ট্রাম্প কীভাবে ধরা খেলেন, এখন কী হবে?

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১১:১২ পিএম

আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যৌন হয়রানির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন এবং আদালতের রায়ে জরিমানাও খেয়েছেন– এই খবর এখন সবারই জানা। তাঁর আইনজীবী অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন যে, এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে। অর্থাৎ, এ সংক্রান্ত আইনি লড়াই চলবে আরও কিছুদিন। তারপরও কোনো সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আদালতের এমন রায় অভিনব ঘটনাই বটে। এক অর্থে বলেই দেওয়া যায় যে, ট্রাম্প এবার ধরা খেয়েছেন। কিন্তু এরপর আসলে কী হবে?

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট, তখনই আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের জন্যই এক চমকপ্রদ উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গতিহীন এমন ‘বেখাপ্পা’ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা হওয়া যায় এবং পৃথিবীর ওপর ছড়ি ঘোরানো যায়। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানিসহ মিথ্যা বলা বা সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েই তিনি ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনে ফের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দৌড়ে আছেন ভালোমতোই। আর সেখানটাতেই বাধছে বিপত্তি।

সেই বিপত্তি নিয়ে আলোচনার আগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আদালতের সাম্প্রতিক রায় সম্পর্কে জানা যাক। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লেখিকা জিন ক্যারলকে যৌন হয়রানি ও মানহানির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এর শাস্তি হিসেবে ট্রাম্পকে আলাদা আলাদাভাবে সব মিলিয়ে ৫০ লাখ ডলার জরিমানা করেছেন ম্যানহাটন আদালত। যদিও জিন ক্যারল আদতে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছিলেন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। তবে সেটি প্রমাণিত হয়নি। প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্যারলের বিরুদ্ধে ট্রাম্প শারীরিকভাবে বলপ্রয়োগ করেছিলেন এবং সেটি যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। এর বাইরে মানহানির অভিযোগও প্রমাণিত হয়েছে। ক্যারলের অভিযোগ ছিল, তাঁর তোলা ধর্ষণের অভিযোগকে বারংবার ট্রাম্প মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন এবং এতে ক্যারলের মানহানি হয়েছে। এই দুটি ক্ষেত্রেই ট্রাম্পের মূলত জরিমানা হয়েছে।

আদালতের রায়ের পরপরই ক্যারল এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, 'বিশ্ব আজ সত্য জানতে পেরেছে। এই বিজয় শুধুমাত্র আমার জন্য নয়, এটি সব ভুক্তভোগী নারীর বিজয়।' অন্যদিকে এ রায়কে অপমানজনক বলে অভিহিত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আবারও বলেছেন, ক্যারল সম্পর্কে একেবারেই কিছু জানেন না তিনি। যৌন হয়রানি করার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।

ট্রাম্প অবশ্য যতই অস্বীকার করুন না কেন, দিনশেষে আদালতেই তাঁর অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি আদালতে দেওয়া নিজের স্বীকারোক্তিমূলক প্রশ্নোত্তরেও গুবলেট পাকিয়েছেন তিনি। ক্যারলের আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে প্রায়শই ট্রাম্প উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। ক্যারলের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আইনজীবীকে বলেছিলেন, ক্যারল তাঁর পছন্দের ঘরানার নারী নন! অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, ক্যারল যেহেতু তাঁর পছন্দসই নারীই নন, সেখানে যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না। এই প্রসঙ্গটিকে আরও জোরদার করতে গিয়ে ট্রাম্প ক্যারলের নারী আইনজীবীকেও ব্যক্তিগত আক্রমণ করে বসেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘এমনকি আপনিও আমার পছন্দের ঘরানার নারী নন!’ এমন বক্তব্য দিনশেষে অবশ্য ট্রাম্পের বিরুদ্ধেই গেছে আদালতে। কারণ তখন যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে, তবে কি পছন্দের ঘরানার নারীকে যৌন হয়রানি করাটা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন ব্যক্তি ট্রাম্প?

একইভাবে ট্রাম্প ধরা খেয়েছেন একটি ছবিতে ক্যারলকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও। ক্যারলের সঙ্গে ট্রাম্পের একটি ছবি নিয়ে প্রশ্নোত্তরে প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ক্যারলের আইনজীবী রবার্তা কাপলান। ওই ছবিতে ক্যারলকে দেখে নিজের সাবেক স্ত্রী মার্লা ম্যাপলস বলে ঠাওরেছিলেন ট্রাম্প। পরে নিজের আইনজীবী এই ভুল ভাঙিয়ে দিলে নিজের জবান সংযত করেন ট্রাম্প। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে! জুরিদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ক্যারলকে নিজের পছন্দের ঘরানার নারী নন বলে যে বক্তব্য ট্রাম্প দিয়েছেন, তাতেও খাদ রয়েছে বেশ। যে নারীকে নিজের সাবেক স্ত্রী বলে ট্রাম্প ঠাওরান, সেই নারী তবে তাঁর পছন্দের ঘরানার না হয় কীভাবে?

আবার বিরোধী পক্ষের আইনজীবীর আরেকটি প্রশ্নেও ঘায়েল হয়েছিলেন ট্রাম্প, বেরিয়ে পড়েছিল তাঁর ‘ট্রু কালার’। এবং সেটি ধবধবে ফর্সা ছিল না মোটেও।

২০০৫ সালে এক টক-শোতে গিয়ে হলিউড ও নারীদের নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন আপনি তারকা, তখন আপনি যা খুশি তাই করতে পারেন।’ এই ‘যা খুশি তাই’ বলতে ট্রাম্প মূলত নারীদের সঙ্গে অবাধ যৌনতা ও যৌনতাপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়টিই বুঝিয়েছিলেন। তিনি এমন কথাও বলেছিলেন যার ভদ্রস্থ রূপ দাঁড়ায় যে, তারকা ব্যক্তিত্ব হলে নারীদের গোপন অঙ্গেও অধিকার জন্মে যায়। এবং সেসব কাজ কোনো অনুমতি ছাড়া করাও ডাল-ভাতের মতোই সাধারণ ব্যাপার।

এ ধরনের বিতর্কিত মন্তব্যের বিষয়ে আবার ক্যারলের আইনজীবী প্রশ্ন করেছিলেন ট্রাম্পকে, জিজ্ঞাসাবাদের সময়। তখন ট্রাম্প অবলীলায় বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে, তারকাদের ক্ষেত্রে এটি চরম সত্য।’ ওই সময় নারীদের জোর করে জড়িয়ে ধরার ব্যাপারে ট্রাম্পের মন্তব্যও সামনে এসেছিল। সে বিষয়ে বারংবার প্রশ্নের পর ক্যারলের আইনজীবীকে যে উত্তর দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, তার সিধা অর্থ দাঁড়ায়– এগুলো বছরের পর বছর ধরেই চলে আসছে এবং এটি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক!

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবেই ভিডিও জিজ্ঞাসাবাদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ট্রু ইনটেনশন’ নিয়ে জুরিদের মধ্যে প্রশ্ন উঠে যায়। যার ফলাফল হলো, বুধবারের রায়। অর্থাৎ, নারীদের নিয়ে যে ধরনের বিতর্কিত মন্তব্য লাগাতার করে গেছেন ট্রাম্প এবং ক্যারলের অভিযোগ নিয়েও যেসব আলটপকা ও অযৌক্তিক মন্তব্য করেছেন, তাতে ট্রাম্প যে যৌন হয়রানি করেনইনি, সেই যৌক্তিক ভিত্তিটি নষ্ট হয়ে গেছে।

এখন আসা যাক, এমন রায়ের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আসলে কী? যদি এটি ২০২৪ সালের প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনে অংশগ্রহণের ব্যাপার হয়, তবে সোজা উত্তর– ট্রাম্পের তাতে অংশ নিতে কোনো আইনি বাধা নেই। তবে আসল বাধাটি নৈতিক। যদিও তা নিয়ে ট্রাম্পের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না!

মজার বিষয় হলো, সেই ব্যথা মার্কিন জনগণের মাথাতেও কম। আমেরিকাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও এবিসি নিউজের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইস্যুতে জো বাইডেনের চেয়ে এগিয়ে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৪ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, তাঁরা ট্রাম্পকে ভোট দেবেন। অন্যদিকে, বাইডেনকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ৩৮ শতাংশ ভোটার। তবে এই জরিপ স্বাভাবিকভাবেই আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের বেশ আগে করা। আগামী কয়েক মাস পরের জরিপে হয়তো পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি পাওয়া যাবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এমনতর চরিত্রের ট্রাম্পকে অনেক মার্কিনিই যোগ্য মনে করেন এবং সেটি মনে করেন দেশীয় অর্থনীতিকে শুধুই দেশের মানুষের জন্য বরাদ্দ রাখার ব্যাপারে।

অথচ আমেরিকা দীর্ঘ দিন ধরে (বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) নিজেদের বিশ্বের ত্রাণকর্তা এবং সব ধরনের মহৎ কাজের মূল ঠিকাদার দাবি করে আসছে। এই দাবির ঠিক বিপরীত মেরুতেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। আগেও এমনটা ছিল, তবে গোপনে। ট্রাম্প মূলত সেটিই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন। সেই অবস্থানে থাকা একজন ব্যক্তিই এখন যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে করে রিপাবলিকান শিবিরেই বেশ খানিকটা বেকায়দায় পড়তে পারেন ট্রাম্প। কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর এ বিষয়ে এরই মধ্যে বক্তব্যও দিয়েছেন। রিপাবলিকানদের নারী ভোট ব্যাংকেও এ রায়ের প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেই সঙ্গে ডেমোক্রেটিক শিবিরও পেয়ে যাবে বাড়তি সুবিধা। আর কে না জানে, কারও চরিত্রে টান পড়লে তার রাজনৈতিক সুবিধা ব্যাপকভাবে পায় প্রতিপক্ষরা।

এক কথায়, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন খুব একটা স্বস্তিতে নেই। জিন ক্যারলের অভিযোগের নিষ্পত্তি হলো কেবল। এমন আরও অভিযোগ ও মামলা এখনও ট্রাম্পের ঘাড়ের ওপর ঝুলছে। বয়সের ভারে ন্যূব্জ জো বাইডেনকে ক্রমশ পিছে ফেলার খেলায় ট্রাম্পকে কিছুটা পিছু হটতেই হচ্ছে। এখন ডেমোক্র্যাটরা যদি কোনো নারীকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করতে পারে, তাহলেই খেলা জমে যাবে। তখনই হয়তো ট্রাম্প অনুধাবন করতে পারবেন, বিগত যৌবনের স্বেচ্ছাচারিতা তাঁকে আর কতবার ও কতভাবে ধরা খাওয়াতে পারে!


লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

বেলুচিস্তানের খোজদার জেলার জিদিতে চালানো এক অভিযানে ১৯ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যার দাবি করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। বেলুচিস্তান পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০...
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়েছে নতুন মোড়। যে দেশকে আমেরিকা বছরের পর বছর নিজের ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে মনে করে এসেছে, সেই দেশই নাকি ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে মার্কিন ঘাঁটির গোপন তথ্য! ইরানের এমন দাবি এখন...
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের মধ্যেই ভারতে দিল্লি অভিমুখে কৃষকদের পদযাত্রা ঠেকাতে শম্ভু ও খানৌরি সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সোমবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে...
কানাডা থেকে আমদানীকৃত বিভিন্ন পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, দুগ্ধজাত পণ্য ও অ্যালকোহল কানাডায় রপ্তানির ক্ষেত্রে অসম আচরণ করা হয় উল্লেখ করে প্রতিশোধ...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় আরও দুই সন্দেহভাজন জাহিদুল ইসলাম ও ফয়সাল আহমেদ রাব্বীর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
হবিগঞ্জে পৃথক অভিযানে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের মূল হোতাসহ মোট ৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব-৯। সোমবার দুপুরে হবিগঞ্জে র‍্যাব-৯-এর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান র‍্যাব কর্মকর্তারা।
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর