চাঁদপুরে গত কয়েক মাসে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকেরা। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বেশি চুরির ঘটনা ঘটছে মতলব উত্তর উপজেলায়।
চলতি বছরে চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় অর্ধশতাধিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত শুধু মতলব উত্তর উপজেলাতেই ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এছাড়া হাজীগঞ্জ, কচুয়া ও শাহরাস্তি উপজেলায় এ পর্যন্ত আরও ১২টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ট্রান্সফরমার চুরির পর নতুন করে সংযোগ দিতে প্রথমবার গ্রাহককে খরচের অর্ধেক এবং পরবর্তী সময়ে পুরো ব্যয় বহন করতে হয়। ফলে চুরির ঘটনায় বিদ্যুৎহীন থাকার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতিরও মুখে পড়ছেন গ্রাহকেরা।
ট্রান্সফরমার চুরি ঠেকাতে থানায় অভিযোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে মাইকিং, গণশুনানি ও উঠান বৈঠকের মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। চুরির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. অহিদুজ্জামান বলেন, চলতি বছরে তার কার্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় মোট ২৪টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এর মধ্যে গত মাসে ১৩টি এবং চলতি মাসে আরও ছয়টি চুরি হয়েছে।
তিনি বলেন, একটি সংঘবদ্ধ চোর চক্র এসব চুরির সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে বাসা ভাড়া নিয়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ বুঝে ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যায়। পরে সেগুলো বিক্রি করে দেয়।
লোডশেডিংয়ের কারণে চোরেরা চুরির সুযোগ বেশি পাচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ না থাকাকে অনেক সময় মানুষ লোডশেডিং মনে করেন। এই সুযোগে চোরেরা ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
চুরি ঠেকাতে উঠান বৈঠক, বিশেষ সভা ও গণশুনানিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে জানিয়ে ডিজিএম বলেন, চুরি হওয়া সব ট্রান্সফরমারের ঘটনায় থানায় মামলা করা হয়েছে। কোনো ঘটনাই বাদ দেওয়া হয়নি। পুলিশও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে।
তিনি জানান, মতলব উত্তর জোনাল অফিসের আওতায় প্রায় সাড়ে চার হাজার ট্রান্সফরমার রয়েছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জিএম আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, চাঁদপুরের মতলব এলাকায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা তুলনামূলক বেশি। অন্য এলাকাগুলোতে এ ধরনের ঘটনা তেমন নেই।
তিনি বলেন, গ্রাহকদের সচেতন করতে মাইকিং ও বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে। চুরির সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
ট্রান্সফরমার চুরি ও লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এর ওপর চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার পুনঃস্থাপনে অর্থ ব্যয় করতে হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
মতলব উত্তর উপজেলার এক ভুক্তভোগী বলেন, ট্রান্সফরমার চুরি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। চুরি হওয়ার পর নতুন ট্রান্সফরমার স্থাপন করতে গ্রাহকদের অর্থ দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি লোডশেডিংও বেড়েছে।
জীবগাঁও এলাকার বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যার পর হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। পরে জানতে পারেন, তাদের এলাকার একটি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা তাদের এলাকায় আগে কখনো ঘটেনি।
হাজীগঞ্জ উপজেলার ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন বলেন, ট্রান্সফরমার আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন। ট্রান্সফরমার সহজে আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে স্থানীয়ভাবে সেটি পাহারা দেওয়াও সম্ভব হবে।
পুলিশ বলছে, ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিসের আরও সহযোগিতা পেলে চোর চক্রের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, বিভিন্ন থানায় ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শাহরাস্তিতেও এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ট্রান্সফরমার চোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের এই সময়ে ট্রান্সফরমার চুরি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ অফিসের সহযোগিতা পাওয়া গেলে চোরদের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
চাঁদপুর জেলায় প্রায় সাড়ে আট লাখ গ্রাহকের জন্য প্রায় ৪০ হাজার ট্রান্সফরমার রয়েছে। লোডশেডিং কমিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ট্রান্সফরমার চুরি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকেরা।



