কাশ্মীর নিয়ে কোনো সমঝোতা করে ট্রাম্প কি নোবেল শান্তি পুরস্কার জিততে পারবেন?

আপডেট : ১৬ মে ২০২৫, ০৬:৪৩ পিএম

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে নরওয়ের কাছ থেকে মর্যাদাপূর্ণ নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের আমন্ত্রণের অপেক্ষায় আছেন। চারজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন। এদের মধ্যে রুজভেল্ট প্রথম, তারপরে উড্রো উইলসন, জিমি কার্টার ও বারাক ওবামা। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের শেষ সময়ে ট্রাম্প বারবার ওবামার নোবেল শান্তি পুরস্কারের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ওবামা এই পুরস্কারের যোগ্য নন। একজন মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ক্লডিয়া টেনি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির কাছে একটি চিঠি লিখে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরায়েল ও কিছু মুসলিম দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্পকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছিলেন। আরেকজন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ড্যারেল ইসাও ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন।

যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এবং শান্তি নিয়ে গবেষণায় ব্যাপৃত প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রার্থী মনোনীত করতে পারেন। মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজেকে বহুবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন। প্রথমবার ২০১৯ সালে ট্রাম্প তাঁর যুক্তি তুলে ধরেন এই বলে যে, উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়া নিয়ে তাঁর কাজের জন্য তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য। আবার এ-ও অভিযোগ করেন যে, তিনি সম্ভবত কখনও এই সম্মান পাবেন না।

ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার মধ্যে শান্তি চুক্তির মধ্যস্থতার জন্য ট্রাম্প আবার ২০২০ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার চেয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কারটি পান ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির দলের একজন পার্লামেন্ট সদস্য ওলেকসান্ডার মেরেঝকো ২০২৪ সালের নভেম্বরে নরওয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটিকে একটি চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি স্থাপনের প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন।

যুদ্ধ নিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বাদানুবাদে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সএ বছরের ফেব্রুয়ারিতে, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার জিততে বাধ্য। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত কনজারভেটিভ পলিটিক্যাল অ্যাকশন কনফারেন্সে বার্ষিক সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে ওয়াল্টজ বলেন, ‘এটি শান্তির প্রেসিডেন্সি। তিনি ইউরোপে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চলেছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চলেছেন এবং এই সবকিছুর শেষে, আমরা ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের নামের পাশে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেতে যাচ্ছি।’

মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া ট্রাম্পের ভাষণ নিয়ে অনেক ইউরোপীয় দেশ আপত্তি জানিয়েছিল। কারণ তিনি বলেছিলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। গ্রিনল্যান্ড একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত ডেনিশ অঞ্চল। ট্রাম্পের ভাষণ ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ায়। ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্টভাবে বলেন, ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে না।

বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনে কোনো শান্তি আসেনি। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্প ইউক্রেনকে বাধ্য করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওভাল অফিসে জেলেনস্কির সাথে তাঁর বৈঠক কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনেনি। ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হবে ১০ অক্টোবর। আর পুরস্কার দেওয়া হবে ১০ ডিসেম্বর। ট্রাম্প এখনো শান্তি পুরস্কারের জন্য যোগ্য নন। তবে তিনি এখনো দৌড়ে আছেন। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, গত ১০ মে দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে তিনি পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিলেন। পাকিস্তান তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি ও স্বাগত জানায়। কিন্তু তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে কিছু স্বীকার করতে ভারতের মনোভাব অনেকটাই গা-ছাড়া গোছের।

 কাশ্মীর বিরোধের সমাধানে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একজন শান্তিপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে উঠে এসেছেন। তিনি বলেন, “আমি তোমাদের দুজনের সাথেই কাজ করব, দেখব, ‘এক হাজার বছর’ ধরে চলে আসা কাশ্মীরের বিষয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছানো যায় কিনা। ঈশ্বর ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বকে এই সুষ্ঠু কাজের জন্য আশীর্বাদ করুন।”

মোদি দাবি করেছিলেন, পাকিস্তানই ভারতের সাথে যুদ্ধবিরতির জন্য যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প সৌদি আরবে দেওয়া ভাষণে মোদির দাবির বিরোধিতা করেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, তিনি বাণিজ্যকে সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করেছিলেন। একই সাথে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুই পরমাণু অস্ত্রধর প্রতিদ্বন্দ্বীর নেতাদের মধ্যে একটি সুন্দর নৈশভোজের আয়োজন করার আহ্বান জানান।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরোধিতা করার চেষ্টা করেন খুব সাবধানতার সাথে। তিনি বলেন, “ভারত ও মার্কিন নেতাদের মধ্যে পরিবর্তিত সামরিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই আলোচনার কোনোটিতেই বাণিজ্যের বিষয়টি উঠে আসেনি।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকা সম্পর্কে নীরব। ভারত কি ট্রাম্পকে কাশ্মীরের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করবে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ভারত সব সময় কাশ্মীরকে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যান করেছে। ২২ এপ্রিল পেহেলগাম হামলার পর ভারত বড় ভুল করে তার অবস্থান দুর্বল করে ফেলেছে।

প্রথমত, পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভারত কোনো প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে দোষারোপ করে। আর পাকিস্তান নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের দ্বারা এ ঘটানার স্বচ্ছ তদন্তের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ভারত এই চমৎকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। দ্বিতীয়ত, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফাভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে। এই পানি চুক্তি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫, ১৯৭১ ও ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের পরও টিকে ছিল। পেহেলগামের ঘটনার পরে ভারত আকস্মিকভাবে সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করে। তারপর পাকিস্তানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সারা বিশ্বে এই আশঙ্কার বার্তা পৌঁছে দেয় যে, কাশ্মীর আর দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বীর দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নয়। ভারত স্বীকার করুক বা না করুক, আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বেশির ভাগ সময়, পাকিস্তান নয়, বরং ভারত মার্কিন ভূমিকার সুবিধাভোগী ছিল।

সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ায় নিযুক্ত প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোসেফ করবেল ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের ভারত ও পাকিস্তান কমিশনের একজন প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি ‘ডেঞ্জার ইন কাশ্মীর’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। এর মুখবন্ধ লেখেন অ্যাডমিরাল চেস্টার ডব্লিউ নিমিৎজ। তিনি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের কমান্ডার ইন চিফ। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত নিমিৎজ জম্মু ও কাশ্মীরের জন্য জাতিসংঘ-নিযুক্ত গণভোট প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। করবেল তাঁর বইতে লিখেছেন, “জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের ভারতে যোগদান আন্তর্জাতিক আইনের বিধান অনুসারে বৈধ বলে বিবেচিত হতে পারে না।” করবেল স্পষ্ট করে বলেছেন যে, জাতিসংঘের একটি নীতিগত দায়িত্ব রয়েছে। কেবল শান্তি বজায় রাখার জন্য প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবেই নয়, বরং এটি এমন একটি সংস্থা, যারা ভারত ও পাকিস্তানের সংঘাতে হস্তক্ষেপ করার জন্য অনুরোধ করে। জোসেফ করবেলের কন্যা মেডেলিন অ্যালব্রাইট ১৯৯৭ সালে প্রথম নারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতের পাশে বসে আছেন তাঁর স্ত্রী। ছবি: সংগৃহীতইতিহাস বলছে, পাকিস্তান সব সময় কাশ্মীরের বিরোধ সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িত করার চেষ্টা করেছে। ভারতও বহুবার যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িত করেছে এবং উপকৃত হয়েছে। কিন্তু কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ দেয়নি। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় ভারতই জাতিসংঘের কাছে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধবিরতির জন্য অনুরোধ করেছিল। তখন জাতিসংঘে নিজ কূটনীতিকদের মাধ্যমে আমেরিকা এই যুদ্ধবিরতির পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানি সেনারা শ্রীনগরের খুব কাছাকাছি ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতি ভারতকে শ্রীনগর ও জম্মুর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সাহায্য করেছিল। এই কারণেই পাকিস্তানি নেতারা ১৯৪৮ সালে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতির কথা বারবার মার্কিন নেতাদের মনে করিয়ে দেন।

১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ারের সাথে একটি চুক্তি করেন। সোহরাওয়ার্দী সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য মার্কিন বিমানবাহিনীকে পেশোয়ারের কাছে বাদাবির বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন। আর আইজেনহাওয়ার কাশ্মীর বিরোধ সমাধানে ভূমিকা রাখতে সম্মত হন। দুই নেতার মধ্যে আলোচনার পর ১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে একটি যৌথ বিবৃতি জারি করা হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে কাশ্মীর ও সিন্ধু নদীর পানি বণ্টনের কথা উল্লেখ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাশ্মীর বিরোধের সমাধান করা উচিত এবং সিন্ধু নদীর পানি নিয়ে বিরোধ বিশ্বব্যাংক দ্বারা সমাধান করা হবে। এই মার্কিন-পাকিস্তান যৌথ বিবৃতি ছিল ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের একটি বড় কূটনৈতিক বিজয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৫৭ সালের অক্টোবরে সোহরাওয়ার্দী পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংক সিন্ধু পানি চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তির মধ্যস্থতা করে। সিন্ধু পানি চুক্তির সুবিধাভোগী ছিল ভারত। কারণ, পাকিস্তান তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, চুক্তিটি আসলে পর্দার আড়ালে থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হয়েছিল এবং সেই কারণেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তিনটি যুদ্ধের পরও টিকে ছিল। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কাশ্মীর মুক্ত করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডিই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানকে ভারত আক্রমণ না করা থেকে বিরত করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, কাশ্মীর বিরোধের সমাধান করা হবে। সেই যুদ্ধে ভারত চীনের কাছ থেকে লজ্জাজনক পরাজয়ের মুখোমুখি হয়। কেনেডি নেহেরুকে পাকিস্তানের সাথে আলোচনা শুরু করতে বাধ্য করেন। সেই যুদ্ধের পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বর্ণ সিং আমেরিকা এবং ব্রিটেনের পৃষ্ঠপোষকতায় আলোচনা শুরু করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৬৩ সালে কেনেডিকে হত্যা করা হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত ও পাকিস্তানের আরেকটি যুদ্ধ হয়। কারণ আমেরিকা সোহরাওয়ার্দী ও আইয়ুব খানকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি চুক্তি করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে যায়। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত সিমলা চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরকে দ্বিপক্ষীয় বিষয় হিসেবে মেনে নেয়। ভারত ১৯৮৪ সালে সিয়াচেন মালভূমি দখল করে সিমলা চুক্তি লঙ্ঘন করে। ১৯৯৯ সালে কার্গিলের কিছু মালভূমি দখল করে পাকিস্তানও একই কাজ করে এবং দুই পরমাণু অস্ত্রধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে আবারও আমেরিকা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে। প্রাক্তন মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্ট্রোব ট্যালবট তাঁর ‘Engaging India: Diplomacy, Democracy and the Bomb’ বইয়ে ১৯৯৯ সালের যুদ্ধবিরতির বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। তিনি নওয়াজ শরীফকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ১৯৯৯ সালের জুলাই মাসে যুদ্ধবিরতির পর আমেরিকা কাশ্মীরে তার ভূমিকা পালন করবে। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে নওয়াজ সরকারের পতন ঘটে। ১৯৫৭ সালের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯৯৯ সালে।

১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংক সিন্ধু পানি চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি চুক্তির মধ্যস্থতা করে। ছবি: রয়টার্স২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধের হুমকি তৈরি হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনী বালাকোটের কাছে পাকিস্তানি ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ করে এবং অবশেষে পাকিস্তান বিমান বাহিনী একটি ভারতীয় বিমান গুলি করে ভূপাতিত করে। অভিনন্দন নামে একজন ভারতীয় পাইলট পাকিস্তানের হাতে ধরা পড়েন। পরিস্থিতি শান্ত করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় পাইলটকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধের হুমকি এড়ানো যায়। আবারও, ভারত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার সুবিধাভোগী হয়েছিল। কারণ তাদের আটক পাইলট নিরাপদে দেশে ফিরে যান।
আমরা অনেক কিছু নিয়ে ট্রাম্পের সমালোচনা করতে পারি, কিন্তু আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, তিনি এই মে মাসে দক্ষিণ এশিয়াকে পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, এবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও যুক্তরাজ্য পাকিস্তান ও ভারতকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করতে ট্রাম্পকে সাহায্য করেছিল। এখন কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে ভূমিকা পালন করা মার্কিন প্রশাসনের কেবল নৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও বটে। আইজেনহাওয়ার-কেনেডি থেকে শুরু করে ক্লিনটন পর্যন্ত, অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানকে কাশ্মীর নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে কার্যত সহায়তা করেছেন ভারতকে। ট্রাম্পও নতুন কিছু করছেন না। কাশ্মীরের কথা উল্লেখ করে, তিনি কেবল ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের সাথে আইজেনহাওয়ারের করা প্রতিশ্রুতি পূরণ করার চেষ্টা করছেন। তিনি ভারতকে বলতে পারেন যে, ১৯৬২, ১৯৯৯ ও ২০১৯ সালে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা থেকে তারা উপকৃত হয়েছে। ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা কেন তারা স্বীকার করছে না? নিঃসন্দেহে, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ট্রাম্প মোদির মুখ রক্ষা করেছেন। কারণ, মোদি যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

ট্রাম্প ভারতকে এটাও বুঝিয়ে বলতে পারেন যে, যদি কাশ্মীর বিরোধের সমাধান হয়, তাহলে ভারতের লাভ পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি হবে। আর কাশ্মীর বিরোধের সমাধান কেবল ট্রাম্পের জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কারের বিষয় নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সাথে সম্পর্কিত। যা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের মডেল অনুসরণ করতে পারে। ভারত যদি আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর বিরোধের সমাধান করতে রাজি না হয়, তাহলে পাকিস্তান আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। মনে রাখবেন, এবার ভারতের মুখ রক্ষার জন্য আর কোনো ট্রাম্পকে হাতের কাছে পাওয়া যাবে না।

(লেখাটি জিও নিউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এবং লেখকের অনুমতি সাপেক্ষে ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, উপস্থাপক এবং কলামিস্ট, জিও নিউজের সঙ্গে যুক্ত

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক...
ইউরোপীয় মিত্ররা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অর্থায়ন ও সমর্থন বাড়াতে, সহায়তা ও সামরিক সমর্থন বৃদ্ধি করতে এবং নিষেধাজ্ঞা বাড়াতে সচেষ্ট হয়েছে। ইউরোপ ও কানাডা বনাম আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন অগ্রাধিকারের...
আমেরিকা, চীন, রাশিয়া ও ইউরোপ কমবেশি শক্তি প্রয়োগ করে এই দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে আসবে কিনা–তা বুঝতে কিছু ‘ফ্যাক্টর’ বা বিষয় চিহ্নিত করা সম্ভব। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি কি এখানেই থেমে যাবে, এই যুদ্ধ কি...
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত এবং তা সহজে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে চিকিৎসকেরা যেন রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার...
বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে পছন্দের দল হেরে যাওয়ায় সাতক্ষীরাযর রসুলপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাফিজুর রহমান ওরফে লালটু নামে এক আর্জেন্টিনার সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার সকালে এ ঘটনা ঘটে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে আবারও বাড়ছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। এতে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বেড়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি...
দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। অভিযান শুরুর পর ককরোচ জনতা পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এতে হতাহতদের বিষয়ে...
লোডিং...

এলাকার খবর