প্রকাশ : ২৯ মে ২০২৩, ০৯:৫৬ পিএমআপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৯:৫৯ পিএম
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান
পাকিস্তান এক অদ্ভুত দেশ। এ দেশের রাজনীতিকেরা পাকা খেলোয়াড়, না নবিশ বোঝা বড় দায়। যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন এক রূপ। আর বাইরে আরেক। এই ইমরান খানের কথাই ধরুন না। ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছেন এখনো বছর গড়ায়নি। কিন্তু তাঁর মুখের বুলি পুরো পাল্টে গেছে। এখন তিনি বারবার ‘ইস্ট পাকিস্তান’ (বাংলাদেশ) ও ‘মুজিবুর রহমান’-এর (জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) নাম জপ করে চলেছেন। সে জনসভা হোক বা টুইটার পোস্ট।
ভারতের অনলাইন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়্যার’ গত ২৭ মে শনিবার ইমরান খানের একটি ভাষণ প্রচার করেছে। ভারতের মূলধারার, বিশেষ করে যারা ‘গদি মিডিয়া’ নামে ইতিমধ্যে বিশেষণ পেয়ে গেছে, তাদের বিপরীতে ‘দ্য ওয়্যার’ একটি উল্লেখযোগ্য সংবাদমাধ্যম। ইমরান খান নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে অত্যন্ত আলোচিত চরিত্র। কিন্তু দ্য ওয়ারের মতো প্রতিষ্ঠান যখন তাঁর ৩৩-৩৪ মিনিটের উর্দুতে দেওয়া ব্ক্তব্য প্রচার করে, নিশ্চিতভাবে তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ভাষণে ইমরান তাঁর ক্রিকেট খেলা, ইংল্যান্ডে পড়াশোনা, সেখানে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, অবৈধ ক্ষমতার চর্চার অনুপস্থিতি, প্রবাসী পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন, ইংল্যান্ডে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। সেখানে পাকিস্তানে এমপি ও আইপ্রণেতারা ব্যস্ত থাকেন সুপারিশ করার জন্য। নিজে সুপারিশ নিয়ে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘোরেন। ঘুষ ছাড়া কোথাও কোনো কাজ হয় না। ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা-এই দুটি বিষয় যেন দেশ থেকে উধাও। ফলে প্রবাসীদের মন কাঁদলেও তাঁরা আর স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে ফিরতে পারেন না। আর যারা ফেরেন, তাঁরাও দেশে কিছু করতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়ে আবার বিদেশ ফিরে যান। শিকড়ে আর ফেরা হয় না।
ইমরান খানের আরও উপলব্ধি, যে কারণে পাকিস্তান হয়েছিল, তার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। আজাদি বা স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। নিরাপত্তা নেই। হিটলারের জার্মানিতে এমনটা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
তবে আধঘণ্টার বেশি এই বক্তব্যে ইমরান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করতে ভোলেননি। তাঁর বক্তব্য, ফৌজি (সেনা) যদি না থাকে, তাহলে দেশই তো থাকে না। তাহলে খামাখা তিনি ফৌজের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে যাবেন কেন? অবশ্যই। এই আহাম্মকি কী তাঁর সাজে, যিনি কিনা আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন!
পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক বেশ মজার একটা কথা বলেছেন। নিজের ভাষণে পাকিস্তানের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেছেন, এতটা খারাপ অবস্থা না হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার লোকজন রাস্তায় নেমে এসেছিল। হায়রে পোড়া কপাল এক মার্কিন ডলারে ৩০৮ রুপি (পাকিস্তানি) পাওয়া গেলেও রাস্তায় নামা তো দূরে থাক টনকও নড়েনি সাধারণ পাকিস্তানিদের। দুঃখ করে কী আর করবেন খানসাহেব? আজকের যে ভূখণ্ডের প্রধানমন্ত্রী আপনি ছিলেন, সেখানকার অধিকাংশ লোকই পাকিস্তান তৈরির জন্য কোনো লড়াই-সংগ্রাম করেনি। বরং পেশোয়ারে সীমান্ত গান্ধী নামে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খানের নেতৃত্বে কংগ্রেসের পতাকা তলে ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংবাদিক হামিদ মির বিভিন্ন লেখায় লিখেছেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও বলেছেন, পাকিস্তান আসলে হয়েছিল বাঙালি মুসলমানদের লড়াইয়ের জন্য, বর্তমান পাকিস্তানিদের জন্য নয়। অথচ পাকিস্তান হওয়ার পর প্রথম অন্যায়-বেইমানির শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা, তাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর শেষ হয়েছিল, ২৫ মার্চের কালরাত থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
খানসাহেবের কথায় আবার ফেরা যাক। ১৯৭০-এর নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল জিতেছিল ৮১টি আসনে। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের দল পেয়েছিল ১৬০টি আসন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে ক্ষমতায় বসতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, শেখ মুজিব শুধু ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানকে যে কলোনি করে রাখা হয়েছিল, তার প্রতিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকারের বদলে শুরু হয় সামরিক অভিযান। আর তাতে প্রতিকার বদলে গেল প্রতিরোধে, স্বাধীনতার সংগ্রামে। এই অনুধাবন আসতে ইমরানের ৫২ বছর লেগে গেল?
লাগারই কথা। কারণ বঙ্গবন্ধুকে তো পাকিস্তানের মসনদে বসার সুযোগই দেওয়া হয়নি। সে সুযোগ বরং ইমরান পেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর কারসাজিতে সাজানো নির্বাচন হলেও ইমরান ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। প্রধানমন্ত্রী পদে বসার সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে ঘাড় ধরে বিদায় করে দেওয়ার পরই যেন তাঁর জ্ঞানোদয় হয়। পাকিস্তানের প্রথম বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বুঝতে পারেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় বসতে দেননি তাঁরই পূর্বসুরী রাজনীতিকেরা। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পরামর্শে জেনারেল আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর সাথে যে কাজটি করেছিলেন, এখন পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের অঙ্গুলিহেলনে সেই কাজটি তাঁর সাথে করেছেন শাহবাজ শরিফ ও আসিফ আলি জারদারি। আর তাতেই তিনি পাকিস্তানের আবার ভাঙনের লক্ষণ টের পেলেন। খানসাহেব কী জানেন, পাকিস্তানে গত ৭৫ বছরে কোনো প্রধানমন্ত্রীই পাঁচ বছরের পুরো মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি।
তাহলে ইমরানের আগে ‘শহীদ’ হওয়া প্রধানমন্ত্রীদের কেউ এ প্রশ্ন তুললেন না কেন? কেন ইমরান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম? বরং তিনি যেখান থেকে নির্বাচিত হন বা তাঁর বাড়ি যেখানে, সেই পাঞ্জাব প্রদেশের আধিপত্যকামিতার বিরুদ্ধেই তো পাকিস্তানের অন্য সব প্রদেশ সরব। খনিজ ও বন্দর সমৃদ্ধ বেলুচিস্থান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া বা সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ- এ দুই প্রদেশের নেতাদের মনের কথা তো এখন ইমরানের মুখে? তিনি কার থেকে আলাদা হবেন? আবার এর মধ্যে একবার প্রতাপশালী সেনাবাহিনীর প্রশংসা, আবার তাদের অনৈতিক ও অসাংবিধানিক কাজকর্ম নিয়ে সরব হয়ে আর যাই হোক তার মধ্যে বাংলাদেশ বা ১৯৭১-কে টেনে এনে কোনো কিছুরই ন্যায্যতা দিতে পারবেন না ইমরান।
ইমরান যে তাঁর আধা ঘণ্টার ভাষণে বললেন, ‘কোনো জাতি যখন তার স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, ন্যায়ের দাবি যখন মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়, তখন আসলে তুমি যাই কর, যতই সেনা অভিযান চালাও না কেন, তাদের ভেতর থেকে এর কোনো কিছুই উপড়ে ফেলতে পারবে না।’
‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’–এ কথা এত দিন পরে মনে হলো? সত্যিকার অর্থে যদি তাঁর এই বোধদয় হয়ে থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ইমরান কেন ৭১-এর ঘটনার জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইলেন না বা চাওয়ার প্রস্তাব তুললেন না? আরেকটু পেছনে ফেরা যাক। বাংলাদেশে যখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, তখন ইমরান নিন্দায় সরব হয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথা জানতেন, কিন্তু তাদের দোসরদের কুকীর্তি সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন? এটা কি কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে!
ফলে ইমরান খানও তাঁর অন্য রাজনৈতিক সতীর্থদের মতো রাজনৈতিক দ্বিচারিতায় আক্রান্ত। স্বার্থে ঘা লাগলেই তাঁদের বোধদয় হয়। ক্ষমতায় থাকলে সেনাবাহিনী ‘ফেরেস্তা’, বাইরে থাকলে শয়তান। এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানের রাজনীতিকেরা গত ৭৫ বছরের ইতিহাসটা একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। পারলে শিক্ষা নিন। তাহলে বাংলাদেশ এই সময়কালে কত এগিয়ে গেছে, আমরা পারিনি- এই দুঃখবিলাস থেকে বেরিয়ে এসে দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারবেন। পাকিস্তান যে সব দিক দিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে-এটা ইমরান খান-শাহাবাজ শরিফ-বিলাওয়াল ভুট্টো এবং তাঁদের মূল চালিকা শক্তি সেনাবাহিনী হা-হুতাশ না করে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে, ততই মঙ্গল। না হলে ‘ইস্ট পাকিস্তান’-এর উদাহরণ তো সামনে আছেই।
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
পার্লামেন্ট অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টি-সিজেপির বিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। দফায় দফায় সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার সঙ্গে সঙ্গে এ পথে কোনো জ্বালানি তেল পরিবহন করতে দেওয়া হবে না...
হরমুজ প্রণালিতে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণেরপর ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বরাতে আজ আল জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পদ্মা ট্রেনের টিকিট পরীক্ষকের (টিটিই) কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনাকে কেন্দ্র করে রেললাইন অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে...
সুফল পেয়ে ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাযুক্ত ক্যামেরা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। যান চলাচলের চারটি অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দাবি করে, সড়কে আরও দুটি অপরাধ...
এক বছর আগে মাইলস্টোন স্কুলের যে ভবনটিতে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে সেই ভবনটির কিছু নির্মাণক্রুটি ছিল। আর পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি ও তাঁর তদারকি কর্মকর্তার...
ইমরান কেন বারবার বাংলাদেশের খোয়াব দেখেন
পাকিস্তান এক অদ্ভুত দেশ। এ দেশের রাজনীতিকেরা পাকা খেলোয়াড়, না নবিশ বোঝা বড় দায়। যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন এক রূপ। আর বাইরে আরেক। এই ইমরান খানের কথাই ধরুন না। ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছেন এখনো বছর গড়ায়নি। কিন্তু তাঁর মুখের বুলি পুরো পাল্টে গেছে। এখন তিনি বারবার ‘ইস্ট পাকিস্তান’ (বাংলাদেশ) ও ‘মুজিবুর রহমান’-এর (জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) নাম জপ করে চলেছেন। সে জনসভা হোক বা টুইটার পোস্ট।
ভারতের অনলাইন সংবাদপত্র ‘দ্য ওয়্যার’ গত ২৭ মে শনিবার ইমরান খানের একটি ভাষণ প্রচার করেছে। ভারতের মূলধারার, বিশেষ করে যারা ‘গদি মিডিয়া’ নামে ইতিমধ্যে বিশেষণ পেয়ে গেছে, তাদের বিপরীতে ‘দ্য ওয়্যার’ একটি উল্লেখযোগ্য সংবাদমাধ্যম। ইমরান খান নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে অত্যন্ত আলোচিত চরিত্র। কিন্তু দ্য ওয়ারের মতো প্রতিষ্ঠান যখন তাঁর ৩৩-৩৪ মিনিটের উর্দুতে দেওয়া ব্ক্তব্য প্রচার করে, নিশ্চিতভাবে তা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
ভাষণে ইমরান তাঁর ক্রিকেট খেলা, ইংল্যান্ডে পড়াশোনা, সেখানে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, অবৈধ ক্ষমতার চর্চার অনুপস্থিতি, প্রবাসী পাকিস্তানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন, ইংল্যান্ডে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা। সেখানে পাকিস্তানে এমপি ও আইপ্রণেতারা ব্যস্ত থাকেন সুপারিশ করার জন্য। নিজে সুপারিশ নিয়ে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘোরেন। ঘুষ ছাড়া কোথাও কোনো কাজ হয় না। ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা-এই দুটি বিষয় যেন দেশ থেকে উধাও। ফলে প্রবাসীদের মন কাঁদলেও তাঁরা আর স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে ফিরতে পারেন না। আর যারা ফেরেন, তাঁরাও দেশে কিছু করতে গিয়ে চরম হেনস্তার শিকার হয়ে আবার বিদেশ ফিরে যান। শিকড়ে আর ফেরা হয় না।
ইমরান খানের আরও উপলব্ধি, যে কারণে পাকিস্তান হয়েছিল, তার সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে। আজাদি বা স্বাধীনতা বলে কিছু নেই। নিরাপত্তা নেই। হিটলারের জার্মানিতে এমনটা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
তবে আধঘণ্টার বেশি এই বক্তব্যে ইমরান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রশংসা করতে ভোলেননি। তাঁর বক্তব্য, ফৌজি (সেনা) যদি না থাকে, তাহলে দেশই তো থাকে না। তাহলে খামাখা তিনি ফৌজের সাথে দ্বন্দ্বে জড়াতে যাবেন কেন? অবশ্যই। এই আহাম্মকি কী তাঁর সাজে, যিনি কিনা আবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন!
পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক বেশ মজার একটা কথা বলেছেন। নিজের ভাষণে পাকিস্তানের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বলেছেন, এতটা খারাপ অবস্থা না হওয়া সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কার লোকজন রাস্তায় নেমে এসেছিল। হায়রে পোড়া কপাল এক মার্কিন ডলারে ৩০৮ রুপি (পাকিস্তানি) পাওয়া গেলেও রাস্তায় নামা তো দূরে থাক টনকও নড়েনি সাধারণ পাকিস্তানিদের। দুঃখ করে কী আর করবেন খানসাহেব? আজকের যে ভূখণ্ডের প্রধানমন্ত্রী আপনি ছিলেন, সেখানকার অধিকাংশ লোকই পাকিস্তান তৈরির জন্য কোনো লড়াই-সংগ্রাম করেনি। বরং পেশোয়ারে সীমান্ত গান্ধী নামে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খানের নেতৃত্বে কংগ্রেসের পতাকা তলে ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। পাকিস্তানের বিশিষ্ট সাংবাদিক হামিদ মির বিভিন্ন লেখায় লিখেছেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও বলেছেন, পাকিস্তান আসলে হয়েছিল বাঙালি মুসলমানদের লড়াইয়ের জন্য, বর্তমান পাকিস্তানিদের জন্য নয়। অথচ পাকিস্তান হওয়ার পর প্রথম অন্যায়-বেইমানির শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা, তাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। আর শেষ হয়েছিল, ২৫ মার্চের কালরাত থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে।
খানসাহেবের কথায় আবার ফেরা যাক। ১৯৭০-এর নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল জিতেছিল ৮১টি আসনে। অন্যদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের দল পেয়েছিল ১৬০টি আসন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে ক্ষমতায় বসতে দেওয়া হয়নি। তাঁর কথায়, শেখ মুজিব শুধু ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানকে যে কলোনি করে রাখা হয়েছিল, তার প্রতিকার চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকারের বদলে শুরু হয় সামরিক অভিযান। আর তাতে প্রতিকার বদলে গেল প্রতিরোধে, স্বাধীনতার সংগ্রামে। এই অনুধাবন আসতে ইমরানের ৫২ বছর লেগে গেল?
লাগারই কথা। কারণ বঙ্গবন্ধুকে তো পাকিস্তানের মসনদে বসার সুযোগই দেওয়া হয়নি। সে সুযোগ বরং ইমরান পেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর কারসাজিতে সাজানো নির্বাচন হলেও ইমরান ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। প্রধানমন্ত্রী পদে বসার সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে ঘাড় ধরে বিদায় করে দেওয়ার পরই যেন তাঁর জ্ঞানোদয় হয়। পাকিস্তানের প্রথম বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বুঝতে পারেন যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় বসতে দেননি তাঁরই পূর্বসুরী রাজনীতিকেরা। জুলফিকার আলি ভুট্টোর পরামর্শে জেনারেল আইয়ুব খান বঙ্গবন্ধুর সাথে যে কাজটি করেছিলেন, এখন পাকিস্তানের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের অঙ্গুলিহেলনে সেই কাজটি তাঁর সাথে করেছেন শাহবাজ শরিফ ও আসিফ আলি জারদারি। আর তাতেই তিনি পাকিস্তানের আবার ভাঙনের লক্ষণ টের পেলেন। খানসাহেব কী জানেন, পাকিস্তানে গত ৭৫ বছরে কোনো প্রধানমন্ত্রীই পাঁচ বছরের পুরো মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি।
তাহলে ইমরানের আগে ‘শহীদ’ হওয়া প্রধানমন্ত্রীদের কেউ এ প্রশ্ন তুললেন না কেন? কেন ইমরান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম? বরং তিনি যেখান থেকে নির্বাচিত হন বা তাঁর বাড়ি যেখানে, সেই পাঞ্জাব প্রদেশের আধিপত্যকামিতার বিরুদ্ধেই তো পাকিস্তানের অন্য সব প্রদেশ সরব। খনিজ ও বন্দর সমৃদ্ধ বেলুচিস্থান ও খাইবার পাখতুনখাওয়া বা সাবেক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ- এ দুই প্রদেশের নেতাদের মনের কথা তো এখন ইমরানের মুখে? তিনি কার থেকে আলাদা হবেন? আবার এর মধ্যে একবার প্রতাপশালী সেনাবাহিনীর প্রশংসা, আবার তাদের অনৈতিক ও অসাংবিধানিক কাজকর্ম নিয়ে সরব হয়ে আর যাই হোক তার মধ্যে বাংলাদেশ বা ১৯৭১-কে টেনে এনে কোনো কিছুরই ন্যায্যতা দিতে পারবেন না ইমরান।
ইমরান যে তাঁর আধা ঘণ্টার ভাষণে বললেন, ‘কোনো জাতি যখন তার স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, ন্যায়ের দাবি যখন মানুষের অন্তরে গেঁথে যায়, তখন আসলে তুমি যাই কর, যতই সেনা অভিযান চালাও না কেন, তাদের ভেতর থেকে এর কোনো কিছুই উপড়ে ফেলতে পারবে না।’
‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি’–এ কথা এত দিন পরে মনে হলো? সত্যিকার অর্থে যদি তাঁর এই বোধদয় হয়ে থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ইমরান কেন ৭১-এর ঘটনার জন্য বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাইলেন না বা চাওয়ার প্রস্তাব তুললেন না? আরেকটু পেছনে ফেরা যাক। বাংলাদেশে যখন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, তখন ইমরান নিন্দায় সরব হয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার কথা জানতেন, কিন্তু তাদের দোসরদের কুকীর্তি সম্পর্কে অন্ধকারে ছিলেন? এটা কি কোনো পাগলেও বিশ্বাস করবে!
ফলে ইমরান খানও তাঁর অন্য রাজনৈতিক সতীর্থদের মতো রাজনৈতিক দ্বিচারিতায় আক্রান্ত। স্বার্থে ঘা লাগলেই তাঁদের বোধদয় হয়। ক্ষমতায় থাকলে সেনাবাহিনী ‘ফেরেস্তা’, বাইরে থাকলে শয়তান। এই দ্বিচারিতা থেকে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানের রাজনীতিকেরা গত ৭৫ বছরের ইতিহাসটা একটু মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। পারলে শিক্ষা নিন। তাহলে বাংলাদেশ এই সময়কালে কত এগিয়ে গেছে, আমরা পারিনি- এই দুঃখবিলাস থেকে বেরিয়ে এসে দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে পারবেন। পাকিস্তান যে সব দিক দিয়ে খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে-এটা ইমরান খান-শাহাবাজ শরিফ-বিলাওয়াল ভুট্টো এবং তাঁদের মূল চালিকা শক্তি সেনাবাহিনী হা-হুতাশ না করে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে, ততই মঙ্গল। না হলে ‘ইস্ট পাকিস্তান’-এর উদাহরণ তো সামনে আছেই।
সেলিম খান: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন