মাত্র চার মাস দায়িত্বে থাকার পর মঙ্গলবার কংগ্রেসের মাধ্যমে অপসারিত হয়ে পেরুর অপসারিত প্রেসিডেন্টদের দীর্ঘ তালিকায় নাম লেখালেন হোসে হেরি। আন্দীয় এই দেশটিতে কংগ্রেসের হাতে টানা তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন।
অক্টোবরে পূর্বসূরি দিনা বলুয়ার্তের আকস্মিক অভিশংসনের পর হেরি ক্ষমতায় আসেন। তিনি ছিলেন বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর উত্থান যেমন দ্রুত ছিল, পতনও হলো তেমনই অস্থিরতায় ভরা।
৩৯ বছর বয়সী হেরি গত জুলাইয়ে কংগ্রেসের প্রধান হন। বলুয়ার্তে অপসারিত হওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে তিনিই ছিলেন দায়িত্ব নেওয়ার মতো পরবর্তী ব্যক্তি, কারণ বলুয়ার্তের কোনো কার্যকর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। ২০১৮ সালের পর পেরুর সপ্তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন হেরি।
তবে ক্ষমতায় আসার পরপরই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল চীনা ব্যবসায়ী ঝিহুয়া ইয়াংয়ের সঙ্গে গোপন বৈঠক। একাধিক দোকান ও একটি জ্বালানি কনসেশনের মালিক ইয়াং আগে থেকেই রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে ছিলেন।
একটি চীনা রেস্তোরাঁয় ইয়াংয়ের সঙ্গে হুডি পরে বৈঠক করতে দেখা যায় হেরিকে। এই কেলেঙ্কারির নাম দেওয়া হয় ‘চিফাগেট’ — স্থানীয়ভাবে চীনা রেস্তোরাঁকে ‘চিফা’ বলা হয়।
বৈঠকের পর ক্ষমা চান হেরি। তিনি বলেন, কোনো অনিয়ম হয়নি বৈঠকে। তবু রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারেননি তিনি। সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসছিল। রাজনৈতিক দলগুলো সমর্থন আদায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক মার্টিন ক্যাসিনেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা শুরু থেকেই দুর্বল ছিল।’ তিনি আরও বলেন, এই অপসারণ যতটা না ন্যায়বিচার, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক স্বার্থের ফল।
মজার ব্যাপার, এত সংক্ষিপ্ত মেয়াদ সত্ত্বেও হেরি এই দশকে পেরুর সবচেয়ে কম সময় ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট নন। ২০২০ সালে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল মেরিনো এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করেন। তখন দেশজুড়ে বিক্ষোভ হয় এবং দুজন প্রতিবাদকারীর মৃত্যু ঘটে।
হেরির অপসারণ আবারও পেরুর রাজনৈতিক অস্থিরতাকে সামনে এনেছে। এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে দেশটি অনিশ্চয়তার মধ্যেই আছে।
ক্যাসিনেলি বলেন, ‘দুঃখজনকভাবে, পেরুর নির্বাচনী ব্যবস্থাই এমন যে, এখানে ফলাফলে ভোট বিভক্ত হবে। এতে নতুন প্রেসিডেন্টের জন্য স্থিতিশীলভাবে শাসন করা কঠিন হতে পারে এবং রাজনৈতিক অভিশংসনের ঝুঁকি থেকেই যাবে।’
লিমার মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম হেরির। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় ফেদেরিকো ভিয়াররিয়াল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হন। পরে লিমার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ডিগ্রি অর্জন করেন।
আইন পড়াকালেই ২০১৩ সালে রক্ষণশীল দল সোমোস পেরুতে যোগ দেন হেরি। লিমায় পৌর নির্বাচনে দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি।
২০২১ সালে তাঁর দল সংসদে তিনটি আসন পায়। শুরুতে কংগ্রেস সদস্য হতে পারেননি হেরি। তবে দলের চতুর্থ সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী হিসেবে তিনি শেষ পর্যন্ত আসন পান। মার্টিন ভিসকারা অযোগ্য ঘোষণার পর সেই আসন শূন্য হয়েছিল। ভিসকারা ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পেরুর প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক নারী হেরির বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলেন। আগের মাসে একটি পার্টিতে ওই ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়। তবে প্রমাণের অভাবে আগস্টে মামলাটি খারিজ করে অ্যাটর্নি জেনারেল। হেরি অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আরও একটি বিতর্কে জড়ান হেরি। অভিযোগ ওঠে, রাষ্ট্রপতি ভবনে গভীর রাতে বৈঠকের পর কয়েকজন নারীকে রাষ্ট্রীয় চুক্তি দেওয়া হয়েছে।



