নিজের লেখা বই প্রকাশ না করার পেছনের গল্প জানাতে গিয়ে আবেগঘন একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের সাবেক স্ত্রী গুলতেকিন খান, সেখানে নিজের অভিজ্ঞতা, কষ্ট আর সিদ্ধান্ত সবকিছুই সরাসরি তুলে ধরেছেন তিনি।
তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন গেল বার আমেরিকাতে তিন মাসের জন্যে যাই তখন কিছু ব্যাক্তিগত স্মৃতি ফেইসবুকে শেয়ার করি, আমি অবাক লক্ষ্য করি যে অনেক পাঠক-পাঠিকা সেগুলো বেশ আগ্রহ নিয়ে সেগুলো পড়েন এবং পছন্দও করেন। তখন একজন প্রকাশক (আমাদের বেশ ঘনিষ্ঠ) আমাকে জানান যে তিনি ওগুলো বই আকারে প্রকাশ করতে ইচ্ছুক।’
এরপর পরিবারকে ঘিরে লেখালেখির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি, আমার ভাই-বোন, মা-বাবা, দাদা (প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ), ছেলে-মেয়েদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে থাকি। আমার খুব ভালো লাগে লিখতে! আমি একসময় বাংলাদেশের কিংবদন্তী কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, আরো কিছু বিশেষন থাকা ভদ্রলোকের সাথে ২৮ বছর বিবাহিত ছিলাম! ২৮ বছরকে হয়তো দীর্ঘ বলা যায়!’ এরপরই বলেন, ‘স্বভাবতই আমার কিছু লেখাতে তাঁর কথাও উঠে আসে।’
একটি লেখাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘একটি লেখায় তাঁকে নিয়ে দুঃখজনক একটি অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নানারকম মন্তব্যে আমার পাতা ভরে যায়! তাদের কিছু আমার পক্ষে আর কিছু আমার লেখার বিপক্ষে!’
সবচেয়ে কষ্টের মন্তব্যটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটি মন্তব্য আমাকে খুব আঘাত করে, ‘আর কতদিন (আমার পাঁচ সন্তানের বাবার নাম) তাঁকে বিক্রি করে খাবেন? আমি পোস্টটি সরিয়ে ফেলি। এবং পরের কয়েকদিন আর কোনো কিছুই লিখিনা। মন খারাপ করে নিজের ঘরে বসে ভাবি, কবে আমি আমার সন্তানদের বাবাকে বিক্রি করেছি? সপ্তাহ দুয়েক পর আবার লেখা শুরু করি। তবে ফেইসবুকে লেখা পোস্ট করি না।’
প্রকাশকের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রকাশকের সাথে বসে কথা বলি। বই এর নাম আগেই আমার ঠিক করা ছিলো—‘আমার কিছু কথা আছে, ভোরের বেলার তারার কাছে’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যের একটি গানের অংশ। এই গীতিনাট্যটি আমাদের স্কুলে মন্চস্থ করা হয়েছিল। গানের সাথে আমিও ছিলাম। আলাদা করেও একটি গান গেয়েছিলাম। কিংবদন্তি শিল্পী সানজিদা খাতুনের ছোট মেয়ে, রুচিরাও গান গেয়েছিলো। সে একই ক্লাসে আমাদের সাথে পড়ত।’’
এরপর নিজের উপলব্ধির কথা তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘আমি সবগুলো লেখা তৃতীয় বারের মতো পড়লাম। প্রতিটি লেখাই বেশ ভালো লাগে আলাদাভাবে। তবে একসাথে, বই আকারে পড়তে গেলে, কেমন যেনো খাপছাড়া লাগে। আমি মনে মনে ঠিক করলাম কি করলে বই আকারে পড়তে ভালো লাগবে! বেশ কিছু কাজ করা লাগবে, আমাকে! মনে হলো বই মেলাকে টার্গেট করে ছাপানো উচিত হবে না।’
প্রকাশক ফিরে আসার পরের পরিস্থিতি বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন, ‘উনি দু’তিন দিন পরে যখন এলেন, তখন নুহাশও বাসায় ছিল। লেখাগুলোর বেশ কয়েকটি কপি করা হয়েছিল। নুহাশ আমাদের সাথে এসে বসলো এবং বললো, ‘লেখাগুলো ভালো হয়েছে। কিন্তু যাঁরা এই বই কিনবেন তাঁরা প্রথমেই তাঁর বাবাকে (ওখানে ওঁর বাবাকে একটিই লেখা ছিলো যেটি বিতর্ক সৃস্টি করতে পারে। বাকি সবই ছিল ছোট ছোট সুখস্মৃতি) নিয়ে লেখা গুলো আগে পড়বেন! তোমার স্মৃতি নিয়ে কারো তেমন আগ্রহ থাকবেনা। পাঠকদের পছন্দ না হলে তা নিয়ে আলোচনা হবে ফেইসবুকে! মা, তুমি কি সেসব মন্তব্য পড়ে ঠিক থাকবে?’’
তিনি লিখেছেন, ‘আমি রাত জেগে ভাবলাম, এই সামান্য একটি লেখাকে কেন্দ্র করে এতো মানুষের মন্তব্য? এই মানুষগুলো লেখককে এতো ভালোবাসেন! এই মানুষগুলোর বয়স সম্ভবত আটাশ থেকে আটাত্তুর বছর! তাঁরা আমার সন্তানদের বাবাকে ভালোবাসেন! তাঁদের কেউ কেউ কিশোর বয়স থেকে তাঁর লেখা পড়ে, নাটক দেখে আসছেন। আমি তো তাঁদের মনে আঘাত দিতে পারি না! তিনি কতজন কিশোরীর সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত ছিলেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কথা। আমি স্ত্রী হিসাবে যেভাবে তাঁর পাশে ছিলাম, অন্য যে কোনো মেয়েও তাই করতো বা করতেন। শুনেছি মানুষের মনে আঘাত দেওয়া আল্লাহ পছন্দ করেন না!’
ক্ষমার প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘তিনি যে বছর সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন, সে বছরেই আমি হজ্জ পালন করি এবং তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম, আমার সাথে করা সব অন্যায়ের জন্যে! ক্ষমা অনেক আগেই করেছিলাম। ক্ষমা না করলে আমি সন্তানদের নিয়ে এগিয়ে যেতে পারতাম না!’
সবশেষে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সে রাতেই ঠিক করলাম যে আমার বইটি ছাপাবো না। তাঁর অসংখ্য ভক্তদের মনে আঘাত দেয়ার অধিকার আমার নেই!’
প্রকাশকের উদ্দেশে লেখা বার্তায় তিনি বলেন, ‘প্রিয় ফরিদ ভাই, আমার জীবনে অনেক দুর্ঘটনা ঘটার পরও আমি কখনো কান্নাকাটি করিনি। সন্তানদের নিয়ে সামনের দিকে হেঁটেছি। আমার তিন মেয়ে জড়াজড়ি করে কেঁদেছে তবু বন্ধুদের সাথে শেয়ার করেনি। আমি সারাজীবন সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি, এখন আর পেছনের দিকে তাকাতে চাই না। আমার ঘটনা সব সত্যি তবে এগুলো ছাপাতে চাই না এখন। আপনার এপর্যন্ত যত টাকা খরচ হয়েছে সব দিয়ে দিতে চাই। জানি আপনি বই ছাপাতে চাননি, সত্যকে সামনে আনতে চেয়েছেন। আমি ক্ষমা চাইছি, আমাকে মাফকরে দিন, প্লিজ!’


বাবাকে নিয়ে বন্যা মির্জার আবেগঘন খোলা চিঠি
