পাবনার ঈশ্বরদীতে জীবন্ত আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দী করে পুকুরে ফেলে হত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে ক্ষোভ ও অসন্তোষের ঝড়। তবে এই অমানবিক ঘটনার মাঝেও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মানবতার এক দৃষ্টান্ত—হারানো সন্তানদের খুঁজতে পাগলপ্রায় মা কুকুরটির কোলে দুটি ছানা তুলে দিয়েছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ঈশ্বরদিয়ান’।
বুধবার বিকেলে উপজেলা পরিষদ চত্বরে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মনিরুজ্জামানের উপস্থিতিতে ঈশ্বরদিয়ান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের শাহারিয়ার অমিত ও তার সহপাঠীরা মা কুকুরটির কোলে দুটি ছানা তুলে দেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যদের দাবি, দুই দিন ধরে সন্তান হারিয়ে পাগলের মতো ছোটাছুটি করছিল মা কুকুরটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি দেখে তারা ব্যথিত হন। পরে নিজেদের এলাকায় থাকা দুটি কুকুরছানা এনে ওই মা কুকুরকে উপহার দেন।
শাহারিয়ার অমিত বলেন, ‘মা কুকুরটি সন্তানদের দুধ খাওয়াতে না পেরে যন্ত্রণায় ভুগছিল। নতুন দুটি ছানা পেয়ে সে খুবই আনন্দিত হয়েছে। এখন তাদের আদর করছে, বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে।’
আশ্চর্যের বিষয়, দুটি ছানা কাছে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মা কুকুরটি তাদের জড়িয়ে ধরে আদর করতে থাকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনের এক কোণে বছরের পর বছর ধরে বসবাস করছে ‘টম’ নামের এই কুকুরটি। এক সপ্তাহ আগে সে আটটি বাচ্চা প্রসব করেছিল।
কিন্তু সোমবার সকাল থেকেই টমের কান্না, ছুটোছুটি আর খোঁজাখুঁজি থামছিল না। কেউ কিছু বুঝতে পারছিল না। পরে জানা যায়—তার সব বাচ্চাকে হত্যা করা হয়েছে।
উপজেলা কর্মচারীদের মাধ্যমে জানা যায়, ঈশ্বরদী উপজেলা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ক্ষুদ্র কৃষক উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী নিশি রহমান জীবন্ত কুকুরছানাগুলোকে বস্তায় ভরে রাতের অন্ধকারে উপজেলা পরিষদের পুকুরে ফেলে দেন।
পরের দিন সকালে পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় মৃত ছানাগুলো। ঘটনাটি জানাজানি হতেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে।
টমের মাতৃত্বের বেদনা দেখে ঈশ্বরদিয়ান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা ব্যথিত হন। পরে শাহারিয়ার অমিতের নিজের কুকুরের দুই বাচ্চা এনে টমের কোলে তুলে দেন। ছানাগুলোর গায়ে নাক ঘষে মুহূর্তেই শান্ত হয়ে যায় টম। তার চোখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ঈশ্বরদিয়ান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে না এলে টমের কান্না হয়তো থামত না।’
এদিকে আটটি কুকুরছানাকে বস্তাবন্দী করে পুকুরে ফেলে হত্যার মামলায় অভিযুক্ত নিশি রহমানকে (৩৮) গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাকে ঈশ্বরদী থানা থেকে পাবনার আমলী আদালত–২ এ সোপর্দ করা হয়। শুনানির পর বিচারক তরিকুল ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বাদী হয়ে নিশি রহমানকে আসামি করে মামলা করেন। পরে রাত দেড়টার দিকে ঈশ্বরদী পৌরসভার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হাসানুর রহমান নয়নের স্ত্রী নিশি রহমানই অভিযুক্ত।
ঈশ্বরদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার প্রণব কুমার বলেন, ‘ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মামলা করেছেন। মামলার একমাত্র আসামি নিশি রহমানকে রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।’



