জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ চাইলে তাঁর বাসায় মনোনয়ন ফরম পৌছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বনানীতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাঝে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছাড়াও রওশন জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের স্ত্রী। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত সোমবার থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু করে জাতীয় পার্টি। শুক্রবার ফরম বিতরণ শেষ হওয়ার কথা। তবে এখনো মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেননি রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদ। এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা–সমালোচনা। এর আগেও দলীয় নানা সিদ্ধান্তে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন রওশন।
বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘জাতীয় পার্টিতে কোনো পন্থী নেই। আমরা সবাই এরশাদপন্থী। জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠায় বেগম রওশন এরশাদের অনেক অবদান ও ত্যাগ আছে। তিনি নির্বাচন করলে, আমরা তাঁকে সব ধরনের সাহায্য সহযোগিতা করব। বেগম রওশন এরশাদ ও সাদ এরশাদ এখনো মনোনয়ন ফরম নেননি।’
চুন্নু বলেন, ‘বেগম রওশন এরশাদ গতকালও আমাকে ফোন করেছিলেন, আজ হয়তো তারা মনোনয়ন ফরম নিতে পারেন। হরতাল ও অবরোধের কারণে আমাদের অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী ঢাকায় আসতে পারেনি, তাদের জন্য ফরম বিতরণের সময় একদিন বাড়ানো হয়েছে। বেগম রওশন এরশাদের জন্য কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা নেই, তিনি যখন বলবেন, তখনই মনোনয়ন ফরম দেওয়া হবে। বেগম রওশন এরশাদ চাইলে, মনোনয়ন ফরম তাঁর বাসায় পৌছে দেব। তিনি আমাদের শ্রদ্ধার পাত্র।’
জাতীয় পার্টিতে গৃহবিবাদ নতুন কিছু নয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ দলটির চেয়ারম্যান থাকার সময়েও একাধিকবার তাঁর সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন তাঁরই স্ত্রী ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা কো-চেয়ারম্যান রওশন।
২০১৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে আসেন তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদের। শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছিলেন রওশন। দুজনই নিজেদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে অবশ্য সমঝোতার মাধ্যমে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ও রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা করা হয়।
এর পর ২০২২ সালে আবারও দলের এই গৃহবিবাদ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ ছিল আওয়ামী লীগের সাথে জোটে থাকা-না থাকাকে কেন্দ্র করে। জি এম কাদেরপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোট থেকে বের হয়ে বিএনপির সাথে বা আলাদা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। অন্যদিকে, রওশনপন্থীদের চাওয়া ছিল মহাজোটেই থেকে যাওয়া।
একপর্যায়ে ওই বছরের আগস্টে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই রওশন এরশাদ কেন্দ্রীয় সম্মেলন ডাকেন। সে সময় রওশনের ঘনিষ্ঠ বেশ কয়েকজন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন চেয়ারম্যান জি এম কাদের।
ফলে জি এম কাদেরের চেয়ারম্যান পদে থাকাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলাও করা হয়। এতে করে শুরুতে জি এম কাদেরের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আদালত। পরে অবশ্য উচ্চ আদালতের রায়ে চেয়ারম্যান পদ ফিরে পান জি এম কাদের।
মূল চ্যালেঞ্জ কেন্দ্রে ভোটার আনা
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্রে ভোটারদের নিয়ে আসাকেই প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন জাতীয় পার্টি মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে নিয়ে আসা। আমরা চেয়েছি, ভোটাররা যেনো নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, ভোটাররা নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।’
আগামী ২৭ নভেম্বর দলটির মনোয়ন চূড়ান্ত করা হতে পারে বলে জানান চুন্নু। তিনি বলেন, ‘প্রায় সকল আসনেই আমাদের একাধিক মনোনয়ন ফরম বিতরণ হয়েছে। প্রত্যাশিত প্রার্থীদের ইন্টারভিউ চলছে, আশা করছি ২৭ নভেম্বর আমাদের চুড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। কতদিন ধরে পার্টি করছেন এবং এলাকায় কতটা জনপ্রিয়তা আছে তা বিবেচনা করেই প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে।’
জাতীয় পার্টি মহাসচিব বলেন, ‘মনোনয়ন বোর্ডের মতামত বোর্ড সভাপতি ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরকে জানানো হবে, তিনি মনোনয়ন চূড়ান্ত করবেন। পার্টি চেয়ারম্যান ইচ্ছে করলে মনোনয়ন পরিবর্তন করতেও পারবেন। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে কেউ যদি কাজ করে অথবা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ যদি প্রার্থী হয় তাকে আর পার্টিতে রাখা হবে না।’


জাতীয় নির্বাচন: কার সঙ্গে কে জোট করছে
আওয়ামী বিরোধী ভোটে জাতীয় পার্টির নজর
জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার শুরু শুক্রবার 
