আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে মানিকগঞ্জ–২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম। তিনি ছাড়াও এই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আরও ১৪ জন, যার মধ্যে তাঁর নিজ দলেরই রয়েছেন ৫ স্বতন্ত্র প্রার্থী।
আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের ৫ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেন—আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মুশফিকুর রহমান খান হান্নান, কোষাধ্যক্ষ দেওয়ান জাহিদ আহম্মেদ টুলু, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য সারোয়ার আলম ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যনির্বাহী সদস্য সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ চঞ্চল।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অধিকাংশই বেশ শক্তিশালী। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনীতি করে আসছেন।
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল মানিকগঞ্জ-২ আসনে রাজনীতিতে অতিপরিচিত মুখ। তিনি ২০০১ সাল থেকে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে আসছেন। এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
মুশফিকুর রহমান খানও এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করে আসছেন। নির্বাচনে অংশ নিতে সম্প্রতি তিনি সিঙ্গাইর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।
দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলুও দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী এলাকার মানুষজন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে আসছেন। প্রায় এক বছর ধরে তিনি নির্বাচনী এলাকার মাঠ চষে বেড়িয়েছেন। তবে দেওয়ান জাহিদ টুলু আরেফিন টুটুলের আপন চাচাতো ভাই হওয়ায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে।
আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী মমতাজসহ চার স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িই সিঙ্গাইর উপজেলায়। তবে আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ চঞ্চলের বাড়ি হরিরামপুর উপজেলায়। অঞ্চলভিত্তিক ভোটারের কিছুটা দৃষ্টি কাড়বে তরুণ এই প্রার্থী। এসব কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মমতাজ বেগমের জন্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া অনেকটা কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে মানিকগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী মমতাজ বেগম এ বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাঁর ভাষ্য, ‘নির্বাচনই হচ্ছে চাপ, নির্বাচনই হচ্ছে চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগিতা করে আসার মধ্যে আনন্দ আছে। সেই চাপ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণই নৌকাকে জয়ী করবে।’
মমতাজ বেগম বলেন, দলের একাধিক প্রার্থী থাকলে বিভক্তি হয়। তবে এই বিভক্তি আগে থেকেই হয়ে আসছে, সামনেও হবে। দলের জন্য যাঁরা কষ্ট করেন, তাঁদের আশা-ভরসা থাকে। তবে যাঁরা আওয়ামী লীগের প্রকৃত কর্মী তাঁরা কখনই নৌকার বাইরে যেতে পারবেন না।
এছাড়া এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এস এম আবদুল মান্নানও শক্তিশালী প্রার্থী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির কারণে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থী দেওয়ান জাহিদ আহমেদ টুলু বলেন, ‘আমার পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আমি জাতির পিতার আদর্শকে বুকের ভেতর ধারণ করি। আমাকে মানুষ ভালবাসে, তারাই চায় আমি তাদের সেবক হই। আমি নেত্রীর কাছে নমিনেশন চেয়েছিলাম, তিনি দিতে পারেননি। তবে তিনি বলেছেন, স্বতন্ত্র হতে বাঁধা নেই। সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিতে মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।’
আরেক প্রার্থী সারোয়ার আলম বলেন, ‘আমি নৌকার বিপক্ষে না। আমি কেন্দ্রের হাইকমান্ডের নির্দেশে ডামি প্রার্থী হয়েছি। তারা যে সময় যে নির্দেশনা দেবে, আমি মাথা পেতে নেব।’
এই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া অন্য প্রার্থীরা হলেন—তৃণমূল বিএনপির মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, জাসদের রফিকুল ইসলাম সিদ্দিকী, জাকের পার্টির আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের ফেরদৌস আহম্মেদ আসিফ, বিএনএমের এ কে এম ইকবাল, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির এ কে এম নাহিদ, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের তানভীর হাসান, বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির জাকির হোসেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ সারোয়ার আলম।
এদিকে মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলপুর ও শিবালয়) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। এরই মধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। তবে এই আসনেও রয়েছেন আওয়ামী লীগ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী।

এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ। জাহিদের পক্ষে ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয় উপজেলা আওয়ামী লীগসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাংশ ও তিনি চরের সন্তান হওয়ায় যমুনা নদীর চরে বসবাস করা মানুষের বিশাল একটি অংশ তাঁকে সমর্থন দিয়ে এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন।
ধারণা করা হচ্ছে, বিএনপি যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না আসে এবং তিনটি উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা জাহিদের পক্ষে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে—তাহলে এ আসনে নৌকাকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগের কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে।
আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুস সালাম বলেন, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচনী আসনে খোঁজ–খবর নিয়ে তাঁকে দলীয় মনোনয়ন দিয়েছেন। এখন যারা নির্বাচন করতে চাচ্ছেন, তাঁরাও আওয়ামী লীগের সমর্থক। আওয়ামী লীগ করে নৌকার বিপক্ষে গিয়ে কেউ যদি নির্বাচন করে, তাহলে কিছু করার নেই। তবে নৌকার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নৌকার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না।
এই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ বলেন, ‘প্রথমত আমি দলের সিদ্ধান্তে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। আমার অবহেলিত আসনের জন্য আমি কাজ করতে চাই। আমার বিশ্বাস আমি জয়ী হব।’

জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে আব্দুস সালাম ও সালাউদ্দিন মাহমুদ ছাড়াও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আরও ৮ জন। তাঁরা হলেন—জাতীয় পার্টির জহিরুল আলম রুবেল, হাসান সাঈদ, জাকের পার্টির দীন মোহাম্মদ খান, বিএনএমের মোনায়েম খান, জাসদের আফজাল হোসেন খান জকি, জাতীয় পার্টি জেপির আফজাল হোসেন খান, গণফ্রন্টের মোহাম্মদ সাজাহান খান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল আলী বেপারী।
মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক এহতেশাম হোসেন খান ভুনু সাংবাদিকদের বলেন, দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের কাছে পাঠানো হবে। তাঁদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাছাড়া আগামী ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারেরও সুযোগ রয়েছে।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মুহাম্মদ আমিনুর রহমান মিয়া বলেন, আগামী ৭ জানুয়ারী জাতীয় নির্বাচনের ভোটগ্রহণ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সারা দেশের মতো মানিকগঞ্জেও ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।



