২০০৭ সাল থেকে ডায়াবেটিস সম্পর্কে পৃথিবীব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিবসটি প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখে পালিত হয় আসছে। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৯১ সালে ১৪ নভেম্বরকে ডায়াবেটিস দিবস হিসেবে ঘোষণা করলেও, বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীতে এই নির্দিষ্ট তারিখটিকে ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব করে।
সেই ফলশ্রুতিতে, ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘে এ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেখান থেকে প্রতি বছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। মূলত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী এবং এই রোগের সেবায় জড়িত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির স্টেকহোল্ডারদের সচেতন ও কর্মোদ্যমী করার জন্য।
সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও জনসচেতনতার লক্ষ্যে দিবসটি এবার পালিত হচ্ছে। ‘ডায়াবেটিস নিয়ে ভালো থাকা’ এই বিষয়ের উপর জো- দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য—‘Breaking Barriers, Bridging Gaps’ বাংলায় যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, ‘প্রতিবন্ধকতা ভেঙে, সেবার সেতুবন্ধন।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- বিশ্বব্যাপি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমানো এবং ডায়াবেটিসের ন্যায়সংগত, সমন্বিত, সাশ্রয়ী মূল্যের মানসম্মত চিকিৎসার উপর গুরুত্ব আরোপ করার মাধ্যমে, ভালো থাকা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে- এই প্রতিপাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের হিসাব মতে, ২০২১ সালে পৃথিবীর প্রতি ১০.৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ১ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যার মোট পরিমাণ ৫৩৭ মিলিয়ন। ২০৪৫ সালে যে সংখ্যাটা বেড়ে হতে পারে ৭৮৩ মিলিয়ন। প্রতি ০৪ জনে ০৩ জন ডায়াবেটিস রোগীই- উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে বাস করছেন। আমাদের এই অঞ্চলে (দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া) প্রতি ০২ জনে ০১ জন রোগী জানেন না- তিনি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যার ফলে, এই বিশাল সংখ্যক রোগী- সরাসরি ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়ে প্রথমবার চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন, যেটি হয়ত অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য ছিল।
পৃথিবীতে বর্তমানে উচ্চ হারে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনে। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ১৩.১ মিলিয়ন ডায়াবেটিস রোগী নিয়ে বাংলাদেশে পৃথিবীতে ৮ম স্থানে রয়েছে, যেটি ২০৪৫ সালে বেড়ে ২২.৩ মিলিয়নে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা যাচ্ছে।
মানবদেহের অগ্ন্যাশয় থেকে উৎপন্ন- ইনসুলিন নামক একটি হরমোনের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং পাশাপাশি এই হরমোনের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ডায়াবেটিস রোগের সূত্রপাত হলেও, শরীরের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের উপরে রয়েছে- ডায়াবেটিসের সুদূরপ্রসারী ক্ষতিকর প্রভাব।
ডায়াবেটিসের রোগীরা সাধারণত মারা যান- হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও রক্তনালির অসুখে ভুগে। এছাড়া চোখের সমস্যা, কিডনি রোগ, স্নায়বিক জটিলতাসহ নানা কারণে- এই রোগে ভোগান্তি ও চিকিৎসা ব্যয়ও অত্যধিক। তাই এই রোগের চিকিৎসায় শুধু রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত (Comprehensive) ডায়াবেটিক সেবা, যে সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে- ডায়াবেটিক শিক্ষা কার্যক্রম।
এই শিক্ষার মাধ্যমে রোগীকে তার রোগ সম্পর্কে জানানো হয়, রোগ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব বোঝানো হয়, সর্বোপরি তাকে শৃঙ্খলিত জীবন যাপনের জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। কারণ, শৃঙ্খলিত জীবন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ছাড়া- এই রোগ নিয়ন্ত্রণ এককথায় অসম্ভব। তার পাশাপাশি রয়েছে, ডাক্তারের পরামর্শমতো নিয়মিত ওষুধ খাওয়া, প্রয়োজন হলে সঠিক নিয়মে ইনসুলিন নেওয়া এবং নিয়মিত ফলোআপে থাকা।
দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো, আমাদের দেশেও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ৫.৭ মিলিয়ন ব্যক্তি জানেন না যে তারা ডায়াবেটিস রোগী। যার পেছনে আমাদের অসচেতনতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাই প্রধানত দায়ী। যদিও, দেশের সরকারি হাসপাতালের এনসিডি কর্নার, এমন কী প্রান্তিক পর্যায়ের কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে ডায়াবেটিসের অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যন্ত বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে- তারপরেও রয়েছে সমন্বিত সুচিকিৎসার অভাব। পাশাপাশি দেশে ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় কাজ করে যাচ্ছে- একগুচ্ছ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তারপরও, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে দেশের দেশের প্রতি ১০ জনে ০৯ জন রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের বাইরে, যা তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার দিকে।
প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি, আমাদের দেশের ১০ থেকে ৩৪ বছর বয়সী যুবকদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশ ডায়াবেটিসের উচ্চঝুঁকিতে আছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও তার প্রকৃত কারণ নির্ণয় ও সুচিকিৎসার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশে বাড়ছে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের সংখ্যা। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ০৪ জনে ০১ জন শিশুর জন্মদানের সময় মা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, যাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মা এবং সন্তান পরবর্তীতে একসময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ার উচ্চঝুঁকিতে থাকেন।

আমাদের মত দেশে জনসংখ্যা যেখানে সবচেয়ে বড় সম্পদ, সেখানে শিল্পায়নের সাথে সাথে কায়িকশ্রমের পরিবর্তে যন্ত্রের ব্যবহার, ফাস্টফুডের প্রতি আগ্রহ, খেলাধুলা ও ব্যায়ামের জন্য পর্যাপ্ত মাঠের অভাব, স্ক্রিন আসক্তি, ঘুমের অপর্যাপ্ততা, মানসিক চাপ, স্থূলতা, ধূমপানসহ নানা জিনগত কারণে- বেড়ে চলেছে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, যা এখনই সতর্ক না হলে, আমাদের মত দেশের অর্থনীতির উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা পরিহার করে- ডায়াবেটিস নিয়ে ভালো থাকার জন্য প্রয়োজন- আরও বেশি সমন্বিত ডায়াবেটিস চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র। তাই আসুন, এই বছর এই বিশেষ দিনটি থেকে আমরা ডায়াবেটিস রোগীদের সুচিকিৎসায় আরও যত্নবান হই এবং নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস হওয়াকে প্রতিরোধ করি। সেবার হাত বাড়িয়ে সকল প্রতিবন্ধকতা ভেঙে এগিয়ে যাই- ডায়াবেটিস মুক্ত একটি সুস্থ সুন্দর আগামীর দিকে।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ


ডায়াবেটিস মানে সব শেষ নয়, প্রয়োজন জীবনযাপনে কিছুটা পরিবর্তন
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কখন বাড়ে? এর ফলে মানুষ কখন দৃষ্টিশক্তি হারায়?
