প্রায় ৯০০ কোটি টাকার প্রকল্প। কথা ছিল এই অর্থ ব্যয়ে তৈরি হবে আধুনিক ডাকঘর। উন্নত হবে সেবার মান, মুহূর্তেই ডাক বিভাগের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে যাবে গ্রাহকের কাছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন ঠিকই হয়েছে। তবে তা ডাক বিভাগের নয়, ডাক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
প্রকল্প নয়, যেন আলাদীনের চেরাগ হাতে পেয়েছে তারা। কর্তাদের পকেট ভারী হলেও পরিবর্তন হয়নি পোস্ট অফিসের জীর্ণশীর্ণ চেহারার। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই ভুয়া পাশবই ব্যবহার করে ২৯ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন বিভাগটির কর্মকর্তারা।
তৃণমূল মানুষদের ডিজিটাল সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ডাকবিভাগের পোস্ট ই-সেন্টার ফর রুরাল কমিউনিটি নামে একটি প্রকল্প ২০১২ সাল থেকে শুরু হয়। এর আওতায় সারা দেশে সাড়ে ৮ হাজার ডাকঘরকে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন করা হয়। প্রকল্প অনুযায়ী ইন্টারনেটসহ ২২ ধরনের সুবিধা থাকার কথা সেই ডাকঘরে। কেমন হলো সেই ডাকঘর?
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার জিরি গ্রামে একটা আধুনিক ডাকঘর তৈরি করা হয়েছে। সেই ডাকঘরের সুবিধার হিসাব তো দূরের কথা, সেখানে যাওয়ার রাস্তাই নেই। পুকুরের মাঝখানে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই পোস্ট ই-সেন্টারটি নিজেই দিচ্ছে দুর্নীতির বার্তা। চিঠি আদান-প্রদান বা অন্য কোনো সেবা দেওয়ার সক্ষমতাই নেই। নিজের গ্রামে এমন ডাকঘর দেখে হতভম্ব এলাকাবাসী। তারা বলছে, সেবা দেওয়ার নামে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। পুকুরের মাঝখানে তৈরি এই ডাকঘরে এমনকি ডাক বিভাগের কর্মীরাও এখন পর্যন্ত যাননি।
পটিয়া উপজেলার আরেক ডাকঘর কাশিয়াইশ। এই ডাকঘরটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায় পটিয়ার অধিকাংশ ই-সেন্টার গত কয়েক বছর ধরে বন্ধ। পটিয়ার ছনহারা ডাকঘরের মাস্টার মাদব দাশ। ইনডিপেনডেন্টকে তিনি বলেন, আরও দুই বছর আগেই ই-সেন্টারের সরঞ্জাম ডাক বিভাগ নিয়ে গেছে। এখন এখানে শুধু চিঠি আসে, আর চিঠি যায়।
গ্রাম ও শহরের মানুষের মধ্যকার ডিজিটাল পার্থক্য দূর করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতেই নির্মিত হয়েছিল এসব পোস্ট ই-সেন্টার। প্রতিটি ডাকঘরই এক-একটি ডিজিটাল সেন্টারে রূপান্তরিত হয়েছে। ২০১৭ সালেই শেষ হয় সাড়ে ৮ হাজার ই-সেন্টার নির্মাণের কাজ। কিন্তু বস্তবতা হলো এসব পোস্ট ই-সেন্টার শুধু নামেই আছে। মানুষ এসব ই-সেন্টার থেকে কোনো সেবা পাচ্ছে না।
ডাকঘরই যখন ঠিকানাহীন
সরেজমিনে এমন বহু ডাকঘর বা পোস্ট ই-সেন্টারের খোঁজ মিলল, যার ঠিকানার কোনো ঠিক নেই। এমনই একটি পোস্ট ই-সেন্টার কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার চাঁদগাঁও মদিনা কমপ্লেক্স। ডাক বিভাগের তালিকায় থাকলেও বাস্তবে মাদ্রাসা ভবনের একটি কক্ষে থাকা সেই ডাকঘরে মিলল ধুলো আর মাকড়সার জাল। সরেজমিনে সেখানে কোনো ডাককর্মীর দেখা মেলেনি। পোস্ট ই-সেন্টারের দেখা মিলল অবশ্য এর উদ্যোক্তার ব্যক্তিগত দোকানে। কথা ছিল আধুনিক ভবনে কম্পিউটার, স্ক্যানার, ল্যাপটপসহ ১১ ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে ২২ ধরনের সেবা দেবে ই-সেন্টার।
সেন্টারটির উদ্যোক্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, কিছু যন্ত্রপাতি পেয়েছিলেন। তবে তার অধিকাংশই ছিল নষ্ট। এ জন্য এগুলো দিয়ে কোনো কাজ করতে পারছি না। ১১টার মধ্যে মাত্র ৩-৪টি সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।
এর চেয়েও বাজে অবস্থা কুমিল্লার লাকসামের ইচ্ছাপুরা ডাকঘর। সেখানে কোনো আধুনিক ভবন নির্মাণ হয়নি। স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশে একটি স্কুলের পরিত্যক্ত জায়গায় ডাকঘরটি করা হয়েছে।
ডাকঘরটির পোস্টমাস্টার নুরুল ইসলাম বলেন, এখানে কিছুই হয়নি। পরিত্যাক্ত রুম হিসেবে আমাদের দিয়েছে, আমরা থাকি।
ডাকঘরটির উদ্যোক্তা অবশ্য কোনো রাখঢাক না করেই বললেন, এটা কোনোভাবেই ডিজিটাল সেন্টার নয়। যে সরঞ্জামগুলো পেয়েছিলেন, সেগুলো তিন বছর আগেই নষ্টা হয়ে গেছে।
শত শত কোটি টাকার প্রকল্প। কিন্তু কোথাও কোথাও সেই পোস্ট ই-সেন্টার বা পোস্ট অফিসের অস্তিত্ব নেই। এ যেন কাজীর গরু, কাগজে আছে গোয়ালে নেই। চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতু পার হয়ে কর্ণফুলীর ফকিরনির হাট পোস্ট ই-সেন্টার। কাগজে কলমে এই এলাকার মানুষ ডাকঘর হিসেবে ফকিরনির হাট লিখলেও সেখানে গিয়ে সেই পোস্ট অফিসের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অনেকেই চেনেন না। পরে সেই পোস্ট অফিসের খোঁজ মিলল, তবে তা বাদামতল ইউনিয়নে। ডাকঘর চলছে দোকানের ভেতর, যার মালিক আবার ডাক বিভাগের কর্মচারী। একই অবস্থা আনোয়ারা উপজেলার সর্বদক্ষিণের চুন্নাপাড়া ডাকঘরের। বাজারে গিয়ে পোস্ট অফিস পাওয়া যায়নি। এলাকায় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত আবুল কাশেম পরিচালিত ছোট্ট একটি ঘরে এই পোস্ট অফিসের কার্যক্রম চলে।
কাগজে কলমে সবই পোস্ট ই-সেন্টার, বাস্তবে পরিপূর্ণ কোনো সেন্টারই পাওয়া গেল না। এভাবে নয়-ছয় করে প্রকল্পের কাজ শেষ দেখানো হয়েছে।
মেইল প্রসেসিং সেন্টার
আধুনিক পোস্ট ই-সেন্টারের এই করুন অবস্থা দেখে ডাকা বিভাগের আরেক প্রকল্প মেইল প্রসেসিং সেন্টারের দিকে নজর দিই আমরা। ডাক এবং পার্সেল দ্রুত গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে। চট্টগ্রাম বিভাগের মেইল প্রসেসিং সেন্টারগুলোতে নজর দেয় তালাশ।
সারা দেশের জেলা পর্যায়ে ১৪টি স্থানে চালু করা হয় এই মেইল প্রসেসিং সেন্টার। এর প্রধান কাজ ডাক বাছাই, বাণিজ্যিক পার্সেল সংরক্ষণ, গুদামজাতকরণ ও বিতরণ ব্যবস্থার প্রবর্তনসহ দ্রুত গ্রাহকের হাতে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী এবং চট্টগ্রাম শহরে রয়েছে দুটি সেন্টার। এসব সেন্টারে কীভাবে কাজ হয়, কতটুকুই-বা কাজে লাগছে, তা দেখতে নোয়াখালী সেন্টারে যায় তালাশ। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে আধুনিক মেইল প্রসেসিং সেন্টার। মাত্র দেড় বছর আগে উদ্বোধন করা হয় সেন্টারটি। এরই মধ্যেই আধুনিক সেন্টারে বৃষ্টি হলেই পানি পড়ে। ফলে কোটি টাকার সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার উপক্রম।
সেন্টারটি ঘুরে দেখা গেল, আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারই করা হয়নি। পচনশীল পণ্য রাখার জন্য তৈরি করা কোল্ড স্টোরের অবস্থাও নাজুক। কিছু জরুরি সরঞ্জাম এখনো পায়নি সেন্টারটি।
সেন্টারটির মেইল অপারেটর আবুল খায়ের বলেন, আর কোনো যন্ত্র আছে কিনা, আর কিছু দেবে কিনা, তা সঠিক বলতে পারব না।
১৪টি সেন্টারের প্রতিটির নতুন ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় ২৫ থেকে ৩৫ কোটি টাকা। ৩৫ ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে সাজানো এক-একটি সেন্টার।
চট্টগ্রামের মেইল প্রসেসিং সেন্টারেরও একই দশা। সেখানেও বৃষ্টি হলেই ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ে। সেন্টারটির সুপারিনটেনডেন্ট মো. আব্দুল্লাহ বলেন, ডাক বিভাগের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত যেসব সরঞ্জাম, যেসব মেশিন, সেগুলো অফ হয়ে আছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর কাজ করে না বলে আলোর জন্য কাজ বন্ধ থাকে।
জানা গেল, সেন্টারটিতে জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর মতো তেলের সরবরাহ নেই। এ কারণেই বিদ্যুৎ না থাকলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অবশ্য তালাশ অনুসন্ধান করে আসার পর সেখানে সংস্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দুর্নীতিবাজ শনাক্ত, তবু হয়নি শাস্তি
ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্র দুর্নীতির দায়ে চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু চাকরি যাওয়া ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে আর কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সুধাংশু শেখর ভদ্র ছিলেন ই-পোস্টে সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক।। প্রায় ৫৪০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে যেসব সরঞ্জাম কেনা হয়, তার অধিকাংশই ছিল নষ্ট। মেইল প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণের কাজও হয়েছে তাঁর অধীনেই।
তদন্ত প্রতিবেদন মতে, প্রায় ৫৪০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাকি ১৬০ কোটি ১৯ লাখ টাকার সাশ্রয় দেখানো হলেও তার কোনো হদিস নেই।
পোস্ট ই-সেন্টারের জন্য কেনা ১৭ হাজার পাওস মেশিনের মধ্যে ৭০৪টি ব্যবহার করা হচ্ছে। বাকিগুলো আছে অবহৃত অবস্থায়। এই পাওস মেশিনের বাজারমূল্য সাড়ে ৩ হাজার টাকা হলেও এগুলো কিনতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০-৩৫ হাজার টাকা। একই সাথে ১০ হাজার ফিঙ্গার ভেইন মেশিনের মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৬৪৩টি। একইসঙ্গে তিনটি উচ্চ ক্ষমতার সার্ভার কেনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেনাই হয়নি। আর মেইল প্রসেসিং সেন্টার নির্মাণেও ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি দামে সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যে ডিজিটাল সেবা পাওয়ার কথা ছিল সেটি সম্পন্ন হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে।
একইভাবে প্রশিক্ষণের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণের নজির নেই। বোঝাই যাচ্ছে পুরো প্রশিক্ষণই পকেটে গেছে।
২০১২-১৭ সময়ে শেষ হওয়া প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এরই মধ্যে সুধাংশু শেখর ভদ্রকে দুই দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সংস্থাটি।
ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুধাংশু শেখর ভদ্রের বিরুদ্ধে এক চাকরিচ্যুতি ছাড়া আর কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, শত শত কোটি কোটি টাকা লুটের বিপরীতে এই শাস্তি আসলে কতটা অর্থবহ?
এখানেই শেষ নয়
সারা দেশের বিভিন্ন ডাকঘরের সঞ্চয় শাখা থেকে গত দুই দশকে ৩০টির মতো অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সঞ্চয় শাখা থেকেই ২০২০ সালে ২৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন খোদ ডাক বিভাগের কর্মকর্তারাই।
মানুষের আস্থা আর বিশ্বাসের শীর্ষে ছিল ডাক বিভাগের সঞ্চয়পত্র। মুনাফার হার বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রধান কারণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতি। গ্রাহকের ভুয়া নাম, ছবি, ঠিকানা ব্যবহার করে ১১টি সঞ্চয় বইয়ের মাধ্যমে তিন বছরে ২৯ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। এই ১১টি সঞ্চয় বইয়ে থাকা ব্যক্তিদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করে তালাশ টিম। এর মধ্যে একটি সঞ্চয়ী হিসাবের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া গেল চট্টগ্রাম ডাক বিভাগের গাড়ি চালক খোকনকে। তাঁর নামে সঞ্চয়পত্র ব্যবহার করে একই কায়দায় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
এভাবেই ১১টি ভুয়া বই দিয়েই টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি শক্তিশালী চক্র। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রাহকদের ভুয়া নাম-ঠিকানা ও ছবি দিয়ে খোলা হিসাব থেকে এসব টাকা তুলে নেয় চক্রটি।
টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্তরা হলেন চট্টগ্রাম জিপিওর সহকারী পোস্ট মাস্টার নূর মোহাম্মদ, পোস্টাল অপারেটর সরওয়ার আলম খান। ২২ লাখ টাকাসহ তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। যদিও প্রধান আসামী নূর মোহাম্মদ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। এ ঘটনায় পরে পোস্টাল অপারেটর জয়নাল আবেদীন, কবির আহমেদ ও মো. হাসানকে আসামী করে মামলা করে ডাক বিভাগ। তিনজনই এখন জামিনে আছেন। ঘটনার পর তাঁদের বরখাস্ত করে ডাক বিভাগ। তাঁরা বলছেন, এই পুরো বিষয়টির সাথে রাঘব-বোয়ালরা জড়িত থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
চট্টগ্রাম পোস্ট অফিসের সঞ্চয় শাখা থেকেই ভূয়া হিসাব বই তৈরি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। ঘটনার প্রায় এক বছর পর চট্টগ্রামের সার্কেল অফিসের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল নিজাম উদ্দিনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্তে বলা হয়, এই পাঁচ ব্যক্তিই প্রত্যক্ষভাবে ২৯ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, যারা সঞ্চয় শাখার প্রধান বা বিভাগের অন্য দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের কি এখানে কোনো দায় নেই?
সে সময় নিপুল তাপস বড়ূয়া সঞ্চয় শাখার প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ থাকলেও তাঁকে লঘুদণ্ড দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আরেক আসামী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, যিনি আবার প্রধান আসামী নূর মোহাম্মদের ফুফাতো ভাই। সাইফুল ছিলেন একই শাখার নগর পরিদর্শক। প্রতিদিনের হিসাব খাতায় লিপিবদ্ধ করে তা কর্তৃপক্ষকে জানানো ছিল তাঁর কাজ, যা তিনি করেননি।
এই সাইফুল ইসলাম চৌধুরী, সরকারি কর্মচারী হয়ে বনে যান ডাক বিভাগরে ঠিকাদার। নিজে সব নিয়ন্ত্রণ করলেও স্ত্রীর নামে ঠিকাদরির লাইসেন্স নিয়ে ডাক বিভাগের বিভিন্ন ভবন, নির্মাণ এবং সংস্কারের নামে লুট করেছেন কোটি কোটি টাকা। সরকারি কলোনিতে থাকলেও চড়েন ব্যক্তিগত দামি গাড়িতে। তাঁর নিজের মালিকানায় আছে ৫-৬টি গাড়ি। এসব অভিযোগ নিয়ে দুদকও তদন্তে নেমেছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে তালাশ টিমের সাথে কথা বলেন সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। প্রথমেই অনানুষ্ঠানিক কথাবর্তায় নিজের স্ত্রীর নামে ঠিকাদারি লাইসেন্সসহ গাড়ি থাকার কথা স্বীকার করেন। পরে আনুষ্ঠানিক সাক্ষৎকারে সবকিছু অস্বীকার করেন।
সব নির্দোষ হলে অপরাধী কে?
সবাই যদি নির্দোষ হয় তাহলে অপরাধী কে? কোথায় গেল সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা? ঘটনার তিন বছরেও প্রকৃত অপরাধীরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত দুই দশকে ডাক বিভাগের সঞ্চয় শাখা থেকে যত টাকাই লুট হয়েছে, তার এক টাকাও উদ্ধার হয়নি।
২৯ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ডাক বিভাগের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা নিজাম উদ্দীন বলেন, তথ্যপ্রমান বলছে নূর মোহাম্মদের হাত দিয়েই টাকা ঢুকেছে, তাঁর হাত দিয়েই বের হয়েছে। আমি তাঁকেই সরাসরি দায়ী করেছি। তাঁকে পেছন থেকে কে কুমন্ত্রণা দিল, কে পরিকল্পনা করল, সেটা দেখার সুযোগ তো আমার নেই। সেটা দেখবে দুদক।
এমন এসব পুকুরচুরি নিয়ে কথা বলতে ডাক বিভাগের মহাপরিচালক হারুন উর রশীদের সাথে কথা বলতে যায় তালাশ টিম। কিন্তু সদর দপ্তরে ঢোকার মুহূর্তেই পড়তে হয় সেখানকার কর্মীদের বাধার মুখে। শেষ পর্যন্ত হারুন উর রশীদও কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমান মহাপরিচালক হারুন উর রশীদ ২০১৮ সালে পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক থাকা অবস্থায় মেইল প্রসেসিং সেন্টার প্রকল্পের যন্ত্রপাতির বাজার যাচাই কমিটির সভাপতি ছিলেন। ওই প্রকল্পের সরঞ্জাম ক্রয়ে বাজারদরের বাজারদরের চেয়ে ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি ব্যয় করার অভিযোগের বিষয়ে আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফখারুজ্জামান ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, ডাক বিভাগে দুর্নীতি নয় সাগর চুরি হয়েছে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রকল্পের চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। যদিও জবাবদিহির নামে কিছু প্রক্রিয়া করা হয়েছে। কিন্তু শাস্তির আওতায় এসেছে কিছু চুনোপুঁটি। বাস্তবে যারা মূল হোতা, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন: কাজী ইসমাইল



