মৌলিক খাদ্য উপাদানের মধ্যে পানি অন্যতম। পানি ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না, তাই পানির অপর নাম জীবন। সাধারণত মানবদেহের আকারের সাপেক্ষে ৫৫ থেকে ৭৮ শতাংশ পানি থাকে। অর্থাৎ আমাদের শরীরের ওজনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পানি। এই পানি আমাদের শরীরে খাবারের পুষ্টিগুণ ছড়িয়ে দেয়, বর্জ্য পদার্থ বহন করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, শরীরের জয়েন্টগুলোয় লুব্রিকেন্ট সরবরাহ করে। সেই সঙ্গে শরীরের ভেতরে বেশির ভাগ রাসায়নিক বিক্রিয়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাই পানি পান করা নিয়ে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। যেমন - কখন পানি পান করব? কতটুকু পানি পান করব? কখন পানি পান করা বেশি উপকারী? বিশেষ করে খাওয়ার সময় পানি পান করব কিনা? ইত্যাদি নানা রকম প্রশ্ন প্রতিনিয়ত আমাদের মনে ঘুরপাক খায়।
সুস্থ থাকতে অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দুই থেকে আড়াই লিটার পানি প্রত্যেকদিন অবশ্যই পান করতে হবে। কিন্তু কিডনি রোগী বা বিশেষ রোগের ক্ষেত্রে পানি পানের পরিমাণে এর ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। তবে এ পানি পান করার করার সঠিক নিয়ম না জানলে হতে পারে নানা রকম জটিলতা।
খাবার খাওয়ার সময় অনেকে গ্লাস ভরে ভরে পানি পান করে, যা সঠিক নয়। কারণ খাবার খাওয়ার সময় পানি পান করলে হজমক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
খাবার খাওয়া শুরু করলে তা পরিপাক করার জন্য বিভিন্ন এনজাইম, হরমোন নিঃসৃত হয়। এ সময় বেশি পানি বা পানীয় খেলে এ উপাদানগুলো পানির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে খাবার ভালোভাবে পরিপাক হতে পারে না। এ কারণে পুষ্টির শোষণ হ্রাস পায়। আবার অসম্পূর্ণ বিপাকের কারণে শরীরে বিষাক্ত পদার্থ জমতে পারে। এ ছাড়াও পাকস্থলী বেশি ভরাট হয়ে অস্বস্তি হতে পারে এবং পানি পান করে পেট ভরে গেলে খাবার খাওয়ার ইচ্ছা চলে যেতে পারে। কিন্তু খাবার খাওয়ার সময় অনেক সময় যখন ঝাল লাগে অথবা খাবার গলায় আটকে তখন অল্প পানি খাওয়া যায়।
আবার আমাদের অনেকের অভ্যাস খাবার শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই এক-দুই গ্লাস পানি পান করা। এটি করাও ঠিক নয়। খাদ্যতালিকায় অনেক ধরনের খাবার থাকে। ভাত বা রুটির সঙ্গে মাছ, মাংস, ডাল, সবজি ইত্যাদি খাওয়া হয় যার পুষ্টি উপাদান অনেক। এসব খাওয়ার পরপরই পানি পান করলে খাবারে থাকা চর্বিতে দ্রবণীয় ভিটামিনগুলো (ভিটামিন এ, কে, ডি) শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ফলে পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরেও ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া খাবার খাওয়ার পর সেগুলো সম্পূর্ণ হজম হওয়ার জন্য পাকস্থলী থেকে গ্যাস্ট্রিক রস, প্যানক্রিয়াস থেকে অ্যামাইলেজ, লাইপেজ, প্রোটিয়েজ ইত্যাদি এনজাইম নিঃসৃত হয়।
খাওয়ার পরপরই পানি পান করা হলে এসব এনজাইমের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাবার ঠিকভাবে হজম হয় না। তখন পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। খাবার শেষ করার অন্তত ৩০ মিনিট পর পানি পান করা ভালো। এতে খাবার ভালোভাবে হজম হয়।
যাদের অ্যাসিডিটির সমস্যা আছে, তারা সকালে ঘুম থেকে উঠে পানি পান করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কুসুম গরম পানি পান করাই ভালো। এছাড়া খাওয়ার ৩০ মিনিট আগে ও খাবার খাওয়ার ৩০ মিনিট পর পানি পান করলে উপকৃত হবেন। শরীরের বাড়তি ওজন কমাতে খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ আগে পানি পান করতে পারেন। এতে পেট ভরা থাকবে, ফলে খাবার গ্রহণের চাহিদাও কমবে। পাশাপাশি ওজনও তাড়াতাড়ি কমতে থাকবে। খাবার খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ৩০ মিনিট পরে পানি পান করলে খাবারও পরিপূর্ণভাবে হজম হতে পারে।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


ডিজিটাল ডিমেনশিয়া কী, কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
হঠাৎ ভেঙে গেছে দাঁত? জেনে নিন করণীয়
