আফগানিস্তানে নারী নির্যাতনের নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে তালেবান। গোষ্ঠীটির সর্বোচ্চ নেতা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সম্প্রতি ১১৯টি ধারা সংবলিত একটি নতুন অপরাধমূলক দণ্ডবিধি (দি মহাকুমু জাজাই ওসুলনামা) অনুমোদন করেছেন। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
তালেবান সরকার নতুন এই দণ্ডবিধিতে নারীদেরকে রীতিমতো দাসের পর্যায়ে নামিয়ে আনার মধ্যযুগীয় সব পথ উন্মোচন করেছে। ৯০ পৃষ্ঠার এই নথিতে এমন সব বিধান যুক্ত করা হয়েছে যা কেবল আধুনিক মানবাধিকার নয়, বরং মানবিক মর্যাদাকেও চরমভাবে লঙ্ঘন করে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
নতুন এই আইনে সমাজে একটি প্রকাশ্য ‘জাতভেদ’ বা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করা। আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমান ভাবার বদলে এখানে মানুষকে চারটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে: ধর্মীয় নেতা (মোল্লা), উচ্চবিত্ত বা অভিজাত শ্রেণি, মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত।
নতুন এই দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো ধর্মীয় নেতা (মোল্লা) অপরাধ করলে তাকে কেবল ‘পরামর্শ’ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। উচ্চবিত্তদের ক্ষেত্রে বড়জোর আদালতে তলব করা হতে পারে। কিন্তু একই অপরাধ যদি সাধারণ বা নিম্নবিত্ত কেউ করেন, তবে তাকে জেল এবং বেত্রাঘাত—উভয় শাস্তিই ভোগ করতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে বিচার বিভাগীয় বৈষম্যকে আইনি আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় নেতারা কার্যত আইনের ঊর্ধ্বে।
নারীদের ওপর ‘দাসত্বের’ করাঘাত
দণ্ডবিধিতে স্পষ্টভাবে ‘মুক্ত মানুষ’ এবং ‘দাস’—এই দুই শ্রেণির উল্লেখ করা হয়েছে, যা আধুনিক বিশ্বে বিলুপ্ত দাসপ্রথাকে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে নারীদের অবস্থানকে এখানে দাসের সমতুল্য করা হয়েছে।
দণ্ডবিধিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গুরুতর অপরাধের জন্য শারীরিক শাস্তি কোনো সংশোধনমূলক সংস্থা বা কারা কর্তৃপক্ষ দেবে না, বরং তা কার্যকর করবেন ইসলামিক ধর্মগুরুরা। এটি অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধগুলোকে ‘তাজির’ (বিবেচনামূলক শাস্তি) এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, যেখানে তথাকথিত ‘অপরাধী’ একজন স্ত্রী, সেখানে তার স্বামী তাকে মারধর করতে পারবেন।
এই দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে মারধর করলে সেটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। নির্যাতিত নারীদের প্রমাণ করতে হবে যে তারা গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এজন্য বিচারককে তাদের শরীরের জখম দেখাতে হবে, অথচ একই সময়ে তাদের শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখার (পর্দা করার) কঠোর বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। আদালতে আসার সময় নারীদেরকে অবশ্যই তাদের স্বামী বা কোনো পুরুষ অভিভাবককে সঙ্গে (মাহরাম) আনতে হবে। অথচ নির্যাতনের ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বামীরাই মূল অপরাধী হয়ে থাকেন।
এরপর যদি অপরাধ প্রমাণিতও হয়, তবে স্বামীর সর্বোচ্চ সাজা হবে মাত্র ১৫ দিন। অথচ এর আগে পারিবারিক সহিংসতার জন্য অপরাধীর ১ বছর পর্যন্ত জেল হওয়ার বিধান ছিল।
নতুন দণ্ডবিধির ধারা ৩৪ অনুযায়ী, কোনো নারী যদি স্বামীর অনুমতি ছাড়া বারবার বাবার বাড়ি বা আত্মীয়ের বাড়িতে যান, তবে তাকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হবে। এমনকি যারা তাকে আশ্রয় দেবেন, তারাও অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন।
তালেবান প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, নতুন এই দণ্ডবিধি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা সমালোচনা করাও একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের অবমাননা বা ‘বিদ্রূপ’ করলে দুই বছরের জেল হতে পারে। এছাড়া সশস্ত্র বিরোধিতা, জাদুটোনা বা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যার চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন খোদ সর্বোচ্চ নেতা আখুন্দজাদা।
তালেবানের ভয়ে অনেক মানুষ এই দণ্ডবিধির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি পরিচয় গোপন রাখার শর্তেও তারা মুখ খুলতে সাহস করছেন না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, অনলাইনে এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত অধিকারকর্মীদের মাধ্যমে যখন অসন্তোষের খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন তালিবান একটি আলাদা আদেশ জারি করেছে। ওই আদেশে বলা হয়েছে যে, এই নতুন দণ্ডবিধি নিয়ে আলোচনা করাও এখন থেকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আফগানিস্তানের এক আইন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, 'বর্তমানে নারীদের জন্য বিচার পাওয়া অসম্ভব। জেলখানায় রক্ষীর হাতে নির্যাতিতা এক নারী অভিযোগ করতে গেলে তাকে বলা হয় তার ‘মাহরাম’ নিয়ে আসতে, অথচ তার মাহরাম (স্বামী) নিজেই তখন ওই জেলে বন্দী।'
ন্যাটো-সমর্থিত পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পারিবারিক সহিংসতা রোধে যে আইনি সুরক্ষা ছিল, এই নতুন দণ্ডবিধি (কোড) তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মহল এই পদক্ষেপকে ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট (ইউকে)



