শুরু হয়েছে ডেঙ্গু জ্বর। ইতিমধ্যে আক্রান্ত রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। ডেঙ্গু জ্বরে মূলত তিনটি ফেইজ থাকে। প্রথম ফেইজ হল জ্বর, গায়ে ব্যথা, হাড় জোড়ায় ব্যথা, ইত্যাদি যা ৫ থেকে ৬ দিন পর্যন্ত থাকে। এই সময় রক্তে প্লাটিলেট কমে না। ডেঙ্গু জ্বরের দ্বিতীয় ফেইজে অর্থাৎ ৬ষ্ঠ দিন থেকে রক্তের অণুচক্রিকা কমতে থাকে এবং তা ৯ম দিন পর্যন্ত কমে, তাই এই ফেইজকেই ক্রিটিক্যাল ফেইজ বলা হয়, এই ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম দিন কোন জ্বর থাকে না কিন্তু এই সময় শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে, প্লাজমা লিকেজ হতে পারে, পানি শূন্যতা হতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে, তাই এই সময়েই সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকা প্রয়োজন।
বেশিরভাগ মানুষ এই সময়ে জ্বর না থাকায় স্বাভাবিক কাজ করতে চায়, যা বিপজ্জনক। এরপর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১০ম দিন থেকে প্লাটিলেট বাড়তে থাকে। ডেঙ্গু জ্বরের তৃতীয় ফেইজকে রিকোভারি ফেইজ বলা হয়। এই সময় শরীরে হালকা চুলকানি হতে পারে। ১০ম থেকে ১৪তম দিনের মধ্যে রক্তের প্লাটিলেট এর পরিমাণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ডেঙ্গু রোগীদের যেসব সমস্যা দেখা দেয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া। প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা হলো মানবদেহে থাকা তিন ধরনের রক্তকণিকার সবচেয়ে ছোটটি। রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে প্লাটিলেট। এই রক্তকণিকার কারণেই শরীরের কোথাও কেটে গেলে দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। বয়স্কদের প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকার স্বাভাবিক মাত্রা দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। যখন রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট কম থাকে তখন তাকে বলা হয় থ্রোম্বোসাইটোপেনিয়া। আর যখন বেশি থাকে তখন তাকে বলা হয় থ্রোম্বোসাইটোসিস।
ডেঙ্গুজ্বরে (dengue fever) আক্রান্ত মানুষের রক্তে অনুচক্রিকার (platelets) পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই বিষয়ে একাধিক মত প্রচলিত আছে। মনে করা হয়, দুটি কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের রক্তে অনুচক্রিকার পরিমাণ হ্রাস পায়।
১. ডেঙ্গু ভাইরাস প্লাটিলেট এবং অন্যান্য প্রতিরোধক কোষগুলিকে আক্রমণ করে, প্লাটিলেট ডেইন-ভি দ্বারা আর এন এর প্রতিলিপি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় রক্তে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয় তার অ্যান্টি-প্লাটিলেট বৈশিষ্ট্য থাকে। বলা যেতে পারে, এটা আমাদের শরীরের অনাক্রম্যতা তন্ত্রের একটা ত্রুটি। এই অ্যান্টি- প্লাটিলেটের প্রভাবে দ্রুত অনুচক্রিকা ধ্বংস হতে থাকে। যেহেতু রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় অনুচক্রিকার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে, তাই এই অবস্থায় দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্তপাত শুরু হয় (thrombocytopenia)।
২. ডেঙ্গু ভাইরাস অস্থি মজ্জা (bone marrow) এর প্লাটিলেট উৎপাদনে প্রভাবিত করে।
প্লাটিলেট কমে যাওয়ার লক্ষণ
১. শরীরের যে কোনো স্থান থেকে সূক্ষ্ম রক্তপাত, যা পিনপয়েন্টের আকারে দেখা দেয়।
২. ত্বকে বেগুনি রঙের চিহ্ন দেখা যায়। কারণ ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ হয়।
৩. পিরিয়ডের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া।
৪. মাড়ি বা নাক থেকে রক্তপাত হতে পারে।
৫. প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্তপাত।
৬. শরীরের কোথাও কাটলে অনেকক্ষণ ধরে রক্তপাত হওয়া।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মহাব্যবস্থাপক (মেডিকেল সার্ভিসেস), এভারকেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম


ডেঙ্গু জ্বরে ভয় পাবেন না
ডেঙ্গুর লক্ষণ কী, হলে কী করবেন
পাল্টে গিয়েছে ডেঙ্গুর রূপ -গর্ভকালে বিশেষ সতর্কতা
