সদ্য ঘটনা। রাত প্রায় ৯টা বাজে তখন। মূল রাস্তা থেকে রিকশা ঢুকছিল অ্যাভিনিউ রোডে। ঠিক ঢোকার মুখেই ‘ভুড়ুম ভুড়ুম’ করে বিকট শব্দে কান ঝালাপালা করে দিয়ে বুক আঁৎকে দিল একটি দুই চাকার বাহন। সাঁই সাঁই করে চলে যাওয়ার অনেক পরও বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ আর থামে না! বরং দূরে যেতে যেতে ওই বাহন ছড়িয়ে চলে বিকট নিনাদ। আর মনে করিয়ে দিতে থাকে যে, একটু আগেই সে কাঁপিয়ে দিতে পেরেছিল পুরোপুরি। আশপাশের সবাইকেই নিশ্চয়ই!
এমন ঘটনা শুধু যে রাতের বেলায় ঘটে, তা নয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়। তাই এই কর্মের কর্তাদের যখনই ইচ্ছা হয়, তখনই চরাচর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে। আর যদি কিছুটা উৎসবের আমেজ থাকে, তবে তো কথাই নেই। অনেক সময় একাধিক কর্তা একসঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে, আর তৈরি করে বিকট এক শব্দসন্ত্রাস।
আশা করি এতক্ষণে শব্দ সৃষ্টির মাধ্যম সম্পর্কে আন্দাজ করা হয়ে গেছে। হ্যাঁ, আমরা মোটরসাইকেল ওরফে মোটরবাইকের কথাই বলছি। তবে এই শকটটি এখানে কেবলই একটি যন্ত্র। এটি যারা চালান, বা এর মাধ্যমে যেসব কর্তা মূলত বিকট শব্দ সৃষ্টি করে থাকে, তাদের বিষয়েই আলোচনা করা প্রয়োজন। কারণ, তারাই মূলত ‘শব্দ‑সন্ত্রাসী’!
সন্ত্রাস বা সন্ত্রাসী শব্দের ব্যবহারে অনেকেই আপত্তি তুলতে পারেন অবশ্য। তবে ত্রাস যারা সৃষ্টি করে, তারাই আসলে সন্ত্রাসী। আর যেহেতু এই বিকট শব্দ সৃষ্টির মাধ্যমে আশপাশের সকলের মনে এক ধরনের প্রবল ত্রাসেরই সঞ্চার করা হয়, সুতরাং শাব্দিক দিক থেকে এই কর্মের যারা কর্তা, তারা আসলে সন্ত্রাসীই।

ওপরের এই কর্মকাণ্ডটি যারা সংঘটিত করে থাকে, তারা আবার এর ফলে দুর্ভোগও পোহান। কারণ এই ‘শব্দ‑সন্ত্রাস’‑এর সঙ্গে দুটি বিষয় জড়িত থাকে। একটি বিকট শব্দ, আরেকটি প্রবল গতি। অর্থাৎ, গতি ও শব্দের এক অসহনীয় যুগলবন্দী গড়ে তোলা হয়। তাতে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও ঘনীভূত হয়। এক্ষেত্রে চলুন কিছু পরিসংখ্যানও জেনে নেওয়া যাক।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, গত জানুয়ারি মাসে দেশে ৬৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৭৭ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৭১ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৯ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৩০১ জন নিহত ও ২৩৯ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক প্রতিবেদন এই তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, গত জানুয়ারি মাসে মোট দুর্ঘটনার ৪১ দশমিক ৬০ শতাংশ গাড়ি চাপা, ৩৮ দশমিক ১৮ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ বিবিধ কারণে এবং শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
আরও পড়ুন:
এ তো গেল কিছুদিন আগের হিসাব। যদি যাত্রী কল্যাণ সমিতির গত বছরের সামগ্রিক হিসাবের দিকে তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন নিহত হয়েছে। গত বছর ২ হাজার ৩২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। এসব দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৫৭০ জন নিহত এবং ৩ হাজার ১৫১ জন আহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং মোট আহতের ২৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়ক দুর্ঘটনার কিছু কারণের বিষয়ে বলা হয়েছে। এসব কারণের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বেপরোয়া গতি। আরও আছে বিপজ্জনক অভারটেকিং, সড়কের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, পরিবহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব ইত্যাদি।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এত এত হতাহতের কারণ হিসেবে শুরুতেই এসেছে বেপরোয়া গতির বিষয়টি। আর ওপরে শব্দ ও গতির সন্ত্রাসমূলক যে যুগলবন্দীর কথা বলা হয়েছে, সেখানেই বেপরোয়া গতি উপস্থিত। বিকট শব্দ ও গতি যে ত্রাসের সৃষ্টি করে, তাতে পথচলতি যে কেউ চমকে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। তাছাড়া ঘরে থাকা বৃদ্ধ ও শিশুরাও এতে গুরুতর সমস্যায় পড়তেই পারে। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতারও কারণ হতে পারে এমন উচ্চশব্দ। আর পথে থাকলে কারও পাশ দিয়ে যদি গুলির বেগে ‘ভুড়ুম ভুড়ুম’ করতে করতে মোটরসাইকেল প্রায় উড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তবে কে আতঙ্কবোধ করবে না?
আরও পড়ুন:
অথচ এ বিষয়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথেষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টি সহজে চোখে পড়ে না। এমনকি এ সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রয়োগের উদাহরণও আমরা কমই দেখতে পাই। এর একটি কারণ হতে পারে যে, বিকট শব্দে বেপরোয়া গতিতে মোটরবাইক চালানোর এই ‘মজা’ সাধারণত প্রধান সড়কে কম দেখা যায়। বেশি দেখা যায় আবাসিক এলাকার তুলনামূলক ছোট রাস্তায়। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মনোযোগ অন্যদিকে বেশি থাকার সুযোগ নেওয়া হয়। তবে বিকট শব্দে বেপরোয়া গতিতে মোটরবাইক চালানোর এই অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে থামাতে হলে, আইনের প্রয়োগকে দৃশ্যমান করতেই হবে। নইলে এটি থামবে না কখনোই।

সাধারণত এই ধরনের কর্মকাণ্ড তথাকথিত ‘শো অফ’ অথবা মনযোগ আকর্ষণ করার উদগ্র বাসনা থেকেই হয়। নিজের আশপাশে তাকালে এও দেখা যাবে যে, এসবের অধিকাংশই করছে উঠতি বয়সের তরুণেরা। মাথার কাজ ছাড়া অন্য যেকোনো কাজেই কিছু না কিছু অর্থব্যয় হয়ই। তা মোটরসাইকেল কেনা, বা ভাড়া করা, বা এর জন্য জ্বালানি কেনা–যেটিই হোক না কেন! উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে এমন খাতের অর্থের জোগান বেশির ভাগ সময় পরিবার থেকেই আসে। কারণ ওই বয়সে যাদের নিজেদের উপার্জনে নামতে হয়, তাদের আর যাই হোক, ‘শো অফ’ করার মতো তেল থাকে না! এই তেল তৈরি হয় সহজে খরচযোগ্য অর্থের সরবরাহ থেকেই। এমন অদ্ভুত সামাজিক রোগের মূল আসলে ওখানেই।
আরও পড়ুন:
সুতরাং, এ ধরনের কিম্ভূত কাজ করে অন্যের শান্তি নষ্ট করে মজা নেওয়া মানুষেরা সমাজের ও পরিবারগুলোর একটি অংশের আশকারা পেয়েই বেপরোয়া হয়। সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করে হয়তো এর বাড়বাড়ন্ত কিছুটা রোধ করা সম্ভব। তবে একে সমূলে উৎপাটন করতে হলে আসলে সামাজিক ‘ফোঁড়া’ অপসারণের বিকল্প নেই। কিন্তু এই সমাজের মানুষেরা কি তা উপলব্ধি করতে পারছে? কী জানি!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


আমরা কি একটু মিষ্টিমুখও করতে পারব না?
বছরের শেষ দিনটায় কাউকে মারবেন না, প্লিজ
