প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৩, ০৫:২৮ পিএমআপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১০:০৯ পিএম
আমেরিকা-চীন যুদ্ধই কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী - আমেরিকা ও চীন পরস্পরের প্রতি এই মনোভাব নিয়েই চলছে অনেক দিন হলো। সময় যত যাচ্ছে, পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে। এতদিন বাণিজ্যযুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধসহ নানা শব্দবন্ধ এই প্রেক্ষাপটে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু এখন ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে সরাসরি বড় যুদ্ধের আশঙ্কায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। আর সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বিচারে আমেরিকা-চীন যদি কোনো যুদ্ধে জড়ায়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অভিধা পেতে সময় লাগবে না। একবুক শঙ্কা বুকে নিয়ে বিশ্ববাসী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানোর পথ খুঁজছে। সেখানেই শতবর্ষী হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ হলো - আমেরিকা ও চীনকে একসাথে থাকার মন্ত্র শিখতে হবে। সাথে এই বলেও সতর্ক করেছেন যে, এই শেখার জন্য তাদের হাতে দশ বছরেরও কম সময় রয়েছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার শতবর্ষে পা রেখেছেন আজ ২৭ মে। উনিশ শতকীয় কূটনীতির জীবন্ত অভিধান বলা যায় তাঁকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো বটেই গত ৪৬ বছর ধরে পশ্চিমা রাজপরিবার, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তির আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে করা যেকোনো মন্তব্যকে ধর্তব্যে নিতেই হয়। ফলে তিনি যখন বলেন, আমেরিকা ও চীন উভয় পক্ষই পরস্পরকে কৌশলগত বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন নড়েচড়ে বসতে হয়।
হেনরি কিসিঞ্জারকে নিয়ে গত ১৭ মে প্রকাশিত সংখ্যায় বিশেষ প্রতিবেদন ছেপেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। মূলত চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে কিসিঞ্জারের ভাবনাকেই তুলে ধরা হয়েছে এতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনকে নতি স্বীকার করাতে সম্ভাব্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত আমেরিকা - এমন উপসংহারে পৌঁছে গেছে বেইজিং। আর ওয়াশিংটন এই বিষয়ে নিশ্চিত যে, চীন বিশ্বশক্তি হিসেবে আমেরিকার অবস্থান নড়িয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই দুই অক্ষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং পরাশক্তি দুটির মধ্যে কোনো ধরনের যুদ্ধ এড়াতে এ উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে পাঠ নিতে হলে যেতে হবে হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। ছবি: উইকিপিডিয়া
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আর্ট ডেকো ভবনের ৩৪ তলায় বসে কিসিঞ্জার কী বলছেন, তা শোনা যাক। কিসিঞ্জারের সোজাসাপটা কথা- ‘দুপক্ষই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, অন্য পক্ষ তাদের জন্য কৌশলগত হুমকি। আমরা পরাশক্তির লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।’
চীন ও আমেরিকার দ্বন্দ্ব যুদ্ধের পরিণতিতে না পৌঁছানোর বিষয়ে করণীয় কী হতে পারে, তা নিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে ইকোনমিস্ট দীর্ঘ আলাপ করেছে। পত্রিকাটির ভাষ্য, কিসিঞ্জার অতীতের বদলে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে বেশি আগ্রহী। এর কারণও আছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জোটগুলোর প্রবণতা নিয়ে দুটি বই লিখছেন। অচিরেই হয়তো দুটি বই আলোর মুখ দেখবে।
হেনরি কিসিঞ্জারের মতে, চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই দিনদিন তীব্র হচ্ছে। চীনের বলয়ে রাশিয়ার ঢুকে পড়া কিংবা ইউরোপের পূর্ব অংশে যুদ্ধের শঙ্কা বৃদ্ধির যাবতীয় বাস্তবতা থাকলেও এ দুই পরাশক্তির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দিনদিন তীব্রতর হচ্ছে। গোটা বিশ্বেই শক্তির ভারসাম্য ও সামরিক প্রযুক্তির এত দ্রুত ও এতভাবে বদল হচ্ছে যে, কোনো দেশের পক্ষেই কোনো একটি নীতির ওপর ভিত্তি করে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই উপায় খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত দিশা না মিললে বল প্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে হাজির করা হচ্ছে।
এ বাস্তবতা নিয়ে সতর্ক করে কিসিঞ্জার বলছেন, ‘আমরা এখন আছি প্রাক-প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই ধ্রুপদি বাস্তবতায়। যেখানে কোনো পক্ষের কাছেই রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল না। ফলে বিদ্যমান সাম্যাবস্থার যেকোনো অদল-বদলই যুদ্ধের কারণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধে কিসিঞ্জারের ভূমিকা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রশ্নের ভিত অনেক মজবুতও। ভিয়েতনামে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিসিঞ্জারের ভূমিকা কোনোভাবেই যুদ্ধবিরোধী নয়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রসঙ্গে একে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এসব কারণে তাঁর সমালোচনাও হয় বিস্তর এবং তা যৌক্তিক কারণেই। তারপরও এটা মানতে হবে যে, তিনি তাঁর কূটনৈতিক জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন এটা নিশ্চিত করতে যে, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যেন আর কোনো যুদ্ধ না হয়। নাৎসি জার্মানির দাপট এবং হলোকাস্টে ১৩ জন নিকটাত্মীয় হারানো কিসিঞ্জার একটা বিষয় বুঝেছেন যে, এ ধরনের যুদ্ধ এড়ানোর সর্বোচ্চ পন্থা হলো জোরদার কূটনীতি, যার ভিতে থাকবে সম-স্বার্থ।
আর এমন কূটনৈতিক তৎপরতা বেশ কঠিন। কিসিঞ্জারের ভাষ্যে, ‘এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। আমি আমার গোটা জীবন এই সমাধানের পেছনেই ছুটেছি।’ বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও চীন একসাথে পাশাপাশি চলতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে মানুষের ভবিষ্যৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে এই দুই দেশের হাতে সংঘাত এড়ানোর পথ বের করার জন্য মাত্র ৫-১০ বছর সময় আছে।’
একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে নিজের দেশকেই পরামর্শ দিতে চান কিসিঞ্জার। তাঁর মতে, ‘আমেরিকার উচিত নির্মমভাবে নিজের অবস্থান শনাক্ত করা। একইসঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষাকে শনাক্ত করা দরকার। অনেক চীনা বুদ্ধিজীবীই মনে করেন যে, আমেরিকার অবস্থানের অবনমন হচ্ছে। ফলে ইতিহাসের পরিক্রমাতেই তাদের ছাড়িয়ে যাবে চীন।’
চীন ও আমেরিকার দ্বন্দ্ব অনেক দিন ধরেই চলছে। গোটা বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে এখন চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রশ্ন করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই প্রশ্ন করার শক্তিটির জোগানদাতা চীনই। তারা পশ্চিমা কাঠামোকে সরাসরি বলছে মার্কিন নিয়ম ও মার্কিন কাঠামো। কিন্তু চীন এখন আর এই কাঠামোতে থাকতে নারাজ। তাদের মতে, নতুন শক্তি হিসেবে এই কাঠামোর প্রস্তাবক চীনের হওয়া উচিত। তাদের ভয় হচ্ছে, অর্থ-বিত্ত বা প্রযুক্তি বিচারে চীনের শক্তি যতই হোক না কেন, আমেরিকা কখনোই চীনকে সমকক্ষ মনে করবে না। আর এই শঙ্কাটি তাদের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অপমানের জন্ম দিচ্ছে।
এখানেই দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির একটি জায়গা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন কিসিঞ্জার। আর এই ভুল বোঝাবুঝি থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করছেন। তাঁর মতে, চীনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে আমেরিকার কিছু ভুল রয়েছে। এই ভুল শুধরে নিলে অঘটন থামানো যেতে পারে।
কিসিঞ্জার বলছেন, ‘ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের মতে, চীন বিশ্বকে শাসন করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চীন আসলে শক্তিশালী হতে চায়। অ্যাডলফ হিটলারের মতো করে গোটা বিশ্বকে পদানত করার কোনো লক্ষ্য নিয়ে চীন এগোচ্ছে না। বিশ্ব শাসনের মতো কোনো বিষয় নিয়ে তারা ভাবে না বা আজ অবধি ভাবেনি।’
কিসিঞ্জারের ভাষ্য অনুযায়ী, হিটলারের নাৎসি জার্মানির জন্য যুদ্ধ এড়ানোর পথ ছিল না। চীন ব্যতিক্রম। মাও সেতুংসহ বিভিন্ন সময়ে চীনের শীর্ষ নেতাদের সাথে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে কিসিঞ্জার বলেন, তাদের আদর্শিক অবস্থান নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় নেই। তবে এই আদর্শ সব সময়ই তাদের দেশের স্বার্থ ও সক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত। চীনে কার্ল মার্কসের বদলে কনফুসিয়াস বেশি শক্তিশালী। আর এই আদর্শ তাদের উদ্দীপ্ত করে দেশের সক্ষমতাকেই সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে। আর এর মাধ্যমে পাওয়া অর্জনের স্বীকৃতি গোটা বিশ্বের কাছ থেকে আদায় করতে চায় তারা।
চীন গত দশকগুলোয় অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি, সামরিক বহু দিক থেকেই অভাবনীয় অগ্রগতি দেখেছে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই তারা আজ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু এর কোনো স্বীকৃতি মিলছে না স্বঘোষিত মোড়লদের কাছ থেকে। ক্ষয়িষ্ণু আমেরিকা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও তার প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিতেও অনেক ক্ষেত্রে কুণ্ঠিত। এই অবজ্ঞাকেই মানতে রাজি নয় চীন। চলমান দ্বন্দ্ব ও চীনা জাত্যাভিমানে আমেরিকার নিত্যকার এই আঘাতকেই সবচেয়ে বড় শঙ্কার ক্ষেত্র বলে মনে করছেন কিসিঞ্জার। তাঁর মতে, এই সংকট কাটাতে আমেরিকাকেই অনেকটা এগোতে হবে। না হলে পরাশক্তি দুটিকে যুদ্ধে জড়াতে দেখা এবং সেই সূত্রে গোটা বিশ্বের মাথার ওপর তৃতীয় বিশ্বের খড়্গ নেমে আসাটা থামানো যাবে না। শতবর্ষী এই কূটনীতিকের পরামর্শ দুই দেশ আমলে নিলেই হয়।
জর্ডান, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান। মঙ্গলবার রাতে এসব হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড আইআরজিসি।
সিন্ধু নদের পানি বণ্টন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার নতুন মোড় নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের হেগের স্থায়ী সালিশি আদালত সিন্ধু পানি চুক্তি বহাল রাখার পক্ষে রায় দেওয়ার পর তা সরাসরি...
নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ১ লাখ কোটি ডলারের খনিজ সম্পদ উত্তোলনে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে আফগানিস্তান। খনির অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতে বৃহত্তর মার্কিন বিনিয়োগ ওয়াশিংটনের সঙ্গে...
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা কার্যালয়ে গেরুয়া রং লেপে দিয়েছে একদল বিক্ষোভকারী। মঙ্গলবার দুপুরে গেরুয়া পাগড়ি পরে 'জয় শ্রী রাম' স্লোগান তুলে কয়েকজন মানুষ এই কর্মকাণ্ড করে বলে...
যশোরের শার্শায় একই বাড়িতে বাবা ও দুই শিশু সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে শার্শা থানা-পুলিশ। শিশু দুটিকে হত্যার পর তাদের বাবা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয়রা। বিষয়টি...
রাজধানীর বেইলি রোডে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটিকে ঘষামাজা করে চলছে আবারও চালুর প্রস্তুতি। তবে সংস্কারের কোনো অনুমতি ছাড়া এ ধরনের সংস্কারকাজ সম্পূর্ণ বেআইনি বলে...
খুলনা ভৈরব নদের জেলখানা ঘাট এলাকায় ট্রলার ও ফেরি সংঘর্ষে হয়েছে। এতে ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কেউ নিখোঁজ আছে কিনা তা...
আমেরিকা-চীন যুদ্ধই কী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী - আমেরিকা ও চীন পরস্পরের প্রতি এই মনোভাব নিয়েই চলছে অনেক দিন হলো। সময় যত যাচ্ছে, পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে। এতদিন বাণিজ্যযুদ্ধ, সাইবার যুদ্ধসহ নানা শব্দবন্ধ এই প্রেক্ষাপটে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু এখন ইউক্রেন যুদ্ধের পটভূমিতে সরাসরি বড় যুদ্ধের আশঙ্কায় রয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা। আর সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি বিচারে আমেরিকা-চীন যদি কোনো যুদ্ধে জড়ায়, তবে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অভিধা পেতে সময় লাগবে না। একবুক শঙ্কা বুকে নিয়ে বিশ্ববাসী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানোর পথ খুঁজছে। সেখানেই শতবর্ষী হেনরি কিসিঞ্জারের পরামর্শ হলো - আমেরিকা ও চীনকে একসাথে থাকার মন্ত্র শিখতে হবে। সাথে এই বলেও সতর্ক করেছেন যে, এই শেখার জন্য তাদের হাতে দশ বছরেরও কম সময় রয়েছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার শতবর্ষে পা রেখেছেন আজ ২৭ মে। উনিশ শতকীয় কূটনীতির জীবন্ত অভিধান বলা যায় তাঁকে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী তো বটেই গত ৪৬ বছর ধরে পশ্চিমা রাজপরিবার, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীদের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা এই ব্যক্তির আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে করা যেকোনো মন্তব্যকে ধর্তব্যে নিতেই হয়। ফলে তিনি যখন বলেন, আমেরিকা ও চীন উভয় পক্ষই পরস্পরকে কৌশলগত বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন নড়েচড়ে বসতে হয়।
হেনরি কিসিঞ্জারকে নিয়ে গত ১৭ মে প্রকাশিত সংখ্যায় বিশেষ প্রতিবেদন ছেপেছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট। মূলত চীন-আমেরিকা দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে কিসিঞ্জারের ভাবনাকেই তুলে ধরা হয়েছে এতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনকে নতি স্বীকার করাতে সম্ভাব্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত আমেরিকা - এমন উপসংহারে পৌঁছে গেছে বেইজিং। আর ওয়াশিংটন এই বিষয়ে নিশ্চিত যে, চীন বিশ্বশক্তি হিসেবে আমেরিকার অবস্থান নড়িয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এই দুই অক্ষের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং পরাশক্তি দুটির মধ্যে কোনো ধরনের যুদ্ধ এড়াতে এ উত্তেজনা প্রশমনের উপায় নিয়ে পাঠ নিতে হলে যেতে হবে হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। ছবি: উইকিপিডিয়া
নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আর্ট ডেকো ভবনের ৩৪ তলায় বসে কিসিঞ্জার কী বলছেন, তা শোনা যাক। কিসিঞ্জারের সোজাসাপটা কথা- ‘দুপক্ষই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, অন্য পক্ষ তাদের জন্য কৌশলগত হুমকি। আমরা পরাশক্তির লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।’
চীন ও আমেরিকার দ্বন্দ্ব যুদ্ধের পরিণতিতে না পৌঁছানোর বিষয়ে করণীয় কী হতে পারে, তা নিয়ে কিসিঞ্জারের সাথে ইকোনমিস্ট দীর্ঘ আলাপ করেছে। পত্রিকাটির ভাষ্য, কিসিঞ্জার অতীতের বদলে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে বেশি আগ্রহী। এর কারণও আছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জোটগুলোর প্রবণতা নিয়ে দুটি বই লিখছেন। অচিরেই হয়তো দুটি বই আলোর মুখ দেখবে।
হেনরি কিসিঞ্জারের মতে, চীন ও আমেরিকার মধ্যে প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই দিনদিন তীব্র হচ্ছে। চীনের বলয়ে রাশিয়ার ঢুকে পড়া কিংবা ইউরোপের পূর্ব অংশে যুদ্ধের শঙ্কা বৃদ্ধির যাবতীয় বাস্তবতা থাকলেও এ দুই পরাশক্তির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দিনদিন তীব্রতর হচ্ছে। গোটা বিশ্বেই শক্তির ভারসাম্য ও সামরিক প্রযুক্তির এত দ্রুত ও এতভাবে বদল হচ্ছে যে, কোনো দেশের পক্ষেই কোনো একটি নীতির ওপর ভিত্তি করে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। সবাই উপায় খুঁজছে। শেষ পর্যন্ত দিশা না মিললে বল প্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে হাজির করা হচ্ছে।
এ বাস্তবতা নিয়ে সতর্ক করে কিসিঞ্জার বলছেন, ‘আমরা এখন আছি প্রাক-প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সেই ধ্রুপদি বাস্তবতায়। যেখানে কোনো পক্ষের কাছেই রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল না। ফলে বিদ্যমান সাম্যাবস্থার যেকোনো অদল-বদলই যুদ্ধের কারণ হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধে কিসিঞ্জারের ভূমিকা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রশ্নের ভিত অনেক মজবুতও। ভিয়েতনামে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিসিঞ্জারের ভূমিকা কোনোভাবেই যুদ্ধবিরোধী নয়। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রসঙ্গে একে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এসব কারণে তাঁর সমালোচনাও হয় বিস্তর এবং তা যৌক্তিক কারণেই। তারপরও এটা মানতে হবে যে, তিনি তাঁর কূটনৈতিক জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন এটা নিশ্চিত করতে যে, পরাশক্তিগুলোর মধ্যে যেন আর কোনো যুদ্ধ না হয়। নাৎসি জার্মানির দাপট এবং হলোকাস্টে ১৩ জন নিকটাত্মীয় হারানো কিসিঞ্জার একটা বিষয় বুঝেছেন যে, এ ধরনের যুদ্ধ এড়ানোর সর্বোচ্চ পন্থা হলো জোরদার কূটনীতি, যার ভিতে থাকবে সম-স্বার্থ।
আর এমন কূটনৈতিক তৎপরতা বেশ কঠিন। কিসিঞ্জারের ভাষ্যে, ‘এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত। আমি আমার গোটা জীবন এই সমাধানের পেছনেই ছুটেছি।’ বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও চীন একসাথে পাশাপাশি চলতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে মানুষের ভবিষ্যৎ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে এই দুই দেশের হাতে সংঘাত এড়ানোর পথ বের করার জন্য মাত্র ৫-১০ বছর সময় আছে।’
একজন মার্কিন নাগরিক হিসেবে নিজের দেশকেই পরামর্শ দিতে চান কিসিঞ্জার। তাঁর মতে, ‘আমেরিকার উচিত নির্মমভাবে নিজের অবস্থান শনাক্ত করা। একইসঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষাকে শনাক্ত করা দরকার। অনেক চীনা বুদ্ধিজীবীই মনে করেন যে, আমেরিকার অবস্থানের অবনমন হচ্ছে। ফলে ইতিহাসের পরিক্রমাতেই তাদের ছাড়িয়ে যাবে চীন।’
চীন ও আমেরিকার দ্বন্দ্ব অনেক দিন ধরেই চলছে। গোটা বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমা নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলাকে এখন চীনসহ বেশ কয়েকটি দেশ প্রশ্ন করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই প্রশ্ন করার শক্তিটির জোগানদাতা চীনই। তারা পশ্চিমা কাঠামোকে সরাসরি বলছে মার্কিন নিয়ম ও মার্কিন কাঠামো। কিন্তু চীন এখন আর এই কাঠামোতে থাকতে নারাজ। তাদের মতে, নতুন শক্তি হিসেবে এই কাঠামোর প্রস্তাবক চীনের হওয়া উচিত। তাদের ভয় হচ্ছে, অর্থ-বিত্ত বা প্রযুক্তি বিচারে চীনের শক্তি যতই হোক না কেন, আমেরিকা কখনোই চীনকে সমকক্ষ মনে করবে না। আর এই শঙ্কাটি তাদের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অপমানের জন্ম দিচ্ছে।
এখানেই দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির একটি জায়গা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন কিসিঞ্জার। আর এই ভুল বোঝাবুঝি থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটে যেতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করছেন। তাঁর মতে, চীনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বোঝার ক্ষেত্রে আমেরিকার কিছু ভুল রয়েছে। এই ভুল শুধরে নিলে অঘটন থামানো যেতে পারে।
কিসিঞ্জার বলছেন, ‘ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাদের মতে, চীন বিশ্বকে শাসন করতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে চীন আসলে শক্তিশালী হতে চায়। অ্যাডলফ হিটলারের মতো করে গোটা বিশ্বকে পদানত করার কোনো লক্ষ্য নিয়ে চীন এগোচ্ছে না। বিশ্ব শাসনের মতো কোনো বিষয় নিয়ে তারা ভাবে না বা আজ অবধি ভাবেনি।’
কিসিঞ্জারের ভাষ্য অনুযায়ী, হিটলারের নাৎসি জার্মানির জন্য যুদ্ধ এড়ানোর পথ ছিল না। চীন ব্যতিক্রম। মাও সেতুংসহ বিভিন্ন সময়ে চীনের শীর্ষ নেতাদের সাথে সাক্ষাতের প্রসঙ্গ টেনে কিসিঞ্জার বলেন, তাদের আদর্শিক অবস্থান নিয়ে তাঁর কোনো সংশয় নেই। তবে এই আদর্শ সব সময়ই তাদের দেশের স্বার্থ ও সক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত। চীনে কার্ল মার্কসের বদলে কনফুসিয়াস বেশি শক্তিশালী। আর এই আদর্শ তাদের উদ্দীপ্ত করে দেশের সক্ষমতাকেই সর্বোচ্চ শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে। আর এর মাধ্যমে পাওয়া অর্জনের স্বীকৃতি গোটা বিশ্বের কাছ থেকে আদায় করতে চায় তারা।
চীন গত দশকগুলোয় অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি, সামরিক বহু দিক থেকেই অভাবনীয় অগ্রগতি দেখেছে। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমেই তারা আজ বিশ্বের শীর্ষ অর্থনৈতিক শক্তি। কিন্তু এর কোনো স্বীকৃতি মিলছে না স্বঘোষিত মোড়লদের কাছ থেকে। ক্ষয়িষ্ণু আমেরিকা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করলেও তার প্রকাশ্য স্বীকৃতি দিতেও অনেক ক্ষেত্রে কুণ্ঠিত। এই অবজ্ঞাকেই মানতে রাজি নয় চীন। চলমান দ্বন্দ্ব ও চীনা জাত্যাভিমানে আমেরিকার নিত্যকার এই আঘাতকেই সবচেয়ে বড় শঙ্কার ক্ষেত্র বলে মনে করছেন কিসিঞ্জার। তাঁর মতে, এই সংকট কাটাতে আমেরিকাকেই অনেকটা এগোতে হবে। না হলে পরাশক্তি দুটিকে যুদ্ধে জড়াতে দেখা এবং সেই সূত্রে গোটা বিশ্বের মাথার ওপর তৃতীয় বিশ্বের খড়্গ নেমে আসাটা থামানো যাবে না। শতবর্ষী এই কূটনীতিকের পরামর্শ দুই দেশ আমলে নিলেই হয়।
ফজলুল কবির: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টিভি ডিজিটাল