রোদহীন আকাশ, থমকে থাকা পানি আর মাঠজুড়ে পচা ধানের গন্ধ—হাওরাঞ্চলে এখন এমনই এক কঠিন বাস্তবতা। বৃষ্টি কমলেও উজানের ঢলে পানি নামছে না। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে তলিয়ে যাচ্ছে ফসলি জমি। ভেজা ধান কেটে তুললেও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
মান খারাপ হওয়ায় সরকারি গুদামে ধান জমা দিতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে মিলারদের কাছ থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। ফলে মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাড়াই করা ধান। ক্ষতি পুষিয়ে দিতে সরকার ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করলেও ভেজা ধান বিক্রির সুযোগ না থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। এ অবস্থায় সরকারি শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উজানের ঢলে প্রতিদিনই বাড়ছে হাওরের নদ-নদীর পানি। কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও ৬০০ হেক্টর বোরো ধানের জমি তলিয়ে গেছে। এ নিয়ে জেলার আট উপজেলার হাওরে মোট ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবেছে। একই চিত্র হবিগঞ্জেও—পাঁচটি হাওরে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ধান নষ্ট হওয়ায় মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার বেশি দাম দিতে রাজি নন মিল মালিকরা।

হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ফতেপুর গ্রামের কৃষক গউছ মোড়লের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট। ২০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। অতি বৃষ্টিতে ১০ বিঘার ধান কেটে মাড়াই করে রাখলেও টানা বৃষ্টিতে শুকাতে না পেরে তা নষ্ট হয়ে গেছে। তার মতোই হাওরপাড়ের অসংখ্য কৃষক আপ্রাণ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেননি পরিশ্রমের ফসল। অনেক এলাকায় এখন পচা ধানের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।
কৃষি বিভাগের হিসাবে, প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে প্রায় শত কোটি টাকা। হবিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) দ্বীপক কুমার দাশ জানান, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে, যাতে তারা যথাযথ সহায়তা পান।
মৌলভীবাজারেও একই চিত্র। ৩ মে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও এখন পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৫ মেট্রিক টন। মেঘলা আকাশ আর রোদের অভাবে ধান শুকাতে না পারায় দিনের পর দিন খোলা জায়গায় পড়ে আছে ফসল।
নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমি তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে আগাম ধান সংগ্রহে সরকারি উদ্যোগেও মিলছে না প্রত্যাশিত সাড়া। তিন দিনে মাত্র ৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ হয়েছে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। কঠোর শর্ত, যাতায়াত সমস্যা ও শুকানোর সংকটে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষকরা।

সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। হাওরে ধান তলিয়ে যাওয়ায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫১ হাজার পরিবার। এখন পর্যন্ত ১৯৬ কোটি টাকার ক্ষতির হিসাব মিললেও তা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে ধান নিয়ে গেলে নানা অজুহাতে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, ভেজা বা নিম্নমানের ধান গুদামে নেওয়া হয় না, তবে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার চেষ্টা চলছে।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) বিএম মুশফিকুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা মেনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের চেষ্টা করা হবে।
এদিকে, ভারত থেকে আসা ঢলের পানিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কুজাইন বিলের সাড়ে ৪০০ বিঘা জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। দুই দিন ধরে পানির নিচে থাকা পাকা ফসল নিয়ে দিশেহারা কৃষকরা। অনেকেই বুকসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করলেও শ্রমিক সংকটে তা সম্ভব হচ্ছে না।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাকলাইন হোসেন বলেন, কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যে ধান ভালো আছে, তা দ্রুত সংগ্রহে সহায়তা করা হচ্ছে।
হাওরজুড়ে এখন একটাই দাবি—ধান সংগ্রহের নিয়মে শিথিলতা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ সহায়তা। না হলে মাঠে পচে যাবে আরও হাজার হাজার টন ধান, আর বাড়বে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস।



