বাংলাদেশ থেকে আর্জেন্টিনার দূরত্ব ১৭ হাজার কিলোমিটার, আর ব্রাজিলের প্রায় ১৬ হাজার। ভৌগোলিক কোনো মিল তো নেই-ই, নেই রক্তের কোনো সম্পর্ক। অথচ প্রতিবার বিশ্বকাপ এলেই এই পুরো দেশটা যেন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। চায়ের দোকান থেকে ফেসবুক, সবখানেই চলে কথার যুদ্ধ। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই দ্বৈরথের শুরুটা ঠিক কীভাবে হলো? আজ আমরা জানব ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা এল ক্লাসিকোর সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাস!
বিরোধের শুরু যখন ভূমি দিয়ে
অনেকেই ভাবেন এই লড়াইয়ের শুরু বুঝি ফুটবল দিয়ে। কিন্তু না! এর পেছনে রয়েছে শত বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক রেষারেষি। বহু বছর আগে যখন ইউরোপীয়রা দক্ষিণ আমেরিকায় কলোনি স্থাপন করতে আসে, তখন থেকেই শুরু হয় মাটির দখল নিয়ে রক্তক্ষয়ী লড়াই। স্প্যানিশরা দখল করে আর্জেন্টিনা আর পর্তুগিজরা চেপে বসে ব্রাজিলে। ১৮২৫ সালের কথা; এই দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় যুদ্ধ, যা ইতিহাসে আর্জেন্টাইন-ব্রাজিলিয়ান যুদ্ধ নামে পরিচিত। প্রায় তিন বছর ধরে চলা সেই যুদ্ধের ক্ষত আজও দুই দেশের সংস্কৃতিতে রয়ে গেছে। আর্জেন্টিনার মানুষ কখনো পর্তুগিজ ভাষা শিখতে চায় না, আর মাঠের গ্যালারিতে আর্জেন্টাইনদের উগ্র স্লোগানের বিপরীতে ব্রাজিলিয়ানরা বরাবরই নিজেদের বৃহত্তর অর্জনের গল্প শুনিয়ে খোঁচা মারে। অর্থাৎ, ফুটবল মাঠে নামার বহু আগেই এই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক ছিল দা-কুমড়ো।
শতবর্ষ ধরে চলা মহাযুদ্ধ
এই রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক বৈরিতা যখন ফুটবলের সবুজ ঘাসে এল, তখন তা রূপ নিল এক মহাযুদ্ধে। ১৯১৪ সাল, আজ থেকে ১১২ বছর আগে বুয়েনস এইরেসে প্রথমবার আন্তর্জাতিক ম্যাচে মুখোমুখি হয় এই দুই পরাশক্তি। প্রথম ম্যাচেই ৩-০ গোলে ব্রাজিলকে উড়িয়ে বিজয় নিশান উড়িয়েছিল আর্জেন্টিনা। এরপরের ইতিহাস শুধু ফুটবলীয় জাদুর নয়, বরং মাঠের মারামারি আর বিতর্কের!
১৯২৫ সালের কোপা আমেরিকা চলার সময় ব্রাজিলের ফ্রিডেনরিচকে লাথি মারেন আর্জেন্টিনার মাত্তিস, জবাবে ফ্রিডেনরিচ চালান ঘুষি! মাঠের সেই মারামারি গ্যালারির ৩০ হাজার দর্শকের মধ্যে দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩৭ সালে আরেক ম্যাচে আর্জেন্টিনার এক সমর্থক বর্ণবাদী গালি দেন ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়দের। ম্যাচ এক্সট্রা টাইমে গড়ালে আর্জেন্টিনার এক বিতর্কিত গোলের প্রতিবাদে খেলা শেষ হওয়ার আগেই মাঠ ছেড়ে চলে যায় ব্রাজিল দল! ১৯৩৯ সালের এক ম্যাচে পেনাল্টি বিতর্ক নিয়ে পুলিশ পাহারায় মাঠ ছাড়তে হয়েছিল আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে গোলরক্ষক ছাড়াই ফাঁকা জালে পেনাল্টি শট নিয়েছিল ব্রাজিল। এমনকি ১৯৯১ সালের কোপা আমেরিকাতেও এক ম্যাচেই রেফারিকে দেখাতে হয়েছিল ৫টি লাল কার্ড।
হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল
তবে এই দুই দলের লড়াই সবচেয়ে নাটকীয় রূপ নেয় বিশ্বকাপের মঞ্চে। সব ধরনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ মিলিয়ে আর্জেন্টিনা জয়ের দিক থেকে সামান্য এগিয়ে থাকলেও, বিশ্বকাপের মঞ্চে কিন্তু দাপট ব্রাজিলের। ৪ বারের দেখায় ব্রাজিল জিতেছে ২ বার, আর্জেন্টিনা ১ বার। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্ক্যান্ডালটা ঘটেছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। নকআউট পর্বের সেই ম্যাচ ঘিরে ফুটবল ডিকশনারিতে জন্ম নেয় ‘হলি ওয়াটার স্ক্যান্ডাল’। ম্যাচের হাফটাইমে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার ব্রাংকো তৃষ্ণা মেটাতে আর্জেন্টিনার স্টাফের কাছ থেকে পানির বোতল চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেই বোতলের পানিতে মেশানো ছিল ঘুমের ওষুধ। দ্বিতীয়ার্থে ব্রাংকো মাঠে নামলেন টলমলে পায়ে, আর সেই সুযোগে বাজপাখির মতো উড়ে ম্যারাডোনার পাস থেকে গোল করে ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন ক্লদিও ক্যানিজিয়া। বহু বছর পর ম্যারাডোনা এক টিভি শোতে হেসে হেসে এই চক্রান্তের কথা স্বীকার করলেও, আর্জেন্টিনার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আজ পর্যন্ত তা স্বীকার করেনি। হয়তো একেই বলে যুদ্ধের মাঠে সব জায়েজ।
পেলে-ম্যারাডোনা বনাম মেসি-নেইমার
দুই দেশের ফুটবল দ্বৈরথকে শতাব্দীর পর শতাব্দী বাঁচিয়ে রেখেছে দুই দেশের কিংবদন্তিরা। ব্রাজিলের যখন পেলের হাত ধরে ৩টি বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে অহংকার আকাশচুম্বী, ঠিক তখনই লাতিন আমেরিকার ভারসাম্য রক্ষা করতে আর্জেন্টিনায় আগমন ঘটে ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার। যিনি ১৯৮৬ সালে একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টানাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়ে পেলের রাজত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন। যুগ বদলেছে, কিন্তু লড়াই থামেনি। একদিকে রোমারিও, রিভালদো, রোনালদো, রোনালদিনহোর সাম্বা ফুটবল; অন্যদিকে বাতিস্তুতা, রিকুয়েলমে আর ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির জাদু। বর্তমানের পোস্টার বয় নেইমার আর লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইও এই দ্বৈরথকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। তবে মজার ব্যাপার হলো, মাঠের বাইরে মেসি আর নেইমারের বন্ধুত্ব যতই চমৎকার হোক না কেন, দুই দেশের সমর্থকেরা মাঠে নামলেই একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে ওঠেন।
আসলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার এই লড়াই কোনো সাধারণ খেলা নয়। এটি ১০০ বছরের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক ক্ষোভ, মাঠের ভেতরের স্লেজিং আর কোটি কোটি মানুষের বিশুদ্ধ আবেগের এক ককটেল। আর এই উত্তাপেরই ছোঁয়া লেগেছে আমাদের দেশেও। মাঠের লড়াই যতই হিংস্র হোক না কেন, দিনের শেষে ফুটবলীয় বিনোদনের সেরা বিজ্ঞাপন কিন্তু এই ম্যাচটাই।



