্ছে, আর আমরা যেন এক নিকষ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছি। আমাদের নারীরা প্রতি পদে অনুভব করছে, তারা নিরাপদ নয়। তারা পীড়নযোগ্য। রাষ্ট্র স্বয়ং রাশি রাশি পীড়নের ঘটনায় নীরবতা পালন করে, কখনো ‘মব’ নামক শব্দের আড়ালে একদল পুরুষের হম্বিতম্বি বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, ‘নারী তুমি পীড়নযোগ্য’।
এই মুহূর্তে সারা দেশ তোলপাড় হচ্ছে মাগুরার সেই শিশুটিকে নিয়ে, যার বয়স আট, যে অচেতন, যে জীবন‑মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। হ্যাঁ, মেয়েটি চোখ মেলেছে অবশেষে। কিন্তু চেতনা কি ফিরেছে? চিকিৎসকেরা বলেছেন, তার অবস্থার উন্নতি হবে ক্রমে। কিন্তু তার মনে যে আতঙ্ক, তার কী হবে? চুপ থাকতে থাকতে আমাদের মেয়েরা, আমাদের শিক্ষকেরা পথে নেমেছেন। সারা দেশে একের পর এক মিছিল হচ্ছে। লাঠি মিছিল থেকে শুরু করে সমাবেশ, মুখে লাল, কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শনিবার মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের হল থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে যখন বিক্ষোভ জানাচ্ছেন, তখন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের এক পরিত্যাক্ত বাড়িতে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়ে তারস্বরে চিৎকার করছেন চার মাসের অন্তঃস্বত্বা এক নারী। এই শনিবার রাতেই নারায়ণগঞ্জে সৎবাবার ধর্ষণচেষ্টার মুখে চিৎকার করে উঠছে ১৪ বছরের এক কিশোরী, যাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে গত ৩ মার্চ নগ্ন ভিডিও ধারণ করেছিল ‘সৎবাবা’‑র মোড়কে থাকা সেই পুরুষ। ঠাকুরগাঁওয়ে এই শনিবার সকালেই মাদ্রাসা শিক্ষকের দ্বারা পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হয়ে বোবাকান্নায় গুমরাতে শুরু করে। এই শনিবার সন্ধ্যাতেই তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে তার ভিডিও ধারণ করে এক তরুণ। এই দিনে নরসিংদীতে এক সাত মাসের অন্তঃস্বত্বা গৃহবধূকে স্বামীর জামিনের কথা বলে ডেকে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে তিনজন।
বীভৎস! হতবিহ্বল! হয়তো এই শব্দগুলো ছাড়া আমাদের সামনে আর কিছু নেই। কিন্তু আমাদের কান্না কি আছে? নাকি ফুরিয়ে গেছে তাও?
মাগুরার সেই শিশুটি এখন এই বীভৎসতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া আজকের ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদে তার কথাই বারবার উঠে এসেছে। হ্যাঁ আট বছরের সেই শিশুটি চোখ মেললেও তার চেতনা কি ফিরেছে? সে জানে না, তার কথা ঘুরছে প্রতিটি প্রতিবাদী মুখে। শুধু জানে হয়তো, এই পৃথিবী, এই পুরুষের রাজত্ব তাকে বস্তুর চেয়ে বড় কিছু করে দেখেনি। তার ওই জগৎ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এই পীড়নে পিষ্ট হচ্ছে। তাকে ফিরতে দিচ্ছে না শৈশব‑সারল্য মাখা চেতনায়।
মাগুরা, নারায়ণগঞ্জ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ কিংবা ঠাকুরগাঁও, কিংবা নরসিংদী বা গাজীপুর–শুধু কয়েকটি প্রতীকী স্থান কেবল। গোটা বাংলাদেশ কি আজ এই স্থানগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করে না?
মহামান্য আইন উপদেষ্টা বললেন, ধর্ষণ সম্পর্কিত আইন সংশোধন করবেন। জানালেন, ১৫ দিনের মধ্যে যাবতীয় তদন্ত শেষ করে ৯০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সমাধা করার পদক্ষেপ নেবেন। শুনে আশ্বস্ত হওয়াটা কি উচিত হবে?
প্রশ্ন উঠছে, কারণ, একের পর এক পথে‑ঘাটে নারী নিপীড়নের ঘটনা যখন ঘটছিল, নারীদের ওপর পুরুষমাত্রই ‘নীতি পুলিশিং’ যখন করছিল, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ওপর একই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী হেনস্তা চালাচ্ছে, পীড়ন করছে, যখন সেই নিপীড়ককেই আবার জামিনে বের করে নিয়ে আসছে ফুলের মালা দিয়ে, যখন থানা থেকে এজাহারের অনুলিপি প্রকাশের মাধ্যমে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর নাম পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে, যখন একের পর এক ধর্মবাদী গোষ্ঠী নারীর বিরুদ্ধে উগ্রতা ছড়াচ্ছিল, তখন তিনি মুখে কুলুপটি এঁটে বসেছিলেন। আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা!
আজকের প্রতিবাদী বিভিন্ন সমাবেশ ও কর্মসূচি থেকে তাঁকে নিয়ে কথা বলতেও ‘রুচির দৈন্যে’ আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ নয়, তাঁর পদচ্যুতি চান তাঁরা।
ভিডিও দেখুন:অথচ এই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ঠিকই বাণী দিয়ে যাচ্ছেন। ‘স্বৈরাচারের দোষর’ খুঁজতে একের পর এক হামলা হচ্ছে, মিডিয়া ডেকে রাজধানীর গুলশানের মতো জায়গায় ডাকাতি হচ্ছে, আর তিনি ‘একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়’ বলে পুরোনো ভাঙা রেকর্ড বাজিয়েই চলেছেন। তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অবশেষে বলেছেন যে, কোনো মবকে আর সহ্য করা হবে না। বাহ, বেশ ভালো। কিন্তু এখনকার রেওয়াজ অনুযায়ী সেই বহুল উচ্চারিত প্রশ্নটি কি আমরা ছুড়ে দেব–এত দিন কোথায় ছিলেন? যখন ঘোষণা দিয়ে একের পর এক মব তৈরি করা হলো, সেই মব দিয়ে যা নয় তা করা হলো, ভাঙচুর থেকে শুরু করে লুট, যখন সারা বাংলাদেশের কাছে একটা বার্তা গেল যে, এটা যা খুশি, তাই করার দেশ, তখন এই হুঙ্কারটি তো আপনাদের মতো পদধারী ও দায়িত্বশীল অংশ থেকে সবাই চেয়েছিল। কই? বরং আমরা সরকারের বাইরের আরেক দায়িত্বশীল উচ্চকণ্ঠের কাছ থেকে পেলাম পাল্টা হুঙ্কার, শিখে নিলাম নতুন শব্দ–‘মবমারানি’।
যখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, তখন ডিএমপি কমিশনার দাওয়াই দিচ্ছেন–ঘরে ঠিকঠাক তালা লাগাতে। এমনকি শপিংমলের রক্ষীদেরও নাকি গ্রেপ্তারের এখতিয়ার দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পোশাক পরে ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগ বেশ পুরোনো, এমন অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে বিভিন্ন সময়, সেখানে এই ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’, যাকে নাকি শুধু আর্মব্যান্ড দিয়ে চেনা যাবে, তার কাছেই মানুষ কতটা নিরাপদ থাকবে? তাদের মধ্য দিয়ে গ্রেপ্তার বাণিজ্য থেকে শুরু করে হঠাৎ পাওয়া ক্ষমতার অপব্যবহারে কতজন ভুক্তভোগী হবেন, তার দিকটি কি ডিএমপি কমিশনার মহোদয় একবারও ভেবে দেখেছেন? এ ক্ষেত্রে তিনি কোনো ধরনের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, যেখানে নাগরিকের সহায়‑সম্পদের নিরাপত্তা নাগরিকের জিম্মায় ছাড়তেই তিনি বেশি উদ্গ্রীব?
একের পর এক ঘটনা ঘটেছে, আর আমরা কেবল এটাই জানতে পেরেছি বিভিন্ন তরফ থেকে যে, এত কিছু ঘটছে না। বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। এমনকি এও বলা হচ্ছে যে, ‘আগেও এমন হতো’। আমাদের প্রশ্ন–খুন যদি আগেও হয়ে থাকে, তবে কি তা এখন হওয়াও জায়েজ? এখানে কি পরিসংখ্যানের কোনো রেস চলছে তবে? আগে এতটি ধর্ষণ হতো, এখন এত হয়, আগে এতটি ডাকাতি হতো, এখন এতটি হয়...ইত্যাদি ইত্যাদি।
সকল নারী ও কন্যার অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়ন–এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল। প্রতি বছরই এমন বেশ আশাবাদী ও প্রকল্পবাদী প্রতিপাদ্য ও স্লোগান সামনে রেখে নারী দিবস পালন হয়। প্রতিবারই একটা প্রত্যয় ঘোষিত হয়। আর আমাদের মেয়েদের, আমাদের নারীদের পোশাক নিয়ে, চলন‑বলন নিয়ে, পথে‑ঘাটে চালচলন নিয়ে, সামাজিক মাধ্যমে লেখাপত্র ও কথা বলা নিয়ে, তাদের সাজসজ্জা নিয়ে একের পর এক সবক দেওয়া হয়। আর আমাদের নারীরা পথে বের হতে এখন দশবার ভাবতে বাধ্য হন। তাদের চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখটি পর্যন্ত শ্যেন চোখে বিচার করে এক দল পুরুষ। তারা বিচারক বনে যায়। ধূমপায়ী পুরুষের আড্ডায় ব্যাপক উচ্ছ্বাসে অংশ নেওয়া ব্যক্তিটিই নারীর ধূমপানে রোষকষায়িত ভঙ্গিতে তেড়ে যান। তার পক্ষে আবার একদল দাঁড়িয়ে যান। ইনিয়ে‑বিনিয়ে বক্তব্য আসে দায়িত্বশীলদের তরফ থেকেও।
দিকে দিকে কত ‘নয়া বন্দোবস্ত’, ‘ইনক্লুসিভ’ ইত্যাকার শব্দ শোনা গেল। কিন্তু নারীর বেলায় সব লবডঙ্কা। নারীর জন্য ‘নয়া বন্দোবস্ত’ যেন আরও বেশি নিয়ন্ত্রণকামী, নিস্পেষণকামী, পীড়নমুখী এক বন্দোবস্ত হয়ে হাজির হয়। কথায় কথায় নানা দিক থেকে তার দিকে ছুটে আসে হুঙ্কার। আর আমাদের চেনা ‘সংবেদনশীলগণ’ এক অভিনব সংবেদনশীলতায় বারবার বলতে থাকেন–এটা এক জটিল পরিস্থিতি, এটা এক ষড়যন্ত্রমুখর সময়।
তাদের এই নিস্পৃহতা আশকারা হয়ে সামনে আসে। আর সেই আশকারার সামনে দাঁড়িয়ে হতবিহ্বল আমাদের মেয়েদের বলতে হয়–‘অভ্যুত্থানে আমাদের জোর অংশগ্রহণ ছিল, আমরা সামনের কাতারেই ছিলাম’। এ এক দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বিবৃতি। একে পাঠ করতে হবে। কারণ, এই ভাষ্য বলে দেয় যে, অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার প্রমাণ‑দলিল ইত্যাদি হাজির করলে হয়তো নারীদের পক্ষে পীড়ন থেকে বাঁচবার পথ তৈরি হবে। এটা কি এও বলে না যে, অভ্যুত্থানে অংশ না নেওয়া বা নীরব থাকা ব্যক্তিরা এই সময়ে নানা ভাষ্যও ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ‘পীড়নযোগ্য’ বলে সাব্যস্ত হয়েছে। আমাদের মেয়েরা তাই অভ্যুত্থানে তার হিস্যাটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে শরীরে ও মনে তার শেষ বর্মটি পরে নিচ্ছে? এই ভাষ্য যদি শেষতক বর্ম হিসেবে সাব্যস্ত হয়, তবে বুঝতে হবে যে, আমরা এক দেশের অভিশপ্ত নাগরিকে পরিণত হয়েছি।
আজ নারী‑পুরুষ নির্বিশেষে যে মানুষেরা নারীর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাস’ ও পীড়নের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন, যারা ফুঁসে উঠেছেন, তাঁদের শুধু এটুকুই বলব যে, নিপীড়ত না হওয়ার পক্ষে এবং পীড়নের বিপক্ষে আওয়াজ তুলতে গিয়ে কোনোভাবেই রাজনীতি‑সামাজিক‑সাংস্কৃতিক‑জাতিগত কোনো মানদণ্ডকে হাজির করবেন না। কোনো বিবেচনাতেই লৈঙ্গিক বা জাতিগত পীড়ন হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ‘অভ্যুত্থানে’ নারীর অংশগ্রহণ থাকাকে কোনোভাবেই বর্ম হিসেবে না এনে পরিষ্কার বলুন যে, অভ্যুত্থানে একজন নারীও যদি অংশ না নিতেন, তবুও নারীর ওপর একটি আক্রমণও হতে পারে না। এই অংশ নেওয়া বা না নেওয়া কোনোভাবেই কম বা বেশি ‘পীড়নযোগ্য’ করতে পারে না কাউকে। পাশাপাশি সুস্পষ্টভাবে জবাবদিহি আদায় করুন। কোনো মতবাদ, কোনো সমন্বয় বা সংশ্লেষবাদী বা ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে এই জবাবদিহির সামনে দেয়াল হতে দেবেন না। যদি আমরা এমনটি হওয়ার সুযোগ দিই, তবে আমরা নিজেদের অভিশপ্ত করে তুলব।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


মাগুরায় শিশু ধর্ষণ: বোন জামাইসহ চারজনের নামে মামলা
নারী নির্যাতনের দেশে ‘নারী দিবস’ কতটা অর্থবহ?
