মাঝে মাঝে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের পড়তে হয়, যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় থাকে না। হঠাৎ কারোর আত্নহত্যা খবর শুনলে এমনি উপলদ্ধি হয় আমাদের। আমরা কখনও ভেবে দিখেছি কি? মানুষ কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। এই সবুজ মৃত্তিকায় কে না বাঁচতে চায়? কিন্তু মানুষের জীবনে এমন ঘোর অমবস্যা আসে, যখন তিনি কঠিন পরিস্থিতিতে সামলে উঠতে পারেন না। তখন নিজেকে অসহায় মনে করেন। এই অসহায়ত্ব থেকে এক পর্যায়ে তিনি পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মানুষ একদিনে নেন না। জীবনের প্রতি বিরক্ত হয়ে কেউ কেউ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। প্রশ্ন আসতে পারে, আত্মহত্যা তো জীবনের শেষ পরিণতি হতে পারে না। যিনি আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর কাছে কিন্তু এই প্রশ্নের জবাবও থাকে। আত্মহত্যা মানে তো দুনিয়া থেকে চিরবিদায়। এ কথা তো তিনি জানতেন। আত্মহত্যাকারী যখন নিজেকে অসহায় মনে করেন, মূলত তখন এই সিদ্ধান্ত নেন। তিনি হয়ত এমন পরিস্থিতির শিকার হন যে, জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা থেকে আর বেঁচে থাকতে চান না। তাই কাছের মানুষ বা প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য পেছনে ফেলে মৃত্যকে কাছে টেনে নেন।
তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে আমরা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। খুব প্রয়োজন ছাড়া পাশে বসে থাকা সহকর্মীর দিনকাল কেমন যাচ্ছে জানার চেষ্টা করি না। আমরা বেশিরভাগ সময় নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। পরিবার বা কর্মস্থলের মানুষদের সুখ–দুঃখের খবর নিচ্ছি না। তাই আমরা মানবিকতাবোধ সম্পন্ন মানবিক সমাজ গঠনে ভূমিকা পালন করতে পারছি না।
খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। গত পরশু মানে আজ থেকে তিনদিন আগে শুক্রবার রাতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা কুমিল্লায় নিজ বাড়িতে আত্মহত্যার করেন। আত্মহত্যার আগে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। এরপর তিনি জগৎ সংসারের মায়া ছেড়ে চলে যান। কী ছিল সেই স্ট্যাটাসে? স্ট্যাটাসে তিনি তাঁর এক সহপাঠী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ করেন।
অবন্তিকার অভিযোগের স্ট্যাস্টাসের শুরুতে লেখা ছিল, 'আমি যদি কখনো সুইসাইড করে মারা যাই, তবে আমার মৃত্যুর জন্য একমাত্র দায়ী থাকবে আমার ক্লাসমেট আম্মান সিদ্দিকী, আর তাকে সাপোর্টকারী জগন্নাথের সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম। আম্মান যে আমাকে অফলাইন, অনলাইনে থ্রেটের উপর রাখত সে বিষয়ে প্রক্টর অফিসে অভিযোগ করে ও লাভ হয় নি। সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম আমাকে নানান ভাবে ভয় দেখায়। আম্মানের হয়ে আমাকে বহিষ্কারও করবেন বলেন। জানি এখানে আমি কোন জাস্টিস পাবো না।'
অবন্তিকার স্ট্যাটাস থেকে জানা যায়, তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন। তিনি ফাইটার ছিলেন। কিন্তু ইভটিজার আম্মানের কারণে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলে গলায় ফাঁসি দিয়ে মারা যান। তবে মৃত্যুর আগে তিনি জানিয়ে দিয়ে যান, তাঁর এই পদক্ষেপ সুইসাইড না এটা মার্ডার, টেকনিক্যালি মার্ডার। এ কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাদেকা হালিমের কাছে বিচারও চান।
এই ঘটনায় অবন্তিকার মায়ের অভিযোগ, মেয়ে মানসিক হয়রানি প্রতিকার চেয়েও বিচার পাননি। আর এ কারণেই তাঁর মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। অবন্তিকার ভাইয়ের ভাষ্য মতে, তাঁর বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়রানির বিষয় নিয়ে প্রায় সময় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে আর প্রকাশ্যে অভিযোগ করে বলেন, সহপাঠী আম্মানের বিরুদ্ধে অবন্তিকা প্রক্টর অফিসে নালিশ করেছিলেন ২ বছর আগে। কিন্তু সুরাহা পাননি, উল্টো মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মেয়ের মৃত্যুর বিচারের দাবিতে অবন্তিকার মা মামলা করেছেন। কুমিল্লা কোতয়ালি থানায় করা মামলার এজাহারে তাহমিনা বেগম উল্লেখ করেন, ‘ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকা (২৪) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিল। আমার মেয়ে মেধা তালিকা অনুসারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে সিট পায়। অবন্তিকা আমাকে জানায়, তাঁর ক্লাসমেট রায়হান সিদ্দিক আম্মান বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁকে যৌন হয়রানিমূলক নিপীড়ন করে। এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে জানানোর পরও তিনি আম্মানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো আম্মানের পক্ষ নিয়ে আমার মেয়েকে অশ্লীল ভাষায় গালমন্দ করেন। এজন্য আমার মেয়ে হোস্টেলে থাকাটা নিরাপদ মনে না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে ছাত্রীদের মেসে থাকা শুরু করে। কিন্তু তাতেও দুজন ক্ষান্ত হননি। তারা অবন্তিকার কয়েকজন ক্লাসমেটের মাধ্যমে তাঁর চলা ফেরার প্রতি নজর রাখে। তাদের মাধ্যমেও আমার মেয়েকে বিভিন্নভাবে মানসিক নিপীড়ন দিতে থাকে। এরই মধ্যে গত ১৪ মার্চ অবন্তিকা কুমিল্লার বাসায় চলে আসে। কিন্তু কুমিল্লায় এসেও মেয়ে শান্তি পায়নি। তাদের মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে।’
অবন্তিকার মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে অব্যাহতি আর আম্মান সিদ্দীকীকে বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যায় অভিযুক্ত আম্মান ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তবে, এরআগে অভিযুক্ত সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম অভিযুক্ত করে আত্মহত্যার ঘটনায় সঠিক তথ্য জেনে সিদ্ধান্ত এবং মন্তব্য করার অনুরোধ করে বিবৃতি দেন। এর ঠিক ঘণ্টাখানেক পরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আমাদের দেশে নানা কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। সামাজিক অবক্ষয় এর বড় কারণ। গ্রাম থেকে যারা শহরের বড় বড় দালানে পড়ালেখা করতে আসে, তাদের মনে অনেক স্বপ্ন থাকে। কিন্তু বিভিন্ন কারণে স্রোতের বিপরীতে টিকে থাকতে না পেরে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
তাছাড়া যাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে, তাদেরকে যদি কাউন্সেলিং করানো যায়, তাহলে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমানো যেত। আমাদের দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নেই কোনো কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা। যেটা একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খুব জরুরি। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন দেখবে না তো, কে দেখবেন? তবে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মনোবিদের সহযোগিতা নিতে পারে।
চিকিৎসক ও কাউন্সিলর অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া মনে করেন, 'অবন্তিকার আত্মহত্যা সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে, এখনও পর্যন্ত নারী অধিকার এবং নারী স্বাধীনতা কাগজে আছে কিন্তু মগজে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র বা শিক্ষক অপরাধ করলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। কতটুকু বেদনায় বিহ্বল থাকলে সদ্য পিতৃহারা মেয়েটি আত্মহণনকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নেয়, তা আমাদের অজানা। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের আবেগ অনেকটা কোকাকোলার বোতলের মতন। প্রথম কয়েকদিন ভস করে অনেক লেখালেখি হবে। তারপর আবার একদিন সকালবেলা পত্রিকা খুলে আরেক অবন্তিকার খবর আমরা দেখব। কাজেই নিজেকে প্রশ্ন করা জরুরি, আমার ছেলেকে কি আমি অবন্তিকার শিকারী হিসেবে গড়ে তুলছি?
বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৩ সালে মোট ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। এরমধ্যে নারী শিক্ষার্থীর হার বেশি, ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া গত বছর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছেলে ২০৪ জন, নারী ৩০৯ জন। সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ২০২৩ সালে ২২৭ জন স্কুল শিক্ষার্থী (৪৪ দশমিক ২০ শতাংশ) আত্মহত্যা করেন। কলেজ শিক্ষার্থী রয়েছেন ১৪০ জন (২৭ দশমিক ২ শতাংশ), বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৯৮ জন (১৯ দশমিক ১ শতাংশ) এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ৪৮ জন (৯ দশমিক ৪ শতাংশ)।
সমীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করা নারীদের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ আত্মহত্যা করেন অভিমানে, ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রেমঘটিত কারণে, ৮ দশমিক ৪ শতাংশ মানসিক ভারসাম্যহীনতায়, ৭ দশমিক ১ শতাংশ পারিবারিক কলহে, ৩ দশমিক ৯ শতাংশ যৌন হয়রানি, ৪ দশমিক ২ শতাংশ পড়ালেখার চাপে ও অকৃতকার্য হয়ে, ১ দশমিক ৬ শতাংশ পারিবারিক নির্যাতনে, শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ অপমানে এবং ২ দশমিক ৯ শতাংশ কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে আত্মহত্যা করেন।
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া বলেন, পরিবারের কারোর মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা গেলে, তাঁকে সময় দিন, তাঁর পাশে দাঁড়ান এবং তাঁর সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করুন। যেই কারণে তাঁর মাথায় আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসছে, সেটা সমাধানে যদি কেউ সাহায্য করতে পারে, তাঁর সাথে যোগাযোগ করুন। পাশাপাশি তাঁর সুস্থতা আর ভালোর জন্য পেশাগত কাউন্সেলিং বা চিকিৎসা পরামর্শ নিন।


জবির হোস্টেল ছেড়েও রেহাই পাননি অবন্তিকা
অবন্তিকার মৃত্যুতে মামলা, শিক্ষক দ্বীন ইসলাম ও আম্মান আটক
