গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরের সীমান্তবর্তী রাজৈর উপজেলা। এখানেও স্ত্রী জিশান মীর্জার নামে প্রায় ৯০ একর জমি কেনেন পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ। অবসরে যাওয়ার এক মাস আগ পর্যন্ত মাত্র দুই বছরে রাজৈরে এসব জমি কেনেন। ১১৩টি দলিলে কেনা এসব জমির বেশির ভাগই ফসলি। যার শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই হিন্দু সম্প্রদায়ের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের ভয় দেখিয়ে এসব জমি কিনেছেন সাবেক এই পুলিশপ্রধান। এর আগে গোপালগঞ্জেও সংখ্যালঘুদের জমি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এদিকে এত জমি কেনার টাকা জোগান দিতে দুর্নীতি হয়েছে কিনা তা জানতে সাবেক আইজিপিকে সপরিবারে হাজির হতে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই সুযোগে নিজেদের ওপর জবরদস্তি করে জমি লিখে নেওয়ার বিষয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন রাজৈরের ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্ত্রীর নামে জোর করে ফসলি জমি লিখে নিয়েছেন বেনজীর আহমেদ। আর এতে সহায়তা করেছেন তৈয়ব আলী নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। জমি লিখে না দিলে নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে অনেককে। দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে সম্পত্তি ক্রোকের খবরে স্বস্তি ফিরলেও সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য করা জমির মালিকদের আতঙ্ক শেষ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জমির মালিকদের অভিযোগ, রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের সাতপাড় ডুমুরিয়া মৌজা, নটাখোলা ও বড়খোলা এলাকার ফসলি জমি জোরপূর্বক কিনে নেন বেনজীর।
অভিযোগ আছে, তৈয়ব আলী নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমেই সব জমি কেনা-বেচা হয়েছে। জমি লিখে না দিলে নির্যাতনের শিকারও হতে হয়েছে অনেককেই।
রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের আড়ুয়াকান্দি গ্রামের ভাষারাম সেন বলেন, ‘২৪ একর ৮৩ শতাংশ ফসলি জমি আমাদের বংশীয় লোকদের। এই জমি সবটুকুই কিনে নেন সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদ। বিঘা প্রতি সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। অথচ ওই জমির মূল্য আরও অনেক বেশি। প্রায় দুই বছর আগে ভয়ভীতি দেখিয়ে এই জমি নেন বেনজীর ও তাঁর পরিবার। প্রথমে চারদিক থেকে জমি কিনে নেন তিনি, মাঝখানে আমাদের জমি থাকায় সেটা লিখে দিতে বাধ্য করেন।’
তবে এই বিষয়ে তৈয়ব আলীর কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সাতপাড় ডুমুরিয়া গ্রামের সরস্বতী রায় নামে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধা বলেন, ‘আমরা জমি দিতে চাইনি। ভয় দেখিয়ে জমি লিখে নেন বেনজীর। এই জমিতে ফসল হত, লিখে নেওয়ায় আমাদের চাষাবাদ করার আর কোনো সুযোগ নেই। এই ফসলি জমিটুকু অনেক কষ্টে ধরে রেখেছিলাম, কিন্তু সেটার আর শেষ রক্ষা হলো না। আমরা হিন্দু বলেই জোর করে সহজে জমি নিতে পারছে। কিন্তু অন্য ধর্মের কারো হলে এত সহজে নিতে পারত না। কী আর করার। সবই কপালের দোষ এখন।’
বড়খোলা গ্রামের বাসিন্দা রসময় বিশ্বাস বলেন, ‘সাবেক পুলিশপ্রধান আমাদের কাছ থেকে ৩২ শতাংশ জমি নিয়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কবলা দেওয়া হয়েছে।’
কদমবাড়ির সুকবেদ বালার ছেলে অমল বালা বলেন, ‘আমাদের হুমকি-ধামকি দিয়েছেন বেনজীর। লোক দিয়ে বলিয়েছেন, জমি লিখে না দিলে বিমানে করে বাড়িতে নামতে হবে। চারপাশ আটকে দেবেন। এমন অত্যাচারে অনেকেই জমি লিখে দিয়েছেন।’
বড়খোলা গ্রামের বাসিন্দা দুলাল বালা বলেন, ‘আমার জমির চারপাশের জমি বেনজীর স্যারে প্রথমে কিনে ফেলেন। পরে আমাকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে আমার তিন বিঘা জমি কিনে নেয়। আমি জমি বিক্রি করতে চাইনি। আমার জমি বিক্রি করা প্রয়োজন ছিল না। তবুও তার প্রয়োজনে আমাকে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। আমি এখন আমার জমি ফেরত চাই। সরকার যদি আমাকে জমি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে তাহলে আমি জমি পেতে চাই।’
মাদারীপুর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান বলেন, ‘জোরপূর্বক কারো সম্পত্তি লিখে নেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। ভুক্তভোগীরা চাইলে মামলা করতে পারেন। আর সাবেক পুলিশপ্রধানের পরিবারের নামে এত সম্পত্তি কেনা নজিরবিহীন। এ ঘটনায় দলিল গ্রহীতাদেরও আইনের আওতায় আনা হোক। এ ছাড়া প্রান্তিক কৃষকদের জমি তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’
মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘সাবেক আইজিপির বাড়ি গোপালগঞ্জে। কিন্তু তাঁর বাড়ির সীমান্ত এলাকা মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়িতে বিপুল সম্পত্তি কেনা আমাদের অবাক করেছে। জমির মূল্য দিলেও কাউকে ভয় দেখিয়ে ফসলি জমি লিখে নেওয়া চরম অন্যায় কাজ। এর বিচার হওয়া উচিত। এবং জমির মালিকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। উনি যে এলাকায় জমি ক্রয় করেছেন, সেই এলাকা একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। অধিকাংশ হিন্দুদের জমি তিনি জোর করে কিনেছেন এবং হিন্দু পরিবারগুলো ভয়ে জমিগুলোও তাঁকে দিতে সহজেই বাধ্য হয়েছেন। এটাও একটা অপরাধ।’
জমি ফেরত পাওয়ার বিষয়ে মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. মারুফুর রশিদ খান বলেন, ‘কেউ যদি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনে আদালতে অভিযোগ করেন, সে ক্ষেত্রে আমরা তাদের সহযোগিতা করব।’
উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকাসহ অন্তত ১০ জেলায় এখন পর্যন্ত বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্য নয়টি জেলা হলো গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর, সাতক্ষীরা, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, বান্দরবান ও কক্সবাজার। এসব জেলায় রয়েছে জমি, খামার, রিসোর্ট। সেন্ট মার্টিন দ্বীপেও আছে জমি। সোমবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন জেলায় থাকা জমির পরিমাণ ২ হাজার ৩৮৫ বিঘা বা ৭৮৬ একর। তাঁর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এ ছাড়া দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পাঁচটি দেশেও তাঁর সম্পদ গড়ার অভিযোগ আছে।


কেবল সমতলেই নয়, পাহাড়েও অঢেল সম্পদের মালিক বেনজীর
সাবেক আইজিপি বেনজীরের সাভানা ইকো রিসোর্ট বন্ধ ঘোষণা
সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীরের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ
বেনজীরের সম্পত্তি অনুসন্ধানের রিপোর্ট ২ মাসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ
