ভারতের সঙ্গে সদ্য ঘোষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সমালোচনায় সরব নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স। চুক্তিটিকে ‘না অবাধ, না ন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, এটি বাস্তবায়নের জন্য পার্লামেন্টে তাঁর দল বিরোধিতা করবে।
গত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা চলছিল। চলতি সপ্তাহের সোমবার চুক্তির আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন।
চুক্তি অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া সব পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করবে। অন্যদিকে ভারত নিউজিল্যান্ড থেকে আমদানি করা ৯৫ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেবে অথবা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। আগামী বছরের প্রথমার্ধে চুক্তিটি স্বাক্ষর হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবায়নের জন্য নিউজিল্যান্ডের পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।
এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্সের দাবি, ভারতীয় পণ্যের জন্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করা ও অভিবাসন নীতিতে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে নিউজিল্যান্ড পর্যাপ্ত সুবিধা পাচ্ছে না। তাঁর মতে, বিশেষ করে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যকে চুক্তির বাইরে রাখা নিউজিল্যান্ডের জন্য বড় ধাক্কা।
নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতিতে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারত শুরু থেকেই এ খাতকে আলোচনার বাইরে রাখার শর্ত দেয় এবং সে অনুযায়ীই আলোচনা এগিয়েছে।
উইনস্টন পিটার্স অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, তাঁর আপত্তি ভারতের বিরুদ্ধে নয়। এটি মূলত নিউজিল্যান্ডের জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের প্রতিফলন। বর্তমানে দেশটির ক্ষমতায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পার্টি। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে দলটির আসন ৪৮টি। সরকার টিকিয়ে রাখতে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। উইনস্টন পিটার্সের দল নিউজিল্যান্ড ফার্স্টের রয়েছে আটটি আসন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে কি না।
আলোচনার পটভূমি
ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরু হয় ২০২৫ সালের মার্চে। একাধিক দফা বৈঠকের পর গত ২২ ডিসেম্বর চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়। এরপর সোমবার দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী চুক্তি চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেন।
প্রধানমন্ত্রী লাক্সন একে ‘সুদূরপ্রসারী ও তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি চুক্তিটিকে আখ্যা দেন ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় নিউজিল্যান্ড ভারতের সব রপ্তানি পণ্যের ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করবে। একই সঙ্গে ভারতে ১৫ বছরে ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসটিইএম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক ভিসা এবং দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ ভিসার ব্যবস্থাও থাকছে।
অন্যদিকে ভারত নিউজিল্যান্ডের ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ ট্যারিফ লাইনে বাজার প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। বাকি ২৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ বাদ রাখা হয়েছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, কিছু কৃষিপণ্য, চিনি, তেল, অস্ত্র, রত্ন ও গয়না, তামা ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্য এই তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে।
আপত্তির কারণ
উইনস্টন পিটার্স বলেন, ভারতের বাজারে দুধ, পনির ও মাখনের মতো প্রধান দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর শুল্ক বাধা বহাল থাকছে, যা নিউজিল্যান্ডের কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিকর।
তিনি জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের রপ্তানি প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ।
এ ছাড়া অভিবাসন নীতিতে ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ভারতকে এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমান শ্রমবাজার পরিস্থিতিতে নিউজিল্যান্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত–নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক জোরদার রাখার বিষয়ে তাঁর দল প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
চুক্তির ভবিষ্যৎ
নিউজিল্যান্ডের বিরোধী লেবার পার্টি ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা চুক্তির পক্ষে ভোট দিতে পারে। ফলে পার্লামেন্টে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী লাক্সনও প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
ভারতের দিক থেকে চুক্তি বাস্তবায়নে কোনো বাধা নেই। দেশটির মন্ত্রিসভা আগেই এতে অনুমোদন দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি ও দুগ্ধখাতের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থের সংঘাত থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা কম।



