সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই বজ্রপাতের ঘটনা ঘটেছে। শুধু এক দিনেই দেশের কয়েকটি জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ২০ জনের বেশি মানুষ। প্রতি বছর শত শত মানুষের মৃত্যু হয় বজ্রপাতের কারণে। ২০১৬ সালে দুই দিনে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর সরকার বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলাদেশে কেন বজ্রপাত এত বেশি হয়? আর বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কী করা উচিত? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
বজ্রপাত কী?
বজ্রপাত একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঘটনা। পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বজ্রপাত হতে পারে। বজ্রপাত মূলত মেঘের মধ্যে জমে থাকা বৈদ্যুতিক শক্তির হঠাৎ নির্গমন। এটি মেঘ থেকে মেঘে, মেঘের ভেতরে কিংবা মেঘ থেকে মাটিতেও আঘাত হানতে পারে। মানুষের প্রাণহানির বেশির ভাগ ঘটনা ঘটে মেঘ থেকে মাটিতে নেমে আসা বজ্রপাতের কারণে।
বজ্রপাত কীভাবে হয়?
বজ্রপাত তৈরি হতে তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এগুলো হলো আর্দ্রতা, অস্থিতিশীল বায়ু এবং ঊর্ধ্বমুখী বল। সাগর থেকে প্রচুর আর্দ্রতা বাতাসে মিশে যায়। এই আর্দ্রতা থেকেই তৈরি হয় মেঘ।
ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের ওপর যখন শুষ্ক ও ঠান্ডা বাতাস অবস্থান করে, তখন অস্থিতিশীল বায়ুর সৃষ্টি হয়। এই দুই স্তরের ঘনত্বের পার্থক্য ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে, যা বায়ুকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে বজ্রঝড়ের সৃষ্টি হয়।
বজ্রঝড়ের ভেতরে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত ওপর-নিচে চলাচল করে। জলকণা হিমাঙ্কের ওপরে উঠে গিয়ে বরফ বা শিলায় পরিণত হয়। এরপর মেঘের ভেতরে থাকা বরফ, তুষার ও জলকণার মধ্যে ঘর্ষণ শুরু হয়। এই ঘর্ষণের ফলে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হতে থাকে।
মেঘের ওপরের অংশে ধনাত্মক চার্জ এবং নিচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ জমা হয়। একসময় এই চার্জের পরিমাণ এত বেশি হয়ে যায় যে বাতাসের অপরিবাহী বৈশিষ্ট্য ভেঙে পড়ে। তখন মেঘ ও ভূপৃষ্ঠের মধ্যে বিদ্যুৎ চলাচলের পথ তৈরি হয় এবং বজ্রপাত ঘটে।
বাংলাদেশে কেন বজ্রপাত বেশি হয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বজ্রপাতের অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে প্রচুর উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস দেশের দিকে আসে। অন্যদিকে উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি অঞ্চল এবং হিমালয়, যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করে।
দক্ষিণের গরম ও আর্দ্র বাতাস এবং উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংমিশ্রণে অস্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়। এটি বজ্রমেঘ সৃষ্টির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখের মতে, ভারত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাস অনেক সময় ভারত বা মিয়ানমারে না গিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে। ফলে বজ্রপাতের প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়। আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে এত মানুষ মারা যায় কেন?
প্রতি বছর এই দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশে শত শত মানুষের মৃত্যু হয়। विशेषज्ञोंের মতে, বজ্রপাতে প্রাণহানির অন্যতম কারণ সচেতনতার অভাব। বাংলাদেশে অনেক মানুষ খোলা মাঠে, নদীতে কিংবা হাওর এলাকায় কাজ করেন। কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষ বজ্রঝড়ের সময়ও বাইরে অবস্থান করেন। ফলে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। বড় বড় গাছ কমে যাওয়াও হতাহতের একটি কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সাত বছরে বজ্রপাতে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল—এই ১০ বছরে দেশে বজ্রপাতে ৩ হাজার ৬৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অধ্যাপক ড. এম এ ফারুখের মতে, দেশের আয়তন হিসাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারণ হিসাবে তিনি সচেতনতার অভাবকেই দায়ী করছেন। ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে বজ্রপাত হলেও সেখানে মৃত্যুর হার এত বেশি নয়।
কোন সময়ে বজ্রপাত বেশি হয়?
বাংলাদেশের মোট বজ্রপাত ও বজ্রসহ ঝড়ের ৩৮ শতাংশ ঘটে মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। আর জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ঘটে প্রায় ৫১ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে বৈশাখ মাসে, অর্থাৎ এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে কী করবেন?
বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হলো পাকা ভবনের ভেতর। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
খোলা মাঠ, উঁচু স্থান, জলাশয় কিংবা বড় গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া যাবে না।
বৈদ্যুতিক খুঁটি, মোবাইল টাওয়ার, ধাতব বস্তু এবং ছেঁড়া বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকতে হবে।
বাড়ির ভেতরে থাকলে জানালার পাশে না থেকে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে হবে।
খোলা মাঠে আটকে পড়লে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়তে হবে।
নদী বা সমুদ্রে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ করে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে।
গাড়ির ভেতরে থাকলে গাড়ির ধাতব অংশ স্পর্শ করা যাবে না।
আর কেউ বজ্রপাতে আহত হলে দ্রুত তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বাংলাদেশে এটি এখন বড় ধরনের দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং আবহাওয়াগত কারণে দেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেশি। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চললে অনেক প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রকৃতির এই শক্তিশালী ঘটনার সামনে সতর্কতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।



