বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি বড় অংশই হচ্ছে মিষ্টিজাতীয় খাবার। যেকোনো খুশির সংবাদ থেকে উৎসব পার্বণে খাবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণই হলো মিষ্টি। তাছাড়া এমনিতেই আমরা সবাই কমবেশি মিষ্টি খেতে ভালোবাসি। আর এখনকার দিনে এ সকল মিষ্টির মূল উপাদানই হচ্ছে চিনি। কিন্তু চিনি খেলে অনেক ধরনের রোগের সম্ভাবনা থাকে বিধায় এটাকে হোয়াইট পয়জনস বা সাদা বিষ বলা হয়।
যেকোনো খাবার খাওয়ার পর তা রক্তে যত দ্রুত সুগার বাড়ায় তাকে যে সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়, সেটাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স। সাদা চিনির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সর্বোচ্চ। চিনি খাওয়ার পরে খুব দ্রুত তা গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। রক্ত থেকে প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে এবং বাকি গ্লুকোজ চর্বি হিসেবে শরীরের বিভিন্ন অংশে জমা হয়।
ফলে খুব দ্রুত হজম হয়ে যাওয়ায় আবারও ক্ষুধা বোধ হয় তাই আবার খাবার খাই। এভাবে বারবার খাওয়ার মাধ্যমে আমরা বেশি ক্যালরি গ্রহণ করি। ফলে আমাদের ওজন বাড়ে, রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ে এবং ফ্যাটিলিভারসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। যদিও মজার বিষয় হলো চিনি, আটা, ভাত সবই কার্বোহাইড্রেট বা শর্করাজাতীয় খাবার। তবে ১ গ্রাম চিনিতে ৩ দশমিক ২ গ্রাম সেদ্ধ ভাত এবং ১ দশমিক ১৮ গ্রাম আটায় যথাক্রমে ৪ ক্যালরি পাওয়া যায়। কিন্তু চাল ও আটার মতো কার্বোহাইড্রেটগুলো চিনির মতো দ্রুত রক্তে সুগার বাড়ায় না। এ কারণেই চিনির স্বাস্থ্যঝুঁকি এতটা বেশি।
সঠিক পুষ্টি শোষণের জন্য আমাদের হজম শক্তি ভালো থাকা জরুরি। আমাদের অন্ত্রে ভালো ও খারাপ দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়াই থাকে। খারাপ ব্যাকটেরিয়ার খাবার হলো ভাজাপোড়া, তৈলাক্ত, চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার। তাই মিষ্টি জাতীয় খাবার বেশি খেলে খারাপ ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ে এবং ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা কমে যায়। ফলে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক সহ অন্যান্য হজমজনিত রোগ দেখা দিতে পারে।
কিছু গবেষণায় বলা হয়েছে, চিনি বা মিষ্টি খাওয়ার আকর্ষণ নেশাদ্রব্য কোকেনের আকর্ষণের মতোই। তাছাড়া জিহ্বায় বেশি টেস্টবাড থাকে মিষ্টি খাবারের। তাই মিষ্টি খাবার খেলে অন্যান্য শর্করাজাতীয় খাবারের প্রতি আকর্ষণ আরও বেড়ে যায়। তখন চাইলেও আর নিজেকে খাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখা যায় না এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার ফলে নানান শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রথমত অতিরিক্ত চিনি খেলে ওজন বাড়বে। স্থূলতার কারণে ছোটদের টাইপ–১ ও বড়দের টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে।
লিভার আমাদের শরীরের সব থেকে বড় অর্গান, যা ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। শরীরের চাহিদার অতিরিক্ত তেল ও শর্করা বা চিনি চর্বিতে রূপান্তরিত হয়ে লিভারে জমা হয়। যা প্রথমে ফ্যাটি লিভার ও পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়।
আবার শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়লে তা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত তেল রক্তে মিশে রক্তের ঘনত্ব বাড়ায় এবং ধমনির দেয়ালের পুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। ফলে উচ্চ রক্তচাপ তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃদরোগের ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে অতিরিক্ত তেল ও চিনি খেলে বিষণ্নতা, পারকিনসন এবং আলঝেইমারের মতো রোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ক্যানসার কোষের খাবারই হলো সরল শর্করা বা চিনি। তাছাড়া ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জটিলতাগুলো চিনি বহু গুনে বাড়িয়ে দেয়। এমনকি চিনি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। চিনি বা চিনির তৈরি খাবার কেমোথেরাপির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত অবস্থা বিবেচনা করে চিনি এবং চিনির তৈরি খাবার গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত।
লেখক: নিউট্রিশন অফিসার, ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি


জন্মগত হৃদরোগের কারণ কী? প্রতিকারের উপায় কী হতে পারে
শুঁটকি শরীরের জন্য উপকারী, নাকি ক্ষতিকর?
