ছেলের হাতেই খুন হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের আলম মিয়া (৬৫)। এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার ছেলে মো. মাহমুদুল হাসান (২১) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
আলম মিয়া হত্যা মামলায় ছেলে মাহমুদুল বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ছায়া তদন্তে উঠে এসেছে আসল রহস্য। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লোহার পাইপ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নাসিরনগরের ফান্দাউকের মুন্সিপাড়ায় গত ৩ সেপ্টেম্বর আলম মিয়া খুন হন। এর ৩ দিন পর ৬ সেপ্টেম্বর নাসিরনগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন ছেলে মাহমুদুল। জেলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেষ্টিগেশন-পিবিআই চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার ছায়া তদন্ত করে রহস্য উদঘাটন করে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিবিআই পুলিশ সুপার শচীন চাকমা বলেন, ‘গতকাল বুধবার বিকেলে নিজ বাড়ি থেকে মো. মাহমুদুল হাসানকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি তার বাবাকে হত্যা করেছে বলে স্বীকার করেন। আজ বৃহস্পতিবার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জহিরুল আলমের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।’
‘এর আগে, আজ বেলা ১১টায় আসামি মো. মাহমুদুল হাসানের দেখানো স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ৩ ফুট লম্বা ও দেড় ইঞ্চি প্রস্থের একটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়।’ যোগ করেন তিনি।
পিবিআই পুলিশ সুপার বলেন, ‘মাহমুদুল নানা কারণে তার বাবার ওপর ক্ষুব্দ ছিলেন।
যেভাবে বাদী থেকে আসামি মাহমুদুল
মাহমুদুল হাসান তার বাবা হত্যা মামলার এজাহারে দাবি করেন, গত ৩ সেপ্টেম্বর অজ্ঞাতনামা আসামিরা তার বাবার বাড়ির টিনের চালা কেটে এবং পেছনের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা তার বাবা ভিকটিম আলম মিয়াকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করে। এরপর হত্যাকারীরা বাদীর আলমারি থেকে বাদীর স্ত্রীর আড়াই লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে নিয়ে যায়।
এজাহারে তিনি তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমেনা এবং তার পূর্বের স্বামী মমিনকে হত্যাকাণ্ডের জন্য সন্দেহ করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি ঘটনার সময় সিলেটে ছিলেন এবং তার বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন।
মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার শচীন চাকমার তত্ত্বাবধানে পুলিশ পরিদর্শক মো. বেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে ছায়া তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এতেই বের হয় হত্যার রহস্য।
তদন্ত কর্মকর্তা মো. বেলাল উদ্দিন জানান, এটি পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যাকাণ্ডটি ৩ সেপ্টেম্বর ঘটলেও, মাহমুদুল হাসান মামলা দায়ের করেন তিনদিন পর। বাদীর দাবি ছিল, তিনি দাফন-কাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু বিলম্বের আসল কারণ ছিল তার সাজানো গল্পটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘খুনের ঠিক আগের দিন আলম মিয়া তার ভাগিনা বশিরের বাসায় পারিবারিক বৈঠকে ২য় স্ত্রী আমেনাকে আট আনা স্বর্ণ, তিন লাখ টাকা, চার লাখ টাকা ব্যাংকে জমা করে দেওয়া, দুই শতক ভিটে এবং দুই কানি (৬০ শতক) ফসলি জমি দিতে চাইলে মাহমুদুল হাসান এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ২য় স্ত্রী আমেনাকে ঢাকা থেকে আনার জন্য আলম প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ করেন। এতেও মাহমুদুল হাসান অনেক ক্ষিপ্ত ছিল।’
মো. মাহমুদুল হাসানের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৫ ডিসেম্বর তার মা মারা যান। তার ধারণা বাবা আলম মিয়া তার মায়ের সুচিকিৎসা করেননি এবং মা জীবিত থাকাবস্থায় বাবা পুনরায় বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। মাহমুদুলক প্রায় সময় অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতেন তিনি। এছাড়াও আলম মিয়া একাধিকবার মাহমুদুলকে তার স্ত্রীর সামনে চড় মেরেছিলেন। ২য় স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার চিন্তা করায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাবাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন মাহমুদুল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাহমুদুল সিলেট যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন এবং বাড়ির পেছনের দরজা খোলা রাখেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করে রাত আনুমানিক ৮টায় সেই খোলা পেছনের দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন এবং মাচার ওপর লুকিয়ে থাকেন। এরপর তিনি সুকৌশলে তার বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসার জন্য চাপ দেন। আলম মিয়া বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে, রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে মাহমুদ লোহার পাইপ দিয়ে তার বাবার মাথায় আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। হত্যার পরে লোহার পাইপটি বাড়ির সামনের পুকুরে ফেলে দেন।



