ফিলিস্তিনকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। ফ্রান্সসহ আরও কিছু দেশ ভবিষ্যতে একই পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ কী?
আন্তর্জাতিকভাবে একটি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কিছু নিয়মকানুন আছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, স্থায়ী জনসংখ্যা, সরকার এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা থাকতে হবে। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে এই শর্তগুলো পুরোপুরি পূরণ না হলেও, আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, রাষ্ট্র হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্তই পূরণ করে ফিলিস্তিন। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে যেসব দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে, তারা মূলত ফিলিস্তিনি জনগণের সার্বভৌমত্বের অধিকারকে সমর্থন করছে।
এই স্বীকৃতির ফলে কী কী পরিবর্তন আসবে?
পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের এই স্বীকৃতি ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। এতে করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ একা হয়ে যাবে, কারণ তারা এখনো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।
এই স্বীকৃতি ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য নতুন করে আলোচনা শুরুর সুযোগ তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশ আশা করে যে এই স্বীকৃতি শান্তি আলোচনার পথে নতুন গতি দেবে। যে দেশগুলো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারা ফিলিস্তিনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবে। এর ফলে ফিলিস্তিন বিশ্বজুড়ে আরও বেশি দূতাবাস খুলতে পারবে।
এই পদক্ষেপ ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়িয়ে দেবে, কারণ এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক কার্যকলাপ নিয়ে অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতি খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। কারণ ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এখনও ইসরায়েলের সামরিক দখলে রয়েছে। পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন এবং হামাস-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা অনেক কমে গেছে।
প্রতিক্রিয়া
অনেক ফিলিস্তিনি এই স্বীকৃতিকে স্বাগত জানালেও, অনেকেই মনে করেন এই পদক্ষেপ অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে। পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপন এবং গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে অনেকে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে হতাশ। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই স্বীকৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং একে ‘হামাসের দানবীয় সন্ত্রাসবাদের পুরস্কার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রও এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বলেছে, এতে হামাস আরও উৎসাহিত হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি কী
ফিলিস্তিন জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের জন্য আবারও চেষ্টা করেছে। তবে নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে এটি সম্ভব হয়নি। তবে সাধারণ পরিষদে তারা অতিরিক্ত কিছু অধিকার পেয়েছে, যেমন সদস্য রাষ্ট্রের পাশে বসার অনুমতি। আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং নরওয়েসহ বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এই স্বীকৃতি মূলত একটি রাজনৈতিক ও প্রতীকী পদক্ষেপ। যদিও এর ফলে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে রাতারাতি বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না, তবে এটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থনের একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত দেয়। ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে এবং ফিলিস্তিনিদের দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের জন্য নতুন করে আশা জাগায়।
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি অভিযান প্রায় দুই বছর হতে চলল। এ পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত লাখের বেশি। সেই সঙ্গে সর্বাত্মক অবরোধে গাজা এখন দুর্ভিক্ষের মুখে। এই মানবিক সংকট বন্ধের লক্ষ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথাই বলে আসছে আন্তর্জাতিক মহল।
১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটেন একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে হয়তো ইসরায়েলকে অনুধাবন করানো যাবে যে, তার দীর্ঘদিনের মিত্ররাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে হয়তো নেতানিয়াহু যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হতে পারেন। আমেরিকা যেহেতু যথেষ্ট চাপ দিচ্ছে না, তাই ইউরোপের প্রভাবশালী দুই কূটনৈতিক শক্তির পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পদক্ষেপের পেছনে যে কৌশল, তা দুর্বল। নেতানিয়াহু সরকার বরং আরও অনড় হয়ে উঠতে পারে। ইসরায়েল মনে করে, আজ যদি কোনো শর্ত মেনে নেওয়া হয়, কাল নতুন শর্ত আসবে। এমন ধারণা থেকে নেতানিয়াহু সরকার ‘এখন যা করার, তা করে নেওয়াই ভালো’– এই নীতিতে চলতে পারে।
স্বীকৃতি নিয়ে আরেকটি প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সমাধানের জায়গা কি থাকবে? কখনো যদি দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক আলোচনা আবার শুরু হয়, তখন দুই পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে। কিন্তু স্বীকৃতিকে এখন ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হলে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে কিছু আদায় করার কোনো কৌশল আর থাকবে না।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমঝোতা যেকোনো সময় সীমান্ত ও নিরাপত্তার মতো ইস্যুতে আটকে যেতে পারে। এমনকি ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস পুরোপুরি আপস করবেন বলেও মনে হচ্ছে না। বহুবার নির্বাচন পিছিয়ে দিয়েছেন তিনি এবং এখন পুরো ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিত্ব করার বৈধতাও তাঁর হাতে নেই।


ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিল যুক্তরাজ্য-অস্ট্রেলিয়া-কানাডা
