ইরান যুদ্ধের কারণে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না নিয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, স্মরণকালে এমন সংকট দেখেননি তাঁরা।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। তবে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। সমস্যা পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে। সাধারণত এই দুই প্রকারের জ্বালানি ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলাচলে বেশি ব্যবহৃত হয়।
ডিজেলের পুরোটাই আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু পেট্রোল ও অকটেন দেশেই উৎপাদন হয়। বাংলাদেশে নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট থেকে দৈনিক প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যারেল পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে তেলের মজুত এবং উৎপাদন সক্ষমতা মিলিয়ে পেট্রোল-অকটেনের এমন সংকট হওয়ার কথা নয়। কারণ বাংলাদেশে পেট্রোল ও অকটেনের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের সঙ্গে যে কনডেনসেট পাওয়া যায়, সেটি প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার একটা বড় অংশ উৎপাদন করা হয়।
বাংলাদেশে বছরে পেট্রোলের চাহিদা ৪ লাখ ৬২ হাজার টন ও অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। বাংলাদেশে নিজস্ব উৎপাদন ও ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধন করে পেট্রোল উৎপাদন করে। ফলে এটি আমদানির প্রয়োজন হয় না।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি, অর্থাৎ মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক পেট্রোল উৎপাদন হয়েছে। এ ছাড়া অকটেনও হয়েছে মোট চাহিদার প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। এ বিবেচনায় বিশ্ববাজার থেকে তেল আমদানি পুরো বন্ধ হয়ে গেলেও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে পেট্রোল ও অকটেনের দিক থেকে একেবারে জ্বালানিশূন্য হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই।
এর মধ্যে পেট্রোবাংলার কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্টে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিক টন অকটেন উৎপাদন করেছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরান যুদ্ধ এবং তেলের মজুত নিয়ে নানা খবরে আতঙ্ক থেকেই পেট্রোল ও অকটেনের অস্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিজস্ব কনডেনসেট থেকে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন করে সরকারি কোম্পানি সিলেট গ্যাস ফিল্ডের দুটি প্ল্যান্ট এবং চারটি বেসরকারি রিফাইনারি। দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জে অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট বা সিআরইউ।
হবিগঞ্জের প্ল্যান্টে বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বিভাজন করে ৬০০ ব্যারেল বা প্রায় ৭৪ মেট্রিক টন অকটেন, তিন হাজার ৪৫০ ব্যারেল বা ৪২০ মেট্রিক টন পেট্রোল, ১৫০ ব্যারেল বা ২০ মেট্রিক টন ডিজেল ও ১০০ ব্যারেল বা ১৩ মেট্রিক টন কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল বা ১.৫ মেট্রিক টন এলপিজি উৎপাদন হচ্ছে।
এসজিএফএলের লিকুইড পেট্রোলিয়াম মার্কেটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জীবন শান্তি সরকার বিবিসি বাংলাকে জানান, এসজিএফএল-এর প্ল্যান্ট দেশীয় কনডেনসেট থেকে দৈনিক চার হাজার ব্যারেলের বেশি পেট্রোল এবং অকটেন উৎপাদন করছে।
এই তেল দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার ৩৩-৩৫ শতাংশ এবং অকটেনের চাহিদার ৭-৮ শতাংশ, কেরোসিনের চাহিদার ৭ শতাংশ এবং ডিজেলের চাহিদার ০.২ শতাংশ পূরণ করতে পারে।
বাংলাদেশে সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ছাড়াও চারটি বেসরকারি রিফাইনারি দেশীয় কনডেনসেট থেকে প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল উৎপাদন করে।
জীবন শান্তি সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশে ফিনিশড প্রোডাক্ট হিসেবে পেট্রোল আমদানি করার প্রয়োজন হয় না। দেশে উৎপাদিত কনডেনসেট থেকে দেশের মোট পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। আর বাকিটা ইআরএল (ইস্টার্ন রিফাইনারি লি.) তারা ক্রুড অয়েল থেকে এবং বেসরকারি যারা আছে তারা ইমপোর্টেড কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের চাহিদা পূরণ করছে।’
অকটেনের চাহিদা কতটা পূরণ হয় সে হিসাব দিয়ে তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি প্রায় ৬২ শতাংশ অকটেন উৎপাদন করেছে, বাকি চাহিদা দেশীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হয়েছে।
নিজস্ব কনডেনসেট থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ড। সিলেটের দুটি প্ল্যান্টে দৈনিক সাড়ে সাত হাজার ব্যারেল কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। তবে গ্যাসের উৎপাদন ও কনডেনসেট উৎপাদন কমে গিয়ে এখন প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট বরাদ্দ পায় সিলেট গ্যাস ফিল্ডের কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেল সংকট সৃষ্টির পর পেট্রোবাংলার নির্দেশনা অনুযায়ী হবিগঞ্জ সিআরইউতে দৈনিক অকটেন উৎপাদন ১০০ ব্যারেল বৃদ্ধি করে ৭০০ ব্যারেল উৎপাদন করা হচ্ছে এবং সপ্তাহে পাঁচ দিনের পরিবর্তে সাত দিন লরিতে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। হবিগঞ্জে উৎপাদিত পেট্রোল-অকটেন সিলেট অঞ্চল এবং রংপুর, পার্বতীপুর ও বাঘাবাড়ি এলাকায় সরবরাহ করা হয়।
পেট্রোল-অকটেনের চাহিদা কি হঠাৎ বেড়ে গেল?
বর্তমানে দেশে অকটেন ও পেট্রোলের সংকটের মূল কারণ অতিরিক্ত চাহিদা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদেরও অনেকে অবৈধ মজুত করার চেষ্টা করছেন, প্রয়োজন ছাড়াও বেশি কিনছেন অনেকে।
সরকার বলছে, স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় মজুত ও তেল আমদানি করা হচ্ছে। মে মাস পর্যন্ত সব ধরনের তেলের মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে গ্রাহকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্পগুলোতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলেও জানান পাম্প মালিকেরা।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, মানুষ অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত করার কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন আমি ৫-৬ হাজার লিটার তেল বিক্রি করতাম। এখন আমার সেই ডিমান্ড হয়ে গেছে ২০-৩০ হাজার লিটার। সবাই গাড়ির তেলের ট্যাংক ফুল করতে চাচ্ছে। একারণে একটা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে।’
পেট্রোল ও অকটেনের মজুত এবং উৎপাদন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে পেট্রোল-অকটেনের এই চাহিদা অস্বাভাবিক। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম বিবিসি বাংলাকে জানান, বাংলাদেশে কনডেনসেটের উৎপাদনও কমেছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রশিদপুর, হবিগঞ্জ, বিবিয়ানা ও সিলেটের কয়েকটি ফিল্ড থেকে কনডেনসেট আসে। বিবিয়ানার উৎপাদন কমে গেছে। সুতরাং আমাদের নিজস্ব সরবরাহ থেকে পেট্রোলটা মোটামুটি মেটানো যাবে। তবে অকটেন অবশ্যই আমদানি করতে হবে। আমরা জানলাম আগামী মাসের জন্য অকটেন যা প্রয়োজন তার দ্বিগুণ আসছে। সুতরাং গাড়ির লাইন আমরা যেটা দেখছি এটা অবশ্যই প্যানিক পারচেজ।’
সরকার কী বলছে?
সরকার জানাচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের যথেষ্ট মজুত রয়েছে। চাহিদা পূরণে আরও কেনা হচ্ছে। মে মাস পর্যন্ত তেলের চাহিদা পূরণ করতে বেশি দামে তেল আমদানি করা হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
ইরান যুদ্ধের কারণে সংকট নিরসনে পদক্ষেপ উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী প্রবলেম হয়েছে দেখেই তো আমি বেশি দাম দিয়ে সিঙ্গাপুর থেকে তেল এনে স্টক করছি।’
মে মাস পর্যন্ত চলার মতো জ্বালানি তেলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘আরও জাহাজ আসবে, আরও তেল আসবে। সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ পড়লেও তেলের সরবরাহ ঠিক রাখা হচ্ছে। আর সেই সাপ্লাইকে বাধাগ্রস্ত করছে কালোবাজারিরা।’
ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, সিরাজগঞ্জ জেলায় ফুয়েল কার্ড, রাজশাহীতে গাড়ির জোড় ও বেজোড় নম্বর অনুযায়ী আলাদা দিনে তেল সরবরাহের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড চালু করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের তো প্রবলেম বাইক। আমরা ঢাকাতে কিউআর কোড করছি। ওই কিউআর কোড ধরলে কী পরিমাণে তেল পাওয়ার কথা সে পেয়ে যাবে। সারাদিন অন্য কোনো পাম্পে গিয়ে আর তেল পাবে না। দেশে অভিযান পরিচালনা করে তেলের অবৈধ মজুত উদ্ধার করা হচ্ছে। সব পেট্রোল পাম্পে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি ও সমন্বয় করতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মজুতের কোনো অসুবিধা নেই। ডিমান্ড হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। সরকার এই মুহূর্তে দৈনিক ১৬০ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। আমরা তেলের দাম এ মাসেও বাড়ালাম না। জনগণ যদি একটু সাশ্রয়ী হয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কেনে, তাহলে সাপ্লাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’



