ইউরোপে একটি যুদ্ধ চলছে। আরেকটি যুদ্ধ হবে হবে করছে। নিরাপত্তা এক বড় বিষয়ে পরিণত হয়েছে অঞ্চলটিতে। নিরাপত্তা জোট ন্যাটোতে ইউরোপের বড় দেশগুলোকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা দিতে হচ্ছে। সাথে আছে গাজা। ইসরায়েলের পরিচালিত সেই যুদ্ধে গাজায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সহায়তা পাঠাতে হচ্ছে ইউরোপকে। এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বেড়েছে জ্বালানির দাম। ফলে উভয় সংকট। এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ। এর মধ্যেই শোনা যাচ্ছে আমেরিকায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার বার্তা। সব মিলিয়ে ইউরোপের অর্থনীতির বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছেন তিন দেশের বর্তমান ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এক দশক আগে জার্মানিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে দেওয়া হয়েছিল অভাবিত সংবর্ধনা। চীনা বিনিয়োগের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে জার্মানির ডুইসবার্গের প্রশংসা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট শি। সে যাত্রায় তিনি চংকিং থেকে রাশিয়া হয়ে ইউরোপ গিয়েছিলেন, যা ইউরোপের শিল্প-বলয় হিসেবে পরিচিত। গত ফেব্রুয়ারিতে জার্মানিতে চীনের উপস্থিতি কিন্তু এক দশক আগের মতো তেমন উষ্ণ অভ্যর্থনা পায়নি। এবার জার্মানিতে ভিড়েছিল বিওয়াইডি এক্সপ্লোরার নাম্বার ওয়ান, যা বোঝাই ছিল তিন হাজার বা তারও বেশি ইলেকট্রিক গাড়িতে। চীনের ইলেকট্রিক গাড়ির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি থেকে এত গাড়ির আমাদনিতে বরং প্রমাদ গুনেছে জার্মান গাড়ি কোম্পানিগুলো।
হ্যাঁ, করোনার ধকলে চীনের অর্থনীতি বেশ সংকটের মধ্যে পড়েছে। গোটা বিশ্ব চীনের অর্থনীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, বিশ্বের প্রায় সব দেশ কোনো না কোনোভাবে চীনের অর্থনীতির সাথে যুক্ত। বিশেষত চীনের অবকাঠামো খাতের বিস্তার কিছুটা থেমে যাওয়ায় বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে দেশটির অর্থনীতি। এ অবস্থায় দেশটির প্রশাসন অন্য খাতগুলোকে চাঙা করার পদক্ষেপ নেয়। এরই অংশ হচ্ছে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মতো ভারী শিল্পে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। দেশের বিনিয়োগকারীদের এ খাতে অর্থলগ্নিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো উদ্যোগ নিয়েছে শি প্রশাসন। এর ফলও তারা পাচ্ছে। ব্রিটিশ সাময়িকি দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, চীনের গাড়ি নির্মাণ শিল্প রেকর্ড মুনাফা করেছে। এ মুনাফা বৃদ্ধির হার এখনো উর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় ইউরোপীয় ব্যবসায়ী নেতারা শঙ্কায় ভুগছেন। কারণ, চীন থেকে ইউরোপে ঢুকছে একের পর এক সর্বাধুনিক, অথচ সস্তা গাড়ি।
এই শঙ্কা কতটা তা বোঝা যাবে ইউরোপীয় কমিশনের দিকে তাকালে। গত ৫ মার্চ কমিশন চীন থেকে ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) আমদানিতে শুল্কারোপের ঘোষণা দেয়। তাদের ভাষ্য, বাজার প্রতিযোগিতার নিয়ম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। চীন তাদের ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাণে অন্যায্যভাবে ভর্তুকি দিচ্ছে। একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে ব্রিটেন। আগামী মে মাসে ফ্রান্স সফরের কথা রয়েছে প্রেসিডেন্ট শির। সে সময় বাণিজ্য ইস্যুতেই আলোচনা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের কারণে অন্য অনেক দেশও ভুগছে। এর মধ্যে ব্রাজিল ও ভারতের নাম উল্লেখ করা যায়। এ দুটি দেশই নিজেদের শিল্প খাতকে বাঁচাতে চীন থেকে আমদানি কমানোর পথে হাঁটতে শুরু করেছে। আমেরিকার সাথে সাবেক ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার বাণিজ্য যুদ্ধের কথা তো সবার মনে থাকার কথা। কিন্তু ইউরোপের ক্ষেত্রটি ভিন্ন। তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির বৈশ্বিক নীতি সহজে লঙ্ঘন করে না। ইউরোপের দেশগুলো একপেশে শুল্কারোপ সেভাবে করেনি কখনো। ইউরোপের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৪ শতাংশই পণ্য ও সেবা–বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা আমেরিকার প্রায় দ্বিগুণ। আর এই প্রবণতাতেই বিপাকে পড়েছে তারা।
সাথে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গোটা ইউরোপ অনেক দিন ধরেই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে ইউরোপের দেশগুলো যখন টেকসই জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, তখনই চীনের দিক থেকে ঢুকতে শুরু করেছে ইলেকট্রিক গাড়ি।
ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, ইউরোপে আগে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের গড় দাম যেখানে ছিল ২০ ইউরো বা ২২ মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০০ ইউরোতে। এর পুরো ধাক্কা স্বাভাবিকভাবেই লাগে অর্থনীতিতে। ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি সামাল দিতে সুদহার ৪ শতাংশে নিতে বাধ্য হয়। নেওয়া হয় আরও নানা পদক্ষেপ। কিন্তু তাতেও তেমন লাভ হয়নি। এখনো অঞ্চলটিতে বিদ্যুতের দাম আগের পর্যায়ের ধারেকাছেও আসেনি।
পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টার তথ্যমতে, ইউরোপের ছয়টি দেশে বিদ্যুতের গড় দাম এখন প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা ৬৫ ডলার। ফলে উচ্চমূল্যের এই জ্বালানির নেতিবাচক প্রভাব থেকে ইউরোপ বেরিয়ে আসতে পারেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো ব্যয়সংকোচনের পথে হাঁটছে। না হেঁটে উপায় কী? ইউক্রেন যুদ্ধ তো কেবল তাদের জ্বালানি সংকটেই ফেলেনি। সাথে আছে শস্যের সংকট, সাথে আছে সুদূরের সেই যুদ্ধে নিজেদের মিত্রতা প্রমাণের দায়শোধে করা বিপুল ব্যয়। সব মিলিয়ে বাজার ও অর্থনীতি–দুইই বেসামাল।
ইউরোপের দেশগুলোতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির চাকা শ্লথ হয়ে এসেছে। ২০১৯ সালের পর থেকে অঞ্চলটিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশ। আমেরিকায় এ হার দ্বিগুণ। আর ব্রিটেন ও জার্মানির কথা বিবেচনা করলে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার সত্যিকার অর্থে ঋণাত্মক হয়েছে। ফলে এক পুরোদস্তুর অনিশ্চয়তা চলছে সেখানে।
আমেরিকার অবস্থা অতটা বাজে নয়। বরং ভালো বলা চলে। মহামারির সময়টাতে আমেরিকার অর্থনীতি বরং এগিয়েছে। বিশেষত বড় টেক কোম্পানিগুলোর বদৌলতে বড় উল্লম্ফন দেখেছে দেশটি। কারণ, করোনার সেই সময় দেশে দেশে হওয়া লকডাউনের সময়টাতে মানুষ ডিভাইসের দিকে ঝুঁকেছিল। লকডাউনে হোম অফিস ও অ্যাওয়ে ক্লাসের ব্যবহার ছাড়া আর কোনো উপায় বিভিন্ন শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে ছিল না। সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছে মার্কিন টেক কোম্পানিগুলো। আর এর সুফল পেয়েছে দেশটির অর্থনীতি।
এখন এই আমেরিকার ঘটনাপ্রবাহও আবার ইউরোপকে চিন্তিত করে তুলেছে। কারণ, দেশটির আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে তাঁর অবস্থানও বেশ ভালো বলেই মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্প আবার জয় পেতে পারেন এবং ওভাল অফিসের চাবি আবারও তাঁর হাতেই উঠতে পারে।
এই ডোনাল্ড ট্রাম্পই মূলত ইউরোপের জন্য মাথাব্যথার কারণ। গেল মেয়াদে ইউরোপের সাথে ঐতিহাসিক সব সম্পর্ককে রীতিমতো উড়িয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ন্যাটো থেকে শুরু করে নাফটা–সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা নতুন করে লেখানোর পথে হেঁটেছিলেন তিনি।
ফলে ইউরোপের নেতৃবৃন্দ, বিশ্লেষক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এক ত্রিমুখী আক্রমণের আশঙ্কায় আছে। এর মধ্যে দুটি হচ্ছে চীন ও রাশিয়ার তরফ থেকে। চীনের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সেই সূত্রে জ্বালানি বাজারের সংকট তো আছেই। সাথে এখন নভেম্বরের ভোটের বাক্সকে কেন্দ্র করে আমেরিকা থেকে চোখ রাঙাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারণ, তিনি ক্ষমতায় এলে ইউরোপের পণ্য আমেরিকায় ঢোকার ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কারোপের আশঙ্কা রয়েছে। গেল মেয়াদেই তিনি আমেরিকার সব ধরনের আমদানিতে ১০ শতাংশ হারে শুল্কারোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা থেকে তাঁর পশ্চিমা মিত্ররাও বাদ যাবে না। পাশাপাশি আছে বাণিজ্য সমন্বয়ের বিষয়। এই সমন্বয় ও শুল্কই বেশি ভাবাচ্ছে ইউরোপকে। কারণ, আমেরিকার সাথে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশের বাণিজ্যে এগিয়ে থাকে ইউরোপ। ফলে ট্রাম্প ইউরোপের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছেন।
ইউরোপ এ ধরনের পরিস্থিতির মুখে আগে পড়েনি, এমন নয়। এর আগে ২০০১ সালে চীন যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেয়, তখন পশ্চিমা উৎপাদনশিল্প ধাক্কা খেয়েছিল। সে যাত্রায় তারা উন্নত প্রযুক্তির নানা পণ্য ও সে সম্পর্কিত নানা সরঞ্জাম চীনে রপ্তানি করে নিজেদের অর্থনীতিকে সামাল দিতে পেরেছিল। এবার সে সুযোগটিও থাকছে না তাদের সামনে। কারণ, প্রেসিডেন্ট শি এখন মনযোগ দিয়েছেন উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর পণ্যের দিকেই। এর মধ্যে যেমন ইলেকট্রিক গাড়ি আছে, তেমনি আছে রোবট, উন্নত রেলওয়ে প্রযুক্তি ইত্যাদি। এ ছাড়া ছোট থেকে বড় সব ধরনের প্রযুক্তি পণ্যের দুনিয়াতে ছড়ি ঘোরানোর পরিকল্পনা করছে বেইজিং। ফলে রপ্তানিবাজার হিসেবে ইউরোপের তালিকা থেকে অনেক দেশই ঝরে পড়ছে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের বাজারটিও তারা হারাচ্ছে। কারণ, চীনের তৈরি পণ্য সস্তা। আর প্রযুক্তি দুনিয়ায় ছড়ি ঘোরানোটা প্রেসিডেন্ট শি জাতীয় নিরাপত্তা ও গৌরবের সাথে মিলিয়ে দেখছেন। ফলে এবারের চীনা প্রবেশটি ঠিক আগের মতো নয়। তাকে সামাল দিতে ইউরোপের হাতে তেমন বড় কোনো বিকল্পও নেই।
ফলে একদিকে আছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও তাঁর নীতি, অন্যদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, তাঁর পরিচালিত যুদ্ধ ও নীতি এবং অতি অবশ্যই জ্বালানি বাজার। আর আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাণিজ্য বিষয়ে যার কাছ থেকে ছাড় আদায় করা ভীষণ কঠিন। ফলে ইউরোপ এই ত্রিমুখী সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের অর্থনীতি নিয়ে দুর্ভাবনায় ডুবে আছে। এই দুর্ভাবনা থেকে বাঁচানোর কোনো দাওয়াইয়ের খোঁজ এখনো তারা পায়নি। কবে পাবে, তাও এখনো জানে না।


ট্রাম্পের নির্দেশে চীনের বিরুদ্ধে যেভাবে গোপন অভিযান চালায় সিআইএ
হাভানা সিনড্রোম কি রাশিয়ার গোপন অস্ত্র?
