ব্যাংক ডাকাতি, থানায় হামলাসহ নানা কারণে শান্তি আলোচনার পথ হারিয়েছে বান্দরবানের সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। তবে সংঘাত নিরসন ও স্থায়ী শান্তির জন্য আলোচনাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কেএনএফের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযানের মধ্যেই গত বছরের ৩০ মে গঠন করা হয় শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি। জুলাই ও আগস্টে ভার্চুয়ালি শুরু হয় শান্তি আলোচনা। পরে নভেম্বরে ও চলতি বছরের মার্চে সরাসরি বৈঠক হয় দুপক্ষের। পরবর্তী বৈঠক হওয়ার কথা ছিল ১৬ এপ্রিল।
শুরু থেকে কেএনএফের পক্ষ থেকে ছয়টি শর্ত দেওয়া হয়। পরে শান্তি কমিটি ও কেএনএফের আলোচনায় দুই ধাপে ১১টি সমঝোতা সই হয়। কিন্তু সম্প্রতি বান্দরবানে ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্ত্র লুট ও হামলার ঘটনায় আলোচনা থেকে পিছিয়ে আসার ঘোষণা দেয় কমিটি। পরে অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বান্দরবানে গিয়ে আবারও আলোচনা শুরুর ইঙ্গিত দেন।
এদিকে আগের সমঝোতা চুক্তি বাস্তবায়ন হয়নি বলে সামাজিক মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে কেএনএফ। তবে তা সঠিক নয় বলে দাবি করছে মধ্যস্থতাকারী ও শান্তি কমিটি।
এ বিষয়ে বম সোশ্যাল কাউন্সিল সভাপতি লালজার বম বলেন, ‘কেএনএফ এখনও তাদের ছয় দফা দাবি পূরণের বিষয়ে অটল আছে। তবে আমরা এখনও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আশাবাদী।’
বান্দরবান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শে হ্লা বলেন, বম সোশ্যাল কাউন্সিল ও সংলাপ কমিটির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে কোন সদস্য কোথায় আছেন তা জেনে আলোচনার অগ্রগতি করা যেতে পারে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, স্থায়ী শান্তির জন্য আবারও সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে আলোচনার পথ বেছে নিতে হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রি জে (অব.) শহীদুল্লাহ চৌধুরী জানান, আলোচনার মাধ্যমে কুকি চিনের অপতৎপরতার বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটি জানিয়েছে, সমঝোতা অনুযায়ী ৯৬৮ বম পরিবারকে ১৩৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তাদের চিকিৎসা, নগদ টাকা ও শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া মেনে কারামুক্ত করা হয়েছে দুই কেএনএফ সদস্যকে।
এদিকে গতকাল সোমবার বান্দরবানের রুমায় যৌথবাহিনীর দিনভর অভিযানে কেএনএফের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করা হয়।
বান্দরবান জেলা পুলিশ জানায়, বেথেল পাড়ায় (বম পাড়া) যৌথ অভিযানে সাতটি দেশীয় বন্দুক, ২০ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ৩১ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিকেলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছিল, অভিযানে কেএনএফের দুই সক্রিয় সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তবে আটকদের নাম জানা যায়নি।
এ ছাড়া গতকাল সকালে থানচির সোনালী ও কৃষি ব্যাংকে ডাকাতির ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ি জব্দের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। বান্দরবানের পুলিশ সুপার সৈকত শাহীন সে সময় জানান, ওই গাড়ির চালক ও কেএনএফের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরা হলেন, গাড়িচালক মোহাম্মদ কফিল উদ্দিন সাগর, কেএনএফ সদস্য ভানুনুন নুয়ান বম, জেমিনিউ বম এবং আমে লানচেও বম।
এর আগে, গত সোমবার কেএনএফের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক চেওশিম বমকে বান্দরবানের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করার তথ্য জানায় র্যাব–১৫।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে তারাবি নামাজের সময় বান্দরবানের রুমা শাখা সোনালী ব্যাংক ও আশেপাশের এলাকা ঘিরে ফেলে শতাধিক সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মসজিদ থেকে ব্যাংক ম্যানেজার নেজাম উদ্দিনকে ধরে নিয়ে ব্যাংকের ভেতরে মারধর করে তারা। পরে তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
এ সময় ব্যাংকের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১০ পুলিশ ও ৪ আনসার সদস্যকে নিরস্ত্র করে আটটি চাইনিজ অটোমেটিক রাইফেল, দুটি এসএমজি, চারটি শটগান ও ৪১৫ রাউন্ড গুলি ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। এ ঘটনার ১৬ ঘণ্টা পর থানচিতে আরও দুটি ব্যাংকে ডাকাতি হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে অপহৃত সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা নেজাম উদ্দিনকে রুমা বাজার থেকে উদ্ধার করে র্যাব। এর পরপরই থানচি থানা থেকে গোলাগুলির শব্দ শোনেন স্থানীয়রা। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী এই গোলাগুলি চলে।
স্থানীয়রা বলছেন, থানচি থানার পাশে প্রথম গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। পরে তা থানচি বাজারের কাছে চলে আসে। এ সময় কেএনএফ সদস্যদের সঙ্গে পুলিশের গুলি বিনিময় হয়। পুলিশ জানিয়েছে, থানায় হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে তারা প্রায় ৫০০ রাউন্ড গুলি ছুঁড়েছে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যরাতে আলীকদমের ২৬ মাইল ডিম পাহাড় এলাকায় যৌথবাহিনীর চেক পোস্টে হামলা হয়। সবগুলো ঘটনার সঙ্গেই কেএনএফ জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরপর থেকেই পার্বত্য অঞ্চলে অভিযান শুরু করে যৌথবাহিনী।



