প্রতিবেশী নেপাল, বাংলাদেশ ও মাদাগাস্কারের মতো আফ্রিকার দেশগুলোতে যখন তরুণ প্রজন্ম (জেন জি) সরকার পতনের মতো বিক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে, তখন ভারতের প্রায় ৩৭ কোটি তরুণ নীরব কেন–তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনীতি, দুর্নীতি এবং বৈষম্য সম্পর্কে অবহিত হলেও ভারতের তরুণরা এখনো বড় ধরনের কোনো গণবিক্ষোভে নামেনি। সম্প্রতি লাদাখের মতো জায়গায় বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিভিন্ন কারণে ভারতের জেন জি একজোট হয়ে প্রতিবাদে নামা থেকে বিরত।
গত মাসে নেপালে তরুণ বিক্ষোভকারীরা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি সরকার পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। মাদাগাস্কারে তরুণদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ায় চাকরির সুযোগ ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে তরুণদের বিক্ষোভের মুখে সরকারকে পিছু হটতে হয়। বাংলাদেশে গত বছর চাকরিতে কোটা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলা আন্দোলনে সরকারের পতন হয়।
আর সম্প্রতি ভারতের লাদাখে বিক্ষোভ হয়েছে। এ ছাড়া কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তরুণদের ভোট জালিয়াতি রোধের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে নেপাল বা বাংলাদেশের মতো ভারতে ব্যাপক বিক্ষোভের সম্ভাবনা এখনও দেখা যায়নি। দিল্লির পুলিশ প্রধান তরুণদের সম্ভাব্য বিক্ষোভের মোকাবিলায় পরিকল্পনা তৈরি করতে বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন।
কারণ কী
বিশেষজ্ঞ সুধাংশু কৌশিকের মতে, ভারতে তরুণরা আঞ্চলিক, ভাষাগত ও জাতিগত পরিচয়ে বিভক্ত। ফলে, একীভূত জাতীয় আন্দোলন কঠিন হয়ে পড়ে। বিহারের এক সাংবাদিক বিপুল কুমারের মতে, ভারতের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকৃত, আর তাই তরুণদের ক্ষোভও একমুখী নয়। যেমন, শহুরে তরুণদের ইস্যু চাকরির সুযোগ ও নগর উন্নয়ন, দলিত তরুণদের ইস্যু জাতিগত বৈষম্য, আর তামিলভাষী তরুণদের ইস্যু ভাষা ও আঞ্চলিক অধিকার।
গুজরাট ও হরিয়ানায় উচ্চবর্ণের তরুণরা সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলন করে, অন্যদিকে তামিলনাড়ুতে তরুণরা জাল্লিকাট্টু নামক ঐতিহ্যবাহী খেলা নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে।
এ ছাড়া আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে দেশবিরোধী তকমা। ২৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ধৈর্যা চৌধুরী বলেন, ‘দেশবিরোধী’ তকমার ভয় তরুণদের প্রতিবাদ থেকে দূরে রাখে। কিছু রাজনীতিবিদ ও টিভি চ্যানেল ভিন্নমত দমনে এই শব্দ ব্যবহার করে। একসময়কার প্রাণবন্ত বিতর্ক কেন্দ্র ছিল কিছু শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে এখন প্রতিবাদ নিষেধ। গবেষক হাজারা নাজিব বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সেই পুরোনো তেজ হারিয়ে ফেলেছে।’
যদিও বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত তুলনামূলকভাবে ভালো করছে, তবুও বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেকে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩৮% নতুন ১৮ বছর বয়সী ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, ২৯% তরুণ প্রথাগত রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন। সিএসডিএস-লোকনীতি’র এক জরিপে দেখা যায়, হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি দল ২০১৯ সালে তরুণদের মধ্যে ৪০% সমর্থন পেলেও, ২০২৪ সালে তা কমেছে।
১৯৭০-এর দশকের ইন্দিরা গান্ধী বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০১০-এর দশকের দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ এবং ২০১২-এর দিল্লি গণধর্ষণ প্রতিবাদ–তরুণরা রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ দিয়েছে। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে তরুণদের ব্যাপক প্রতিবাদ হয়, তবে এর পরিণতি ছিল মারাত্মক। ২০১৯ সালে দিল্লি ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ছাত্রনেতা উমর খালিদ পাঁচ বছর ধরে কারাগারে আছেন, যা প্রতিবাদীদের নিরুৎসাহিত করেছে।
সমাজবিজ্ঞানী দীপঙ্কর গুপ্তের মতে, তরুণদের শক্তি ক্ষণস্থায়ী এবং প্রতিটি প্রজন্ম তার নিজস্ব কারণ তৈরি করে। ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোর পরিস্থিতি তুলনা করে দেখা যায়, তরুণরা সরকার পতন ঘটাতে পারলেও তাদের জন্য স্থায়ী পরিবর্তন আনা কঠিন হতে পারে। বর্তমানে ভারতের জেন জিরা বিদ্রোহী নয়, বরং সতর্ক। তাদের অসন্তোষ চাপা থাকলেও আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।



