নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় বসার পর একটা বড় পরিবর্তন আসে ভারতের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে। বিশেষ করে হিন্দি সংবাদপত্র ও হিন্দিভাষী টিভি চ্যানেলে। হিন্দুত্বের অকর্ষিত উর্বর জমি থেকে মোদি যে লাভ ঘরে তুলেছিলেন, তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাননি এই সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা। ভারতে ওই সময় সংবাদমাধ্যমের ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ছিল ব্যাপক। বলা হচ্ছিল ২০২৬ সালে মিডিয়া ব্যবসার আকার দাঁড়াবে ২৬০০ কোটি ডলারে। আর ব্যবসার একটা বড় অংশ আসবে সরকারি ক্ষেত্র থেকে। তাই এই লাভের হিস্যা কে কত নিতে পারে, তা নিয়ে শুরু থেকেই কামড়া-কামড়ি শুরু হয়ে যায়। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। একদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের বিজয়, অন্যদিকে অঢেল সরকারি অর্থ—ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমকে মোদি সরকারের কুক্ষিগত হতে সাহায্য করে।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বা তার স্বাভাবিক ধর্ম পালন—যাই বলি না কেন, তাতে শেষ পেরেকটা পোতা হয় ২০২২ সালের নভেম্বরের শেষে। যখন এনডিটিভির বোর্ড থেকে প্রণয় রায় ও তাঁর স্ত্রী রাধিকা রায় পদত্যাগ করেন। ভারতের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপ ঘোষণা দেয় এনডিটিভি কেনার। ষোলোকলা পূর্ণ হয় দিল্লি-কেন্দ্রিক স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের। ৩০ নভেম্বর, ২০২২ তারিখে এনডিটিভি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ম্যাগসেসে পুরস্কারপ্রাপ্ত জনপ্রিয় সাংবাদিক রবিশকুমার। পদত্যাগের কারণ জানিয়ে রবিশকুমার তাঁর দর্শকদের উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও বার্তা দেন নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে। গত দেড় বছরে প্রায় ২৫ মিনিটের এই ভিডিওটি দেখা হয়েছে এক কোটি বারের বেশি।
এটা কোনো একটা সামান্য পরিসংখ্যান নয়, এই ভিডিও দেখার পেছনে কাজ করেছে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের ধ্বসে পড়ার নির্মম কাহিনি জানার আকাঙ্ক্ষা। গত দশ বছরে সরকারের কুক্ষিগত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম একটি বিশেষ নামে ভূষিত হয়েছে, ‘গোদি মিডিয়া’। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই শব্দটি এখন বেশ পরিচিত। গোদি শব্দটি এসেছে হিন্দি শব্দ গোদ থেকে, যার অর্থ কোল। অর্থাৎ, সরকারের কোলে চড়ে তার যত নাচানাচি, সরকার যেভাবে চায় সেভাবেই চলে। এই গোদি মিডিয়া শব্দটির স্রষ্টাও রবিশকুমার। এখন ভারতে দুই ধরনের সংবাদমাধ্যম—গোদি মিডিয়া ও এর পাল্টা মিডিয়া। ২০২৪-এর নির্বাচন গোদি মিডিয়ার অংশীজনদের যেভাবে নগ্ন করে দিয়েছে, তা স্বাধীন ভারতে গত ৭৭ বছরে কখনো হয়নি। শাসক দল বিজেপির না স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির আজ্ঞাবহ এইসব সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল, তা মাঝে মাঝে গুলিয়ে যায়। প্রশ্নের চেয়ে যারা প্রশংসা করতে বেশি উদ্গ্রীব, তাদের কাছে সাধারণ মানুষের বিশেষ কিছু চাওয়া-পাওয়ার থাকে না। ক্ষমতার দাপটে গণমাধ্যম বাস্তবতা মেনে শাসক দলের দিকে হেলে থাকতে পারে, কিন্তু এভাবে বিজেপি-বিরোধীদের পুরো ভোটচিত্র থেকে মুছে দেওয়াটা, গণমাধ্যমের মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকা–না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়।
বায়ুমণ্ডলে কোনো স্থান যেমন ফাঁকা হলেই অন্য জায়গা থেকে বাতাস এসে তা ভরিয়ে দেয়। একইভাবে বিজেপিবিরোধী রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, শিবসেনাসহ (উদ্ধব ঠাকরে) ইন্ডিয়া জোটের দলগুলো জেনেই গেছে যে, কোনো টিভি চ্যানেল তাদের সভা-সমাবেশ সরাসরি সম্প্রচার করবে না, এমনকি অন্য সময় খবরেও হয়তো দেখাবে না। তাই তারা ইউটিউব, ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার)-এর মতো মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। ২০২৪-এর এই চিত্র একেবারেই নতুন ভারতের জন্য। গত ১০ বছরে সর্বত্র ধীরে ধীরে এক নতুন ভারতের জন্ম হয়েছে, এটাও তারই একটা প্রমাণ।
ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির নাম এখন অনেকেই জানেন। আমাদের এখানে কেউ কেউ ধ্রুবকে নিয়ে ভিডিও করেছেন। মোদিকে নিয়ে তৈরি ধ্রুবর ‘দ্য ডিক্টেটর?’ ভিডিওটি পাঁচ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত এক মাসে মূলধারার পত্রিকা ও টিভিতে প্রায় ৭০-৮০টি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এসব সাক্ষাৎকার পত্রিকা বা টিভিতে প্রচারের পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলে শেয়ার করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সম্মিলিত দেখার পরিমাণ ধ্রুবর এই ভিডিওর ধারেকাছেও নেই। ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের কী অবস্থা, তা বোঝাতে এই একটি তথ্যই যথেষ্ট।
ধ্রুব রাঠির বাইরেও রবিশকুমার, আকাশ ব্যানার্জি, গিরিরাজ বশিষ্ঠ, অভিসার শর্মা, পূর্ণ প্রসুন বাজপেয়ি, করণ থাপার, আনন্দ বর্ধন সিং, অশোক ওয়াংখেড়ে, দীপক শর্মা—এমন শত শত নাম আছে। যাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ঘণ্টা না পেরোতেই লাখের ওপরে দেখা হয়। এদের সবার একটাই বৈশিষ্ট্য—তাঁরা মোদির কঠোর সমলোচক। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, এদের ভিডিও এত দেখা হচ্ছে কেন? কারা দেখছে? প্রথম প্রশ্নের জবাবে বলা যায়, মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ব্যর্থতাই এদের সাফল্যের প্রধান কারণ। গত ২০১৯-এ বিজেপি সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। অর্থাৎ, বিজেপির ওই সুসময়েও দেশের ৬৩ ভাগ মানুষ দলটির বিরুদ্ধে ছিল। এই অংশটাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে গোদি মিডিয়া। যে কারণে তারা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে বিকল্প মাধ্যম।
একই কাজ করেছিল আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যম। ২০১৬-তে ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পরপরই তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করে। এতে ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক গোষ্ঠী পুরোপুরি বর্জন করে এইসব সংবাদমাধ্যমকে। ফলে তাদের সম্ভাব্য পাঠক বা দর্শকের সংখ্যাটা সীমিত হয়ে পড়ে। এখনো ট্রাম্প জনপ্রিয়তার নিরিখে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আমেরিকান সংবাদমাধ্যম একে ধর্তব্যের মধ্যে আনতে নারাজ। ঠিক এ কারণে গত প্রায় ২০ বছর ধরে টিআরপি রেটিংয়ে সিএনএন-এর চেয়ে এগিয়ে ফক্স নিউজ। গ্রহণযোগ্যতার এই জায়গায় প্রচলিত বড় সংবাদমাধ্যম এখন বিরাট পরীক্ষার মুখে।
২০১৭ সালে আমেরিকার বাম-ঘেঁষা ডেমোক্র্যাট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স লিখেছিলেন, কীভাবে কমকাস্ট, নিউজ কর্প, ডিজনি, ভায়াকম, টাইম ওয়ার্নার এবং সিবিএস—এই মাত্র ছয়টি কোম্পানি দেশের ৯০ শতাংশ মিডিয়ার মালিক হয়ে বসে আছে। ফোর্বস ২০১৬ সালে লিখেছিল, ১৫ জন ধনকুবেরের মালিকানায় ছিল নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টসহ প্রধান প্রধান সব জাতীয় সংবাদপত্র। একই অবস্থা ব্রিটেনেও। সেখানে ২০১৫ সালে জাতীয় সংবাদপত্রের বাজারের ৭১ শতাংশ ছিল তিনটি প্রতিষ্ঠানের দখলে। এরা হলো নিউজ ইউকে, ডেইলি মেইল গ্রুপ ও রিচ। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই ৭১ শতাংশ ২০১৯-এ গিয়ে দাঁড়ায় ৮৩ শতাংশে এবং ২০২১ সালে তা ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়। বোঝাই যায়, শাসকেরা চাইলে কত সহজে মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আবার উল্টোটাও সত্য। কয়েকজন মিডিয়া মালিক চাইলেই একজন ব্যক্তি বা কোনো বিশেষ দলকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
ভারতেও এখন অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম আম্বানি, আদানির মতো বড় বড় করপোরেটদের দখলে। ২০১২ সালে নেটওয়ার্ক ১৮ মিডিয়া গ্রুপ কেনার মধ্য দিয়ে আম্বানিদের রিলায়েন্স এই জগতে পা রাখে। তারপর শুধুই বড় হওয়া। আদানি পরে মাঠে নামলেও এখন তার অধীনে এনডিটিভি, এআইএসএস (বার্তা সংস্থা) ও কুইন্ট (অনলাইন পোর্টাল)-এর মতো সংবাদমাধ্যম আছে। বিজেপির ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী সুভাষ চন্দ্র জি মিডিয়া করপোরেশনের মালিক। বিজেপির সহসভাপতি ও মুখপাত্র বৈজয়ন্ত পান্ডা জনপ্রিয় ওডিশা টিভির মালিক। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্বশর্মার স্ত্রী রিংকি ভূঁইয়া শর্মার মালিকানাধীনে আছে উত্তর‑পূর্ব ভারতের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল নিউজ লাইভ। এভাবে সংবাদমাধ্যমের মালিকেরা কেউ কেউ সরাসরি বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির সাথে যুক্ত হয়েছেন। আর অন্যরা চাপে বা স্বেচ্ছায় তাদের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। এ কারণেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে ভারত এখন ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬১তম। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের তৈরি এই সূচকে ভারতের থেকে এগিয়ে আছে নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা।
২০০২ সালের গুজরাটের দাঙ্গার কথা মনে আছে? ওই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ওই ঘটনায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের অধিকাংশ মুসলমান। বিষয়টি নিয়ে পরে মোদির সাথে কথা বলেন বিবিসির এক সংবাদিক। ওই সাংবাদিকের প্রশ্ন ছিল, এই দাঙ্গায় তাঁর (মোদি) সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কী ছিল। মোদির জবাব ছিল, সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাটা ছিল তাঁর বড় ব্যর্থতা। এ থেকে বোঝা যায়, সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে তাঁর ধারণাটা আসলে কী? আর ২০১৪ সালে মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মিডিয়া যে একপেশে ভূমিকা পালন করেছে, তা ইতিহাস হয়ে আছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের সময় কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল পুলওয়ামা বা বালাকোট নিয়ে মোদি সরকারকে প্রশ্ন করল না। বরং মোদির পালে বাতাস জোরদার করতে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্তুঙ্গ স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিল। পাশাপাশি যারা সামান্য মুখ খোলার চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হলো। আন্দোলনরত কৃষকদের গোদি মিডিয়ায় এমনভাবে চিত্রিত করা হলো, যেন তারা দেশের শত্রু। করোনাকালে লাখ লাখ মানুষ যখন সরকারের ২৪ ঘণ্টার নোটিশে কর্মস্থল ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলো, গঙ্গায় লাশের স্রোত বইতে শুরু করল, তখনো গোদি মিডিয়ার কোনো হেলদোল কেউ দেখেনি। বরং করোনা মোকাবিলায় সরকারের প্রশংসা ছিল একতরফা। প্রশ্ন তোলা যাদের কাজ, তারা যদি ক্ষমতার সামনে হাত কচলে পেশাদারত্বকে বিসর্জন দিয়ে আসে, তাহলে সেটা আর সংবাদমাধ্যম থাকে না। সর্বশেষ কানাডায় এক শিখ নেতাকে হত্যা এবং নিউইয়র্কে অপর এক শিখ নেতাকে হত্যার চেষ্টা নিয়ে গোদি মিডিয়ায় সরকারের বলদর্পী ভূমিকার বিনম্র অনুমোদন সবাই দেখল।
অন্ধ হলে তো প্রলয় বন্ধ থাকে না। তাই গত ১০ বছরে নরেন্দ্র মোদি ভারতের অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমকে নিজের তাঁবে নিয়ে আসতে পেরেছেন এটা যেমন সত্য, তেমনি তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গেছে–এটাও ঠিক। এই গোদি মিডিয়া এখন মোদিকে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় বসাতে পারে কিনা, সেটাই দেখার।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]
আরও পড়ুন: