বর্তমানে ডায়াবেটিস একটি সাধারণ ও অতি সুপরিচিত রোগ। সাধারণত রক্তে গ্লুকোজের বা চিনির আধিক্য থাকলেই তাকে ডায়াবেটিস বলে। রক্তের গ্লুকোজ আপনার শক্তির প্রধান উৎস, যা প্রধানত আপনার খাওয়া খাবার থেকে আসে। ইনসুলিন হল অগ্ন্যাশয় দ্বারা তৈরি একটি হরমোন, যা গ্লুকোজকে আপনার কোষে শক্তির জন্য ব্যবহার করতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস তখনই হবে যখন আপনার শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করে না বা ইনসুলিন ভালোভাবে কাজ করে না বা ইনসুলিন একেবারেই থাকে না। অত্যধিক গ্লুকোজ তখন আপনার রক্তে থেকে যায় এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে আপনার কোষে পৌঁছায় না। শরীর যখন রক্তের সব চিনিকে (গ্লুকোজ) ভাঙতে ব্যর্থ হয়, তখনই ডায়াবেটিস হয়।
ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে রক্তে চিনির পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শরীরে যদি রক্ত ঠিক মতো প্রবাহিত হতে না পারে, যেসব জায়গায় রক্তের প্রয়োজন সেখানে যদি এই রক্ত পৌঁছাতে না পারে, তখন স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে মানুষ দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারে। ইনফেকশন হতে পারে পায়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে অন্ধত্ব, লিভার অথবা কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়া, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ইত্যাদির পেছনে একটি বড় কারণ হলো ডায়াবেটিস। এমনকি অনেক সময় হাত পা কেটে ফেলার মত ভয়ংকর ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আছে এমন লোক যদি সচেতন হন এবং নিয়মকানুন মেনে চলেন, সে ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসের বিকাশ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন।
সারা বিশ্বেই ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। বর্তমানে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৪২ কোটিরও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ৩০ বছর আগের তুলনায় এই সংখ্যা এখন চার গুণ বেশি। কিন্তু ডায়াবেটিসের এতো ঝুঁকি থাকার পরেও যারা এই রোগে আক্রান্ত তাদের অর্ধেকেরও বেশি এই রোগটি সম্পর্কে সচেতন নয়। অথচ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে কিছু নিয়মনীতি মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রে ডায়াবেটিসকে প্রতিরোধ করা বা জটিলতা কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস যদিও জেনেটিক এবং জীবনযাপনের স্টাইলের ওপর নির্ভরশীল, তারপরেও চেষ্টা করলে রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা যায়। সেজন্যে আপনাকে খাবার গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে এবং হতে হবে অত্যন্ত সক্রিয় একজন মানুষ। প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে। মৃসন সাদা আটার রুটির পরিবর্তে খেতে হবে ভুষিওয়ালা আটার রুটি। এটাই প্রথম ধাপ। এড়িয়ে চলতে হবে রিফাইন কার্বোহাইড্রেট বা এগুলো দিয়ে তৈরি খাবার যেমন হোয়াইট পাস্তা, পেস্ট্রি, জুস বা কোমল পানীয়, কার্বনেটেড ড্রিংকস, চিনি জাতীয় পানীয়, মিষ্টি ইত্যাদি। আর স্বাস্থ্যকর খাবারের মধ্যে রয়েছে শাক সবজি, ফল ও মোটা দানার খাদ্য শস্য।
স্বাস্থ্যকর তেল, বাদাম, বিভিন্ন রকম বীজ জাতীয় খাবার খাওয়াও ভালো। ওমেগা থ্রি তেল আছে যেসব মাছে সেগুলো বেশি খেতে হবে। যেমন: সারডিন, স্যামন ও ম্যাকেরেল। একবারে পেট ভরে না খেয়ে পরিমাণে অল্প অল্প করে বিরতি দিয়ে খাওয়া দরকার। নিয়মিত শরীরচর্চা বা ব্যায়াম করার মাধ্যমে রক্তে চিনির মাত্রা কমিয়ে রাখা সম্ভব। অবশ্যই প্রতি সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টার মতো ব্যায়াম করা দরকার। তার মধ্যে দ্রুত হাঁটার কোনো বিকল্প নাই। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। নজর রাখতে হবে কোলস্টেরলের মাত্রার ওপর।
অর্থাৎ এক কথায় জীবনযাপন ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করা, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা ও পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন করা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করা, সময় অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার খাওয়া, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুম নিশ্চিত করা, ওজনাধিক্য থাকলে তা নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করা ও প্রয়োজন অনুযায়ী মেডিসিন বা ঔষধ গ্রহণ করা ইত্যাদি আপনাকে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগ থেকে দূরে রাখতে পারে।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


কেমন হবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ব্যবস্থাপনা?
যেসব লক্ষণ দেখলে ডায়াবেটিস রোগের পরীক্ষা করাতে হবে
ডায়াবেটিস হলে ইনসুলিন নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ
