ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুটি ফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও দুটিতে দেখা যাচ্ছে, দুজন জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করছেন এবং বিরোধীদল কংগ্রেসকে ভোট দিতে জনগণকে অনুরোধ করছেন।
একটি ৩০ সেকেন্ড এবং আরেকটি ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিও। সেখানে বলিউড তারকা আমির খান ও রণবীর সিং বলছেন, ‘মোদি এর আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোরও সমাধান করতে পারেননি।’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে বানানো ভিডিওটি শেষ হয়েছে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক ও স্লোগান দিয়ে—‘ভোট দিন ন্যায়কে, ভোট দিন কংগ্রেসকে’।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত সাত দিনে এই দুই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঁচ লাখেরও বেশিবার দেখা হয়েছে।
বলে রাখা প্রয়োজন, গত ১৯ এপ্রিল থেকে ভারতে শুরু হয়েছে সাত পর্বের লোকসভা নির্বাচন। দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২৬ এপ্রিল, তৃতীয় দফা ৭ মে, চতুর্থ দফা ১৩ মে, পঞ্চম দফা ২০ মে ও ষষ্ঠ দফার ভোট হবে ২৫ মে। ফল প্রকাশ করা হবে ৪ জুন। এরপর নির্বাচনে জয়ীদের নিয়ে গঠিত হবে ১৮তম লোকসভা।
এই নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমতা প্রযুক্তি যে ভয়াবহ প্রভাব রাখবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এরইমধ্যে আমেরিকা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে এআই এবং এআইনির্ভর নকল ছবি–ভিডিওগুলো তাদের অপশক্তির দোর্দন্ড প্রতাপ দেখিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চীন এ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতে নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা করছে। ‘স্টর্ম ১৩৭৬’ নামে একটি বেইজিং সমর্থিত গ্রুপ তাইওয়ানের নির্বাচনের সময় অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে তারা ইউটিউবে নির্বাচনী প্রার্থী টেরি গৌ-এর নকল ভিডিও পোস্ট করেছিল।
এখন ভারতের নির্বাচনী প্রচারাভিযানগুলোর দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায়, রাজনৈতিক দলগুলো ঘরে ঘরে প্রচারের দিকে বেশি মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছে। আর এ কাজের জন্য প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াটসঅ্যাপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, মোদি সরাসরি অনেকের নাম ধরে ধরে ভোট চাইছেন। ভিডিওটি তাদের হোয়াটসঅ্যাপের পাঠানো হচ্ছে, যারা মোদি সরকারের সুবিধাভোগী। এবং আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, ভিডিওটি যাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে, তারা সেটি নিজ নিজ ভাষায় শুনতে পাচ্ছেন!
বলাই বাহুল্য, ভিডিওর নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিটি আসল নন। ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নরেন্দ্র মোদির ডেমো ক্লিপ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কে বা কারা ভিডিওটি তৈরি করেছে, কোথা থেকেই বা ভোটারদের কাছে এসব পাঠানো হচ্ছে, সে ব্যাপারে কোনও তথ্য জানা যায় না।
নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার ২০১৯ সালের নির্বাচনের সময় থেকেই শুরু হয়। এ বছরের নির্বাচনে সেটি মহাপ্লাবনের ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। এবং এবারের নির্বাচনী প্রচারের নতুনত্ব হচ্ছে, ডিপফেক কিংবা এআই তথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।
কংগ্রেসের মুখপাত্র সুজাতা পাল গত ১৭ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রণবীর সিংয়ের সেই নকল ভিডিওটি শেয়ার করেন। ভিডিওটি গত শনিবার বিকেল পর্যন্ত ২ হাজার ৯০০ শেয়ার হয়েছে এবং ভিডিওটিতে ৮ হাজার ৭০০টি লাইক পড়েছে। আর ‘ভিউ’ হয়েছে ৪ লাভ ৩৮ হাজার।
সুজাতা পাল রয়টার্সকে বলেন, ‘ভিডিওটির মানুষটি দেখতে রণবীর সিংয়ের মতো। আর ভিডিওটিতে সৃজনশীলতা (ক্রিয়েটিভি) রয়েছে। তাই এক্সে শেয়ার করেছি।’
ভিডিওগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য জানতে আমির খান ও রণবীর সিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। দুই অভিনেতাই রয়টার্সকে বলেছেন, ‘ভিডিওগুলো ভুয়া।’ এ ছাড়া অন্তত আটটি ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইট বলেছে, ভিডিওগুলো নকল। রয়টার্সের ডিজিটাল যাচাইকরণ ইউনিটও ‘ভিডিওগুলো আসল নয়’ বলে নিশ্চিত হয়েছে। তবে রয়টার্স বলেছে, ভিডিওগুলো কে বা কারা তৈরি করেছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেনি তারা।
ভিডিও দুটি ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমির খান ও রণবীর সিং—দুজনেই। গত শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রণবীর সিং লিখেছেন—‘বন্ধুরা, ডিপফেক থেকে সাবধান থাকুন।’
এসব ভিডিওর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয় ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রযুক্তি টিমের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বলে জানিয়েছে এই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।
পুলিশি তদন্ত শুরু
ভারতে অন্তত ৯০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর ভোটার রয়েছে ১০০ কোটি। গবেষণা সংস্থা ইসয়া সেন্টার ও ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট বিজনেস স্কুল পরিচালিত একটি যৌথ জরিপে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন ভারতীয় প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে।
সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে ভারতীয়দের জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে সন্দেহের কোনও অবকাশই নেই। তাই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকেই।
রয়টার্স বলছে, ডিপফেক ভিডিওগুলোর কিছু সংস্করণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্লক করা হয়েছে, তারপরও শনিবার এক্সে অন্তত ১৪টি ভিডিও দেখা গেছে। ফেসবুক ভিডিও দুটি মুছে ফেলার দাবি করলেও একটি ভিডিও এখনও ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে।
এসব ফেক ভিডিওর মাধ্যমে ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে মর্মে আমির খানের পাক্ষ থেকে গত ১৭ এপ্রিল অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুম্বাইয়ে একটি মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ‘এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু হয়েছে।’
একজন মৃত পিতার এআই ভিডিও
এবারের লোকসভা নির্বাচনে ভারতের রাজনীতিবিদরা এআই–এর ব্যবহারকে কোন পর্যায়ে উন্নীত করছেন, তা কল্পনাও করা যায না। দক্ষিণ ভারতের কংগ্রেস নেতা বিজয় বসন্তের মুখপাত্র জানান, তার দল এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুই মিনিটের একটি ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিল। ভিডিওটিতে দেখা যায়, বিজয়ের পরলোকগত পিতা জনপ্রিয় রাজনীতিক এইচ বসন্তকুমার ছেলের পক্ষে ভোট চাইছেন। তিনি পুত্রকে উদ্দশ্য করে বলছেন, ‘আমার শরীর তোমাকে ছেড়ে গেলেও আমার আত্মা তোমার চারপাশে রয়েছে।’
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া–মার্কসবাদী (সিপিএম) ইউটিউবে একটি ভিডিও পোস্ট করেছে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি উপস্থাপক সামান্থা ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় শাড়ি পরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের সমালোচনা করছেন, ঠিক যেন টেলিভিশন চ্যানেলের রক্ত–মাংসের উপস্থাপক কথা বলছেন। ভিডিওটি অল্প সময়ের মধ্যে ১২ হাজারবার দেখা হয়েছে।
এ ধরনের ভিডিওর ব্যাপারে জানতে চাইলে সিপিএম কোনও মন্তব্য করেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বেশ উৎসবমুখর পরিবেশে যে ‘ডিপফেক ভিডিও’ চলছে, তা নিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। যেটি আছে, সেটি হচ্ছে উদ্বেগ। কারণ, এসব ভুয়া ভিডিও বন্ধের তেমন তৎপরতা নেই। ফেসবুক–এক্স বলছে, ভিডিওগুলো ব্লক করা হয়েছে, কিন্তু আদতে সেগুলো মহাসমারোহে চলছে। পুলিশ বলছে, তদন্ত শুরু হয়েছে, কিন্তু শেষ হবে কবে, সেটি খোদ সৃষ্টিকর্তাও সম্ভবত জানেন না। আর রাজনৈতিক দলগুলো তো মুখে কুলুপ এঁটেই আছে, যেন এসব ভুয়া ভিডিও কে তৈরি করছে, কেন তৈরি করছে, কেন প্রচার করছে, তা নিয়ে কথা বললে প্রায়শ্চিত্যহীন পাপ হয়ে যাবে! যেন বা মোদি–আমির–রণবীর সিংয়ের নকল ভিডিওগুলো ভূতে বানাচ্ছে!
সুতরাং ডিপফেক চলছে, চলবে।



