ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক মাসে গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে আরও বেশ কয়েকজন। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও খুনখারাবির এসব ঘটনায় এখন জেলা জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গত বৃহস্পতিবার গভীররাতে বাড়ি থেকে ডেকে এনে গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয় ছাত্রদলের সাবেক কর্মী সাদ্দাম হোসেনকে (৩৭) । ওইদিন সন্ধ্যা থেকে শহরের কান্দিপাড়া এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা শুরু হয়। লায়ন শাকিল (শাকিল সিকদার) নামে উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ককে এলাকার মাদরাসা রোডে বন্দুক নিয়ে দৌড়াতে এবং গুলি করতে দেখা যায়। আশপাশে লাগানো সিসিটিভিতে ধরা পড়ে এই দৃশ্য।
লায়ন শাকিলের গুলিতে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়। তারা হলো– টুটুল মিয়া (৪৬), শিহাব উদ্দিন ওরফে শোয়েব (২৭) এবং মো. সানজু (২২)। এর কয়েক ঘণ্টা পর কান্দিপাড়ায় বাড়ির গেইটে মারধোর করা হয় রবিন নামে একজনকে। বাঁচাতে এসে রবিনের ছোট ভাই রিজনও হামলার শিকার হন।
এরপর গভীর রাতে ছাত্রদলের সাবেক কর্মী সাদ্দাম হোসেনকে বাড়ি থেকে ডেকে এনে গুলি ও জবাই করে হত্যা করা হয়। তাকে হত্যার অভিযোগে জেলা স্বেচ্ছাসেবকদলের আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন দিলীপকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের নামে হত্যা মামলা দেওয়া হয়। শাকিল ও দিলীপের আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে শহরের কান্দিপাড়া উত্তপ্ত ছিল গত কয়েকদিন ধরে। গোলাগুলি, হত্যার ঘটনায় এখন আতঙ্কে রয়েছে এলাকার মানুষ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় অবশ্যই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করছি।’
গত ১ নভেম্বর নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দিতে গনি শাহর মাজার সংলগ্ন একটি রেস্তোরাঁয় বসে খাবার খাওয়ার সময় নূরজাহানপুর গ্রামের শিপন মিয়াকে (৩৮) লক্ষ্য করে গুলি চালায় স্থানীয় থোল্লাকান্দি গ্রামের রিফাত আহমেদ। এসময় রেস্তেরা কর্মচারী ইয়াছিন (২০) ও নূর আলম নামে আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ঢাকায় হাসপাতালে মারা যায় শিপন ও ইয়াছিন। র্যাব-৯ ব্রাহ্মণবাড়িয়া ক্যাম্পের সদস্যরা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত রিফাত আহমেদ (২৫) ও তার সহযোগী লিমন মিয়াকে (১৯) ১০ নভেম্বর একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন ও ৭ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করে।
এর আগে, ২৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নবীনগর শহরের পশ্চিমপাড়ায় গুলিবিদ্ধ হয় উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান মুকুল। দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে কাছ থেকে ৩টি গুলি করে। এসময় তার চিৎকারে আশপাশের দোকানীরা ছুটে গিয়ে উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠানো হয়। নবীনগরে গুলিতে এই ২ হত্যাকাণ্ড ছাড়াও গত ৩/৪ মাসে আরও কয়েকটি হত্যাকাণ্ড হয়।
লাউরফতেহপুর গ্রামে ঘর থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুদিন পর কলেজছাত্রী ফারজানা আক্তার জুইয়ের লাশ পাওয়া যায়। বিটঘর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে ১৬ অক্টোবর রাতে কুপিয়ে ও জবাই করে হত্যা করা হয় উমর হাসান (২৩) নামে এক যুবককে। পুলিশের নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাও হয় এই উপজেলায়। চুরির অভিযোগে সলিমগঞ্জ ফাড়িতে ধরে এনে বাঞ্ছারামপুর উপজেলার বাহেরচর গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহকে (২৭) নির্যাতন করে পুলিশ। এতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকার মানুষ উত্তেজিত হলে ওই পুলিশ ফাড়ি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানায়, গত জুন মাসে মো. শাহিনূর ইসলাম নবীনগর থানায় ওসি হিসেবে যোগদান করার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে।
এ বিষয়ে ওসি শাহিনূর ইসলাম বলেছেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম সমস্যা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
২৫ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুরে বল্লমের আঘাতে মো. নাসির উদ্দিন নামে একজন নিহত হন। আহত হয় আরও ৩০ জন। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হারুনুর রশিদ ও ব্যবসায়ী সাচ্চু মিয়ার গোষ্ঠীর লোকজনের বিরোধে হতাহতের ঘটনা ছাড়াও ৩০/৪০টি ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
এছাড়া জেলার বিভিন্নস্থানে সংঘর্ষ হয়েছে। গত ২৩ নভেম্বর সরাইলের দেওড়া গ্রামে দুপক্ষের সংঘর্ষে আরফোজ মিয়া (৫৫) নামে একব্যক্তি নিহত হন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় আইনশৃঙ্খলার এই হাল নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করছি।’



