জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ অবশেষে মুক্তি পেয়ে বাড়ি ফিরেছেন। দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছা অন্তরীণ ও জোরপূর্বক বন্দীদশা থেকে মুক্তি মিলল তাঁর। অ্যাসাঞ্জকে ধরতে মরিয়া আমেরিকা এক রকম বাধ্য হয়েই তাঁকে মুক্তির পথে হাঁটল। কিন্তু ঠিক কী বাধ্য করল আমেরিকাকে?
উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ছিলেন আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভুক্ত। এমন নয় যে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানত না ওয়াশিংটন। কিন্তু কোনোভাবেই তাঁকে হাতে পাচ্ছিল না। ফলে রাষ্ট্রীয় অতি গোপনীয় নথি ফাঁসের দায়ে তাঁকে মার্কিন ফেডারেল আদালতের মুখোমুখি করতে পারছিল না।
জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ তাঁর ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত উইকিলিকসের মাধ্যমে আমেরিকার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। মানবাধিকারের বুলি কপচানো আমেরিকাকে গোটা বিশ্বের সামনে প্রায় ন্যাংটো করে ছেড়েছিলেন তিনি। ফলে আমেরিকার গোস্বা হওয়াই স্বাভাবিক। হয়েছিলও তাই। এ কারণে তারা চেয়েছিল অ্যাসাঞ্জকে ফেডারেল আদালতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে। কী সেই শাস্তি? মৃত্যুদণ্ড।
এই মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বহু জলঘোলা হয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তান অভিযানে মার্কিন সেনাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে প্রমাণ অ্যসাঞ্জ সবার সামনে হাজির করেছিলেন, তাতে ওয়াশিংটনের ক্ষুব্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। এর সাথে বিশ্বের অন্য বহু দেশের সরকারের ক্ষোভও ছিল আমেরিকার পক্ষে। কারণ, শুধু আমেরিকার গোপন নথি নয়, বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে হওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘন, নাগরিক অধিকার হরণসহ ‘অতি গোপনীয়’ তকমার আড়ালে সরকারগুলোর নানা দুরাচার তিনি সবার সামনে নিয়ে এসেছিলেন।
অ্যাসাঞ্জ কি একা কাজ করেছিলেন? না। তাঁকে সহযোগিতা করেছিল বিভিন্ন দেশের নানা সরকারি সংস্থায় কাজ করা লোকেরা, যাদের পরিচয় ‘হুইসেলব্লোয়ার’। কখনো নামে, কখনো বেনামে তাঁরা অ্যাসাঞ্জকে সেসব তথ্য জুগিয়েছেন, যা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চায় রাষ্ট্রগুলো। আর ছিল বিশ্বের নানা দেশে থাকা সাংবাদিকেরা। বহু দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হয়েছিল এর মাধ্যমে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে উইকিলিকসের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন অ্যাসাঞ্জ। কারণ হিসেবে অর্থাভাব ও নিজের বন্দিত্বের কথা বলেন তিনি।
অ্যাসাঞ্জের মুক্তি এমনি এমনি আসেনি। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে তাঁর মুক্তির খবরের সাথে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁর দোষ স্বীকারের প্রসঙ্গটি। এটি গুরুত্বপূর্ণ এক ভাষ্য। এ নিয়ে পরে আলোচনা করা যাবে। আগে দেখে নেওয়া যাক, প্রবল প্রতাপশালী আমেরিকা কী করে অ্যাসাঞ্জের মুক্তিতে সম্মত হলো, যখন তারা জানে যে, এর মাধ্যমে তাদের প্রতাপের মুকুটে একটি দাগ পড়বে। কী বাধ্য করল আমেরিকাকে? উত্তর—রাজনীতি ও কূটনীতি।
অ্যাসাঞ্জের মুক্তির জন্য অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিশ্বের বড় বড় মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত কথা বলে গেছে। কিন্তু কাজ হয়নি সেভাবে। তাহলে কীসে কাজ হলো? কাজ হলো অস্ট্রেলিয়া–আমেরিকা কূটনীতি এবং অতি অবশ্যই অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতে।
বহু বছর ধরে আটকে থাকা ইস্যুটি শেষ পর্যন্ত সমাধান হবে—এমন আশা থাকলেও তা যে হবেই তা কেউ হলফ করে বলতে পারছিল না। ২০২২ সালের মে মাসে অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচন এ ক্ষেত্রে একটি বড় বদল নিয়ে আসে। সেই নির্বাচনে দায়িত্ব নেন অ্যান্থনি আলবানিজ। নতুন এই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও সমর্থন ছিল।
এই আলবানিজ ক্ষমতা নিয়েই ঘোষণা করেছিলেন, অ্যাসাঞ্জের মুক্তি বিষয়টি তাঁর অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত। পাশাপাশি তিনি বলেন, অ্যাসাঞ্জের সব কাজকে তিনি সমর্থন না করলেও তিনি মনে করেন, যথেষ্ট হয়েছে। এবার তাঁর মুক্তির সময় হয়েছে।
এই বক্তব্যেই শেষ নয়। অ্যাসাঞ্জের মুক্তির বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে তিনি কার্যক্রমও শুরু করেন। তবে এই কার্যক্রম প্রকাশ্য নয়, গোপন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভাষ্যটি পরিষ্কার—পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতির সবকিছু প্রকাশ্য হলেই ভালো হবে—এমন নয়।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে সেপ্টেম্বরেই অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্ট সদস্যদের একটি দল ওয়াশিংটন যায়। সেখানে তারা বিষয়টি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সাথে সরাসরি আলোচনা করে। পরের মাস অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনাস্থল হোয়াইট হাউস। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার পার্লামেন্টে এই ইস্যুতে একটি ভোট হয়। প্রস্তাবটি ছিল—অ্যাসাঞ্জের মুক্তির জন্য যুক্তরাজ্য ও আমেরিকাকে বাস্তবিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানোর। প্রস্তাবটি বিপুল ভোটে পাস হয়।
পাশাপাশি চলে লবিং। এ ক্ষেত্রে তাঁরা সংযোগ তৈরি করেন অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন কেনেডির সঙ্গে, যিনি মার্কিন কূটনীতিকদের মধ্যে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বলতে হবে স্টিফেন স্মিথের কথা। লন্ডনে ২০২৩ সালের শুরুতেই অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন স্টিফেন। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে অ্যাসাঞ্জ ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কাজ করেন। এই পুরো তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন কেভিন রুড। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ওয়াশিংটনে দেশটির রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন।
ফলে বোঝাই ডাচ্ছে যে, অ্যাসাঞ্জের মুক্তির ইস্যুকে অস্ট্রেলিয়া কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন স্বার্থকে নিজের স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করা অস্ট্রেলিয়া কেন এই ইস্যুতে এতটা তৎপর হলো? এই প্রশ্নের উত্তরেই সামনে এসে যায় রাজনীতির বিষয়টি।
হ্যাঁ, অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কথাই বলা হচ্ছে। দেশটির সর্বশেষ নির্বাচনের সময় তো বটেই এর পরও অ্যাসাঞ্জের মুক্তির বিষয়টি একটি জনআবেগ হিসেবে হাজির হয়। অ্যাসাঞ্জের প্রতি মানুষের আবেগ বাড়তে থাকে। তাঁর মুক্তির প্রতি মানুষের এই জনসমর্থন রাজনৈতিক দলগুলোকেও প্রভাবিত করে, রাজনীতির স্বার্থেই। আর এ দুই মিলেই আলবানিজসহ রাজনীতিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি একটা সময় অস্ট্রেলিয়ার জাত্যাভিমানের বিষয় হয়ে ওঠে। দেশটির রাজনীতিকেরা যুক্তরাজ্যে অ্যাসাঞ্জের বন্দী থাকাটাকে চীন ও ইরানে বন্দী অন্য অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের সাথে তুলনা করতে শুরু করেন। শুধু তাই নয়, এই বন্দীদের ফিরিয়ে আনতে না পারাটাকে অস্ট্রেলিয়ার সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে সামনে উঠে আসতে থাকে। এর সাথে অস্ট্রেলিয়া তো বটেই গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর একের পর এক বিবৃতি ও জনসমর্থন আদায়ে করা নানা কর্মসূচি যুক্ত হয়। ফলে বিষয়টি আর অস্ট্রেলীয় প্রশাসনের ইচ্ছা–অনিচ্ছার বিষয় থাকতে পারেনি। বরং এটি হয়ে ওঠে প্রশাসনের জনসমর্থন ধরে রাখা–না রাখার প্রশ্ন।
বাকি ছিল আইনি বিষয়াদি। সে ক্ষেত্রেও দ্রুত মীমাংসা আসে। গত মে মাসে ব্রিটিশ হাইকোর্ট জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে একটি লাইফলাইন দেন। এ সম্পর্কিত এক আদেশে হাইকোর্ট বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করতে পারবেন। এটিই হচ্ছে সেই সুযোগ, যা কাজে লাগিয়ে ‘দোষ স্বীকারের’ মাধ্যমে মুক্তি পেলেন অ্যাসাঞ্জ।
আইনি পথে হেঁটে অ্যাসাঞ্জ মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে স্বীকৃত বাকস্বাধীনতাকে কাজে লাগান। তাঁর আইনজীবীরা বলেন, মার্কিন গোপন নথি ফাঁস করার অধিকারের বিষয়টি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে স্বীকৃত নাগরিক অধিকার। ফলে এ কারণে অ্যাসাঞ্জকে শাস্তি দেওয়া চলবে না।
কিন্তু মুশকিল হলো অ্যাসাঞ্জ মার্কিন নাগরিক নন। আবার গোপন নথি ফাঁস করা আর বাকস্বাধীনতা—এই দুটি নিয়ে তর্ক চলতে পারে অনিঃশেষ। ফলে এক ত্রিশঙ্কু দশায় উপনীত হয় বিষয়টি। উভয় পক্ষই বিপদটি টের পায়। এ ক্ষেত্রেই সামনে আসে যে, অ্যাসাঞ্জ যদি ‘দোষ স্বীকার’ করেন আদালতে, তবে আমেরিকা অভিযোগ তুলে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে মুক্তিতে আর বাধা থাকে না। শেষ পর্যন্ত এ পথেই হেঁটেছে উভয় পক্ষ।
এই ‘উইন–উইন’ ফর্মুলা কিন্তু অনেক আগেই এসেছিল। ক্যারোলিন কেনেডিই এর প্রস্তাবক। গত বছরের আগস্টে কেনেডি এই প্রস্তাব করেন। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও দোরগোড়ায়। বাইডেন প্রশাসন অজনপ্রিয়তার পাঁকে। আবার যুক্তরাজ্যেও হুট করে নির্বাচনের দিন–ক্ষণ ঘোষণা হয়েছে। গুঞ্জন আছে পরবর্তী সরকার লেবার পার্টি গড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে অ্যাসাঞ্জকে আমেরিকার হাতে পাওয়া আরও বেশি অনিশ্চিত হয়ে যাবে। সাথে ছিল অস্ট্রেলিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণ রাখার চাপ। ফলে অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতকে বিবেচনায় নিতে হয়েছে তাকে। ফলে অ্যাসাঞ্জের এই মুক্তি রাজনীতি ও কূটনীতির এক যৌথ খেলা ছাড়া আর কিছু নয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, যে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ তথ্যের মুক্তির প্রশ্নে এতগুলো বছর দৃঢ় ছিলেন, এত ঝড়ে অটল ছিলেন, তিনি ‘দোষ স্বীকার’ করে স্বাধীন সাংবাদিকতা বা মুক্তমতকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালেন কিনা। এই প্রশ্নের মীমাংসা টানতে কেউ কেউ আপাত উইন–উইন পরিস্থিতিকে ‘লুজ–লুজ’ পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করছেন। হ্যাঁ, এক অর্থে হয়তো তাই। কিন্তু অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস বহু সাংবাদিককে পথ দেখিয়েছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বহু রাষ্ট্রীয় কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে এসেছে তিনি ও তাঁর অনুসারীদের মাধ্যমে। দীর্ঘ এ লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে তিনি হয়তো রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। কিন্তু তার আগে আমেরিকার মতো প্রবল প্রতাপশালী একটি রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে একজন ব্যক্তির মুক্তির প্রশ্নের সমঝোতায় আসতে বাধ্যও করেছেন। এটি কম কথা নয়। তারচেয়েও বড় কথা এই যে, রাষ্ট্রের ভালো ভালো বুলি ও আলঙ্কারিক সব বিবৃতির আড়ালে কত কদর্য বিষয়াদি লুকিয়ে থাকতে পারে, তাও তিনি প্রকাশ্যে এনে মানুষকে একটা ঝাঁকুনি দিতে পেরেছেন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, গার্ডিয়ান, উইকিলিকস, দ্য কনভারসেশন


১৪ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
দোষ স্বীকার করলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
