বিশ্বের দুই দেশের দুজন প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক বৈঠকে বসে রীতিমতো ঝগড়া করলেন। আর তাদের ঝগড়া তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করল বিশ্ববাসী। গত শুক্রবার এই নজিরবিহীর ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওভাল অফিসে।
ওভাল অফিস হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। সেখানে গত শুক্রবার বৈঠকে বসেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বৈঠকের বিষয় ছিল ইউক্রেনের বিরল খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার নিয়ে একটি চুক্তি। কিন্তু বৈঠক প্রসঙ্গান্তরে চলে যায় রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে। ট্রাম্প একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বলেন জেলেনস্কিকে। কিন্তু জেলেনস্কি জানিয়ে দেন, রাশিয়া কখনোই যুদ্ধবিরতির চুক্তি মানে না। এর আগে ২০১৪ সালে তারা ক্রিমিয়া দখল করে নিয়েছে। সেই সময়েও পুতিন (রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট) কোনো চুক্তির ধার ধারেননি।
কিন্তু ট্রাম্প নাছোড় বান্দার মতো জেলেনস্কিকে রাজি করাতে চাপ দিতে থাকেন। এতে তাদের কথপোকথন উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে পরিণত হয়। এক সময় ওভাল অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয় জেলেনস্কিকে। ভেস্তে যায় বৈঠক এবং বৈঠক শেষে যে যৌথ সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, সেটিও পণ্ড হয়ে যায়।
এরপর থেকে গত দুই দিন ধরে বিশ্বজুড়ে চলছে জেলেনস্কি ও ট্রাম্পকে নিয়ে আলোচনা। এখন যুক্তরাষ্ট্র কী করবে? কী করবে ইউক্রেন?
জেলেনস্কির সঙ্গে ঝগড়াকে ট্রাম্পের বিজয় হিসেবে দেখছে ওভাল অফিস
ট্রাম্প ও জেলেনস্কির ঝগড়া দেখে সারা বিশ্ব বিস্মিত হলেও ওভাল অফিস এই ঝগড়াকে ট্রাম্পের বিজয় হিসেবেই দেখছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, উত্তেজনাপূর্ণ ওই বাগবিতণ্ডার পর অনেক রিপাবলিকান, ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তারা ট্রাম্পের প্রশংসা করে ইমেইল পাঠিয়েছেন। তাঁরা ট্রাম্পের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন।
হাউস স্পিকার মাইক জনসন লিখেছেন—‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমুন্নত রাখার জন্য প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ। জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডও ‘অটল নেতৃত্বের’ জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মিসৌরির সিনেটর এরিক স্মিট লিখেছেন—আমেরিকার আগের কূটনীতির যুগ শেষ।
এ ছাড়া ট্রাম্প–জেলেনস্কির বৈঠকে উপস্থিত থাকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ট্রাম্পের অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
তিন বছর আগে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন থেকেই ইউক্রেনে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন ট্রাম্প। তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী। ফলে গত শুক্রবারের ঘটনা বিস্ময়কর মনে হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না। ঘটনাটি শুক্রবারে না ঘটলেও অন্য যেকোনো সময়ে ঘটতই। তাই পুরো বিষয়টিকে ট্রাম্পের বিজয় হিসেবেই দেখছে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।
নির্বাহী ক্ষমতাবলে ইউক্রেনে সহায়তা বন্ধ করতে পারেন ট্রাম্প
গতকাল শনিবার নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউক্রেনে অস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তার যে চালান যাওয়ার কথা রয়েছে, সেটি প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে বাতিল করা হতে পারে।
ইউক্রেনের রাজনীতি বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকোও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আজ হোক বা কাল হোক, এমন ঘটনা ঘটতই। এখন ইউক্রেনের ভাগ্যে খারাপ ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সকল সহায়তা বন্ধ করে দিতে পারেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনে যেসব সহায়তা প্যাকেজের অনুমোদন দিয়ে গেছে, সেগুলো এখন বাতিল করা হতে পারে। শুধু তাই নয়, শুক্রবারের ঘটনার পর ইউক্রেনের ওপর থেকে পরোক্ষ সমর্থনও উঠিয়ে নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
এর অর্থ হচ্ছে, ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ইউক্রেনীয় সেনা ও পাইলটদের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কর্মসূচিও বাতিল করতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বাইডেনের বিদায়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ৫০ দিন অতিক্রম করে ফেলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউক্রেনে সহায়তার নতুন কোনো প্যাকেজ ঘোষণা করেননি তিনি। এটিকে ইউক্রেনের জন্য অশুভ ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
যা হয়েছে, হয়েছে—সমঝোতায় আগ্রহী জেলেনস্কি
শুক্রবারে ওভাল অফিসের ওই অপ্রীতিকর ঘটনার পরপরই মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজে একটি সাক্ষাৎকার দেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য তার যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন। ওয়াশিংটনের সহায়তা ছাড়া কিয়েভের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে আগ্রহী।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দেন জেলেনস্কি। সেখানেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আকুতি দেখা গেছে। জেলেনস্কি লিখেছেন—‘ধন্যবাদ যুক্তরাষ্ট্র, আপনাদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ, এ সফরের জন্যও ধন্যবাদ।’
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্ক যদি স্বাভাবিক না হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনে সকল সহায়তা বন্ধই করে দেয়, সেক্ষেত্রে ইউরোপের ওপর পুরোপুরি নির্ভর হওয়া ছাড়া জেলেনস্কির সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।
জেলেনস্কির পাশে ইউরোপ
সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে এরই মধ্যে জেলেনস্কির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ইউরোপের নেতারা। বিবৃতি দিয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড, স্পেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, চেক রিপাবলিক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়া, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, স্লোভেনিয়া, বেলজিয়াম, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ ও আয়ারল্যান্ডের নেতারা সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নেতারাও। আর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভনডার লিয়েন বলেছেন, ‘প্রিয় প্রেসিডেন্ট, আপনি একা নন। শক্ত থাকুন, নির্ভয় থাকুন, নির্ভার থাকুন।’
গতকাল শনিবার বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাজ্য বলেছে, ইউক্রেনের প্রতি দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যাক্ত করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। রাশিয়ার অবৈধ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একটি পথ খুঁজে বের করতেও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যুক্তরাষ্ট্রে বাগবিতণ্ডার পর শনিবার ব্রিটেন সফরে গেছেন জেলেনস্কি। সেখানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে তিনি বৈঠকও করেছেন। বৈঠকে স্টারমার-জেলেনস্কি ২২৬ কোটি পাউন্ডের একটি চুক্তি সই করেছেন। যুদ্ধে রুশ বাহিনীকে প্রতিহত করতে সামরিক সহায়তা হিসেবে ইউক্রেনকে ওই অর্থ ঋণ হিসেবে দেবে যুক্তরাজ্য।
স্টারমার জেলেনস্কিকে বলেন, ‘যুক্তরাজ্যের জনগণ এগিয়ে আসছে, দেখাতে চাইছে তারা আপনাকে কতটা সমর্থন করে, তারা ইউক্রেনকে কতটা সমর্থন করে। যত দিন প্রয়োজন পড়বে, আমরা তত দিন আপনার এবং ইউক্রেনের পাশে আছি।’
তথ্যসূত্র: সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমস, বিবিসি, রয়টার্স ও ফক্স নিউজ



