‘আবার মাথাটা ধরবে বলে মনে হচ্ছে!’ কথাটি প্রায়শই শোনা যায়। এই ধরনের তীব্র মাথাব্যথা, যেটা কিনা আগে থেকেই কিছুটা অনুমান করা যায়, বারবার হতে থাকে এবং অপেক্ষাকৃত ১২ থেকে ৪০ বছর বয়সের নারীদের বেশি হয়ে থাকে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ- ‘মাইগ্রেন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে পৃথিবীর প্রতি ০৭ জনে ০১ জন মাইগ্রেনে ভোগেন এবং মাইগ্রেন ‘অক্ষমতা সৃষ্টিকারী’ ১০টি প্রধান রোগের মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশেও এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাই মাইগ্রেন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা এবং সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
লক্ষণ চিনুন:
- তীব্র, স্পন্দনশীল মাথাব্যথা: সাধারণত মাথার একপাশে (কখনো দুপাশে) প্রচণ্ড, দপদপে বা চিনচিনে ব্যথা হয়। এটি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া: মাইগ্রেনের ব্যথার সাথে প্রায়শই বমি বমি ভাব দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বমিও হয়ে থাকে।
- অতিসংবেদনশীলতা: আক্রান্ত ব্যক্তির উজ্জ্বল আলো (ফটোফোবিয়া), জোরালো শব্দ (ফোনোফোবিয়া) এবং তীব্র গন্ধ অসহ্য লাগে। আক্রান্ত ব্যক্তি অন্ধকার ও নীরব পরিবেশে থাকতে পছন্দ করেন।
- অরা (Aura): কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ব্যথা শুরুর আগে বা ব্যথার সময়ে চোখের সামনে আলোর ঝলকানি দেখা, আঁকাবাঁকা রেখা দেখা বা সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। হাত-পায়ে ঝিনঝিনানি বা অসাড়তা, কথা জড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
- অন্যান্য: মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, কাঁধে ব্যথা, মনোযোগে অসুবিধা ইত্যাদিও হতে পারে।
মাইগ্রেনের কারণ:
মাইগ্রেনের প্রকৃত কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে কিছু বিষয় মাইগ্রেনকে ট্রিগার করতে পারে বলে মনে করা হয়। যেমন:
- বংশগত প্রবণতা: পরিবারে কারও মাইগ্রেন থাকলে অন্যদেরও হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- হরমোনের পরিবর্তন: বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় বা হরমোনজনিত ওষুধ ব্যবহারের কারণে মাইগ্রেন হতে পারে।
- খাদ্যাভ্যাস: চকোলেট, পনির, কফি, অ্যালকোহল, প্রক্রিয়াজাত মাংস (হটডগ, বেকন), মোনোসোডিয়াম গ্লুটামেটযুক্ত খাবার, কৃত্রিম মিষ্টি (অ্যাসপার্টেম), প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার ইত্যাদি।
- মানসিক চাপ ও উদ্বেগ: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা মাইগ্রেনের অন্যতম কারণ।
- ঘুমের অভাব বা অতিরিক্ত ঘুম: ঘুমের অনিয়ম মাইগ্রেনের ঝুঁকি বাড়ায়।
- পরিবেশগত কারণ: অতিরিক্ত গরম, উজ্জ্বল আলো বিশেষ করে স্মার্টফোন বা টিভির স্ক্রিন, তীব্র গন্ধ, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে মাথাব্যথা শুরু হতে পারে। এছাড়া কিছু কিছু ওষুধ মাইগ্রেনের কারণ হতে পারে।
প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ পন্থা:
- ট্রিগার শনাক্ত ও এড়ানো: মাইগ্রেনের সূত্রপাত ঘটিয়ে দেয় এমন কারণ (ট্রিগার) চিহ্নিত করুন। এজন্য ‘ট্রিগার ডায়েরি’ রাখা যেতে পারে। কখন, কোথায়, কী খেয়ে, কী করছিলেন, কেমন ঘুমিয়েছিলেন – এইসব নোট করুন। এতে আপনার ব্যক্তিগত ট্রিগারগুলো ধরা পড়বে। কোন কোন কারণে আপনার মাইগ্রেন হচ্ছে, তা খেয়াল রাখুন এবং সেগুলো এড়িয়ে চলুন।
- ঘুমের রুটিন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান ও ঘুম থেকে উঠুন, এমনকি ছুটির দিনেও। পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা) নিশ্চিত করুন।
- নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস: সময়মতো খান, দীর্ঘসময় খালি পেটে থাকবেন না। পানি প্রচুর পরিমাণে পান করুন। অতিরিক্ত কফি বা চা পান থেকে বিরত থাকুন।
- চাপ নিয়ন্ত্রণ: ধ্যান, ইয়োগা, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, হালকা শারীরিক ব্যায়াম (হাঁটা, সাইকেল চালানো), প্রিয় কাজে সময় দেওয়া – এসব চাপ কমাতে সাহায্য করে।
- নিয়মিত ব্যায়াম: মাঝারি মাত্রার নিয়মিত ব্যায়াম (সপ্তাহে বেশিরভাগ দিনে ৩০ মিনিট) মাইগ্রেনের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি কমাতে পারে। তবে হঠাৎ খুব জোরালো ব্যায়াম মাইগ্রেন ট্রিগারও করতে পারে।
মাইগ্রেনের প্রতিকার:
মাইগ্রেনের প্রতিকারে ব্যবহৃত ওষুধগুলো দুই ধরনের:
- তৎক্ষণাৎ ব্যথা উপশমকারী: মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হলে কিছু পদক্ষেপ নিলে কিছুটা আরাম পাওয়া যেতে পারে:
- বিশ্রাম: অন্ধকার ও নীরব ঘরে বিশ্রাম নেওয়া।
- ঠান্ডা সেঁক: মাথার যে অংশে ব্যথা হচ্ছে, সেখানে ঠান্ডা কাপড় বা আইসপ্যাক দিয়ে সেঁক দেওয়া।
- ব্যথানাশক ওষুধ: সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধ ব্যথা কমাতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘন ঘন ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
- নির্দিষ্ট ওষুধ: মাইগ্রেনের জন্য বিশেষ কিছু ওষুধ রয়েছে, যা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করতে হয়।
- প্রতিরোধমূলক ওষুধ: যাদের ঘন ঘন মাইগ্রেন হয়, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ গ্রহণ করতে পারেন।
- বিকল্প চিকিৎসা: আকুপাংচার, রিলাক্সেশনথেরাপি কিছুক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, তবে এর জন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন:
১. যদি মাথাব্যথা খুব তীব্র হয় এবং ঘন ঘন হতে থাকে।
২. ব্যথার ধরনের পরিবর্তন হলে।
৩. ওষুধ খাওয়ার পরেও ব্যথা না কমলে।
৪. মাথাব্যথার পাশাপাশি জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
৫. দৃষ্টিশক্তি লোপ বা শরীরের কোনো অংশ অবশ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেওয়া।
মাইগ্রেন শুধুই ‘মাথাব্যথা’ নয়, এটি একটি স্নায়বিক রোগ। লক্ষণগুলোকে অবহেলা করবেন না। আপনার সমস্যা সম্পর্কে পরিবার ও বন্ধুদের জানান, যাতে তারা সহানুভূতিশীল হয়। মাইগ্রেনের আক্রমণ বার বার হলে বা তীব্র হলে, অবশ্যই একজন নিউরোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক রোগ নির্ণয় এবং ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা আপনাকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করবে। মনে রাখবেন, মাইগ্রেনকে পরাজিত করা পুরোপুরি সম্ভব না হলেও, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবনযাপন করা সম্ভব।
লেখক: এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএম


স্ক্যাবিস কি ছোঁয়াচে? এ রোগ কীভাবে ছড়ায়
যে কারণে শিশুদের রক্তস্বল্পতা হতে পারে
